ঢাকা আর্টস সেন্টারে সমর মজুমদারের একক চিত্রপ্রদর্শনী
মন্ময়তার বর্ণিল লহরী
প্রকাশ : ২০ মার্চ ২০১৪, ২০:২৩
একজন শিল্পী যখন দেশোয়ালি মনোভঙ্গি নিয়ে তুলি-কলম ধরেন তখন তিনটি শিল্পের ত্রিবেণী সঙ্গমে তাঁর সাঁতার কাটতে হয়। বুদ্ধিমার্গী পশ্চিমী নিরীক্ষাপ্রবণ দৃষ্টিভঙ্গির শিল্পীরা প্রায়শ এ পথের যাত্রী নন। ওই ত্রিবেণী জট খুলে বলা দরকার। কারণ তা না হলে সত্তরের দশকের শিল্পী সমর মজুমদারের চিত্রকর্ম হয়তো যথার্থভাবে বিশ্লেষিত হবে না। দুইটা পরিণাম আমরা উপেক্ষা করতে পারি না। এক, চারুকলার বিদ্যালয়ে রেনেসাঁপ্রসূত বৈজ্ঞানিক চিত্রবিদ্যার শিক্ষা আর অপরটি স্বদেশের মাটিলগ্ন প্রধান ধারা লোককলা। তৃতীয়টি হলো কখনো ভারতীয় হিন্দু-বৌদ্ধ মূর্তিতত্ত্বজাত ভাষা, কখনো ভারতীয় স্থানিক বৈশিষ্ট্যমণ্ডিত মিনিয়েচার বা মোগল মিনিয়েচারের রীতি। এ সব ভাষার যোজন-বিয়োজনের মধ্য দিয়ে দ্বিমাত্রিক স্পেসে চিত্রগত সমস্যা মিটিয়ে উত্তীর্ণ শিল্পসফল মুদ্রা ধরতে চাওয়ার যে অভিযান তারই একজন যাত্রিক সমর মজুমদার।
সমর মজুমদার বইয়ের প্রচ্ছদ অঙ্গসজ্জার শিল্পী হিসেবে বিখ্যাত। চিত্রসাধনার অন্য একটি জায়গা তিনি আড়লে রেখে দিয়েছিলেন। এই প্রথম তিনি একান্ত রেখাধর্মী সৃজনশীল নকশাপ্রধান কাজ থেকে শুরু করে বিমূর্ত বর্ণবিহারের ব্যঞ্জনার কাজ নিয়ে প্রদর্শিত হলেন। তবে যে সমর প্রচ্ছদ রচনা করেন সেই সমরের সঙ্গে পেইন্টিং রচয়িতা সমরের ব্যাপক তফাত্ রয়েছে। তিনি প্রচ্ছদ, ইলাস্ট্রেশন করেন বলেই তাঁকে নকশার শুদ্ধতা খুঁজতে হয়—পরিমিত রং-রেখায় সীমিত স্পেসে বক্তব্যকে পরস্ফুিট করতে হয়। এই ভাবনাটা যখন আর স্থির লক্ষ্য অভিসারি নয় অথবা তা কোনো আখ্যান বা গল্পকে অনুসরণ করে না তখন তাতে শিল্পীর মুক্ত মন বিচিত্র চালে উল্লসিত হয়ে ওঠে এবং সৃজনশীলতার নতুন মাত্রা যোগ হয় শিল্পীর কাজে। সমর মজুমদারের কাজ দেখে আমার এ উপলব্ধি হয়েছে। সব কাজই যে সে মানে পৌঁছেছে তা তো বলা যাবে না। তবে তুলির নরম রেখায় মন্ময়ধর্মীতা রেণুর মতো আটকে থাকে আর সেসব রেখায় চিরকালের বাংলার নিসর্গের ও নিসর্গলীন মানুষের অভিব্যক্তিগুলো মনোহর মনোগ্রাম হয়ে হূদয়ে স্থায়ী ছাপ ফেলে, তারই দৃষ্টান্ত সমর মজুমদারের কাজ। বাংলার রূপ মন্ময়ধর্মীতায় জারিত করে শেধিত মুদ্রায় প্রকাশের প্রবণতা স্তিমিত হয়ে এসেছে। নন্দলালের হরিপুরা কংগ্রেস চিত্রমালা আর কামরুল হাসানের চিত্র সাধনার বড় একটি অংশ ওই দৃষ্টিভঙ্গিলগ্ন শিল্পের সাক্ষী।
প্রদর্শনীটি ঢাকা আর্ট সেন্টারে শুরু হয়েছে ১৯ মার্চ, চলবে ২৫ মার্চ পর্যন্ত।