বেঁচে থাকার তাগিদে নেয়া পেশাতেই দেশের কল্যাণ

পল্টনে বায়তুল মোকাররম মসজিদের উত্তর পাশে গাড়ির নাম্বার প্লেট লেখার কাজ করেন আল আমিন। মৃত কোনো স্বজনের কবর বা সমাধির পাশে তার নাম-পরিচয় খোদিত পাথর স্থাপন করতে হলেও খোদাই কাজ সারতেও যেতে হয় তার কাছে। এই কাজ থেকে প্রাপ্ত আয় দিয়ে দিব্যি চলছে তার সংসার। আল আমিনের মত হাজারো যুবক নিজেদের কাজ নিজেরাই যোগাড় করছে। এসব কাজে তারা পায়নি কারো সহায়তা। দেশের রাজনীতি কোন পথে গেল কিংবা কোন দল ক্ষমতায় গেল না গেল—এসব নিয়ে তাদের মাথা ব্যথা নেই। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এমন ‘এন্ট্রেপ্রেনারশিপ’ বাংলাদেশেই আছে। যারা শূন্য থেকে বড় হতে পারে নিজস্ব উদ্যম আর সৃজনশীলতা দিয়ে। কিন্তু এরা কখনো আলোচনায় আসে না। এদের অবদানও কেউ ভাবে না। বরং সমাজের ‘নিচু শ্রেণীর মানুষ’ হিসেবে অবহেলাই জোটে তাদের। আর নিগৃহীত হতে হয় আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর হাতে, কখনো স্থানীয় মস্তানদের দৌরাত্ম্যের শিকারও হতে হয়। আমির হোসেন নামের এক যুবক তরিতরকারির ব্যবসা করেন। কাওরানবাজার থেকে কিনে ভ্যানে করে বিভিন্ন এলাকায় শাক-সবজি বিক্রি করেন তিনি। তার বক্তব্য—কখনো ভ্যান আটকে দেয় পুলিশ। কখনো বা পাড়ার মাস্তানরা টাকা চায়। এমন উপদ্রবের কারণে মাঝে-মধ্যেই লাভের বদলে লোকসান গুনতে হয় তাকে। বাংলাদেশে ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের জন্য সহজ শর্তে ব্যাংক ঋণ সুবিধা দেয়া হয়েছে। সেই ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের মধ্যে আল আমিন বা আমির হোসেনরা নেই। কারণ এদের কোন জামানত বা ব্যবসায়িক স্থায়িত্ব কিংবা স্থায়ী ঠিকানাও নেই। হয়তো সেই অজুহাতেই এরা কোন হিসাবের খাতায় নিজেদের উপস্থিতি নিশ্চিত করতে পারে না। কিন্তুু পথ থেকে পথে ঘুরতে ঘুরতে এ রকম হকারের ঈর্ষণীয় সাফল্য গাঁথা বাংলাদেশে বিরল নয়। তবে বড় হবার সেই স্বপ্ন সবার নেই। বেশির ভাগই নিজেদের জীবনধারণ বা কোনমতে সংসার চললেই হয়-এমন চাহিদা নিয়েই কাজে নামছে। এ ধরনের ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র উদ্যোক্তারা অল্প আয় করেও তৃপ্তির হাসি হাসেন। সরকারের নিয়মিত অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের বাইরে বিশাল এই জনগোষ্ঠী নিজেদের বাঁচিয়ে রাখতে গিয়ে সরকারকেই বরং সহায়তা করছে। সরকার যেখানে কাজের সুযোগ তৈরি করতে ব্যর্থ হচ্ছে বা দৈনন্দিন ব্যয় মেটাতে গিয়ে বেসরকারি খাতের ঋণ কমিয়ে নিজেই দেশের ব্যাংকিং খাত থেকে ঋণ নিচ্ছে। বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ ড. মুহম্মদ মাহবুব আলী বলেন, স্বউদ্যোগী এ ধরনের মানুষগুলোর জন্য গুচ্ছ কর্মসূচি গ্রহণ করার বিষয়টি সরকার ভাবতে পারে। তাতে পুঁজি বৃদ্ধিতে যেমন সহায়ক হবে, তেমনি এ ধরনের উদ্যোগ উত্সাহিত হবে।