গল্প
মিথিলার সম্পাদনা
প্রকাশ : ২০ মার্চ ২০১৪, ২০:২৫
দুটো বই আলোচনা অনুষ্ঠানের শেষে চা খেতে খেতে জাফর শামসকে সামনা সামনি পেয়ে প্রস্তাবটা দেয় মিথিলা। বিকেল সাড়ে পাঁচটার দিকে অনুষ্ঠানটা শুরু হয়, যদিও সময় দেওয়া ছিল পাঁচটায়। খুব সাদামাটাভাবেই অনুষ্ঠানের আয়োজন। মিথিলা মনে করে এরকমই হওয়া উচিত। আলোচনা অনুষ্ঠানটিতে মানুষ জড়ো হয়েছিল বাইশ জন। দুই লেখকের পাঁচজন করে বন্ধুমানুষ, দুজন আলোচক, একজন উপস্থাপক, দুজন ক্যামেরাম্যান, বাকি পাঁচজন বোদ্ধা পাঠক। অনুষ্ঠান শুরু হওয়ার আধঘণ্টা পর একজনকে দেখা গেল পাশের জনকে কোনো একটা কাজের কথা বলে উঠে যেতে। সাজানো কোনো মঞ্চ না থাকলেও দুটো সোফা রাখা ছিল। মাঝখানে একটা ছোট্ট টেবিল তার ওপরে কতগুলো তাজা গোলাপ আর বেশ অনেকগুলো রজনীগন্ধার স্টিকসহ একটা ফ্লাওয়ারভাস। রজনীগন্ধাগুলো দেশিই হবে কারণ বিকেলের আলো কমে আসতেই বেশ সুবাস বের হতে শুরু করে। ফুলগুলো যে কিনে এনেছে তার প্রশংসা করতেই হয় কারণ সে মোটা মোটা রজনীগন্ধাগুলো আনেনি, যেগুলো দেখতে ভালো হলেও কোনো সুবাস নেই। দেশি রজনীগন্ধার সুবাস পরিবেশটায় একটা ভিন্ন মাত্রা আনে।
যা-ই হোক, যার যখন বই আলোচনা হলো তখন তিনি একটি সোফায় গিয়ে বসলেন, তার বইয়ের আলোচক অন্য সোফায়। এভাবেই একসময় বইয়ের বিষয়বস্তুর আলোচনা ও লেখক সম্পর্কে কিছু ভালো ভালো কথা বলে অনুষ্ঠান শেষ হলো। একজন আলোচনা করতে যেয়ে মাত্রাজ্ঞান সামান্য একটু ছাড়িয়েছিলেন। অতটা বেশি না বললেও চলত। বইয়ের অসঙ্গতিপূর্ণ কোনো বিষয় বা সমালোচনা করার মতো হীনন্মন্যতা অবশ্যই কারও ছিল না! কিন্তু তাই বলে মাত্রাজ্ঞান ছাড়িয়ে বাড়িয়ে বলা! বিষয়টা লেখকের জন্য ক্ষতিকর বলে মনে হলেও সব কিছু মিলিয়ে মিথিলা বেশ উপভোগ করে।
জাফর শামস বলার চেষ্টা করে যে আর কারা কারা থাকছে মানে কাদের লেখা নেয়া হচ্ছে বইটিতে। মিথিলার কটাস করে বিস্কুটে কামড় দিয়ে সুড়ুত্ করে চায়ে চুমুকের শব্দে চমকিত হয়ে নিজের চায়ের কাপটা টেবিলে রাখে। একটু হলেই ছলাত্ করে পড়েছিল আর কি! গায়ে ধবধবে সাদা শার্ট! বিস্কুটে যে এমন কামড়ও দেওয়া হয়—এই প্রথম দেখে জাফর শামস! দেখে ক্লু-টা মাথায় রাখে। ‘কটাস করে বিস্কুটে কামড়’! গল্পকারদের এরকম সব ক্লু মাথায় রাখতে হয়, নইলে অত সহজ নয় একজন গল্পকার হয়ে ওঠা!
মিথিলা ঘাড়ের চুল সরিয়ে চেহারায় বসন্ত আনার চেষ্টা করা সত্ত্বেও অহঙ্কারী একটা ভাব চলে আসে চোখেমুখে, কাপটা টেবিলে রেখে একটা চোখ সরু করে বলে, হ্যাঁ, কী যেন বলছিলেন আপনি?
না তেমন কিছু না। বলছিলাম বের করবে কে? কী ধরনের বই। সম্পাদনা তো আপনিই করবেন, কিন্তু কোন প্রকাশনা থেকে বের হবে, ইত্যাদি।
এটা নিয়ে আপনি ভাবছেন কেন! ছোট গল্পের সংকলন। দশ-পনের জন মানসম্মত লেখকের গল্প নিয়েই ভাবনাটা মাথায় রেখেছি। আপনি একটা গল্প দিলে খুশি হব। দেরি করবেন না যেন, কেমন! আপনি তো জানেনই আমি কেমন চুজি! সেভাবেই দেবেন আশা করি! সামনের বইমেলা ধরার ইচ্ছে পোষণ করি। দেখবেন হট কেকের মতো বিক্রি হচ্ছে। মিথিলা রহমান বই করতে চাইলে এদেশের কোনো প্রকাশক না বলতে পারে না, জানেন তো!
তা অবশ্য জানতাম না। জানলাম। এরকম একটা সংবাদ কেন যে এত পরে জানলাম! আমি হলাম গিয়ে মনে প্রাণে একেবারে বিশ শতকের মানুষ, কোনো আপগ্রেড নেই, বুঝলেন তো। নো ফেসবুক, নো টুইটার। শুধুই হাত আর কলম! হা হা হা।
ওহ্ গড এখনো কলম! যাকগে, যে যেটাতে স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করে। ক্রিটিসাইজ করছেন নাকি সন্দেহ প্রকাশ করছেন? সে করতেই পারেন। কিন্তু আপনি ভালোই লিখছেন অনেকের চেয়ে, অস্বীকার করি কী করে! আজকাল তো সব যা লেখা। আর মেয়েদের অধিকাংশ লেখাই তো মেয়েলি টাইপের। কবে যে মেয়েরা বের হয়ে আসতে পারবে এই মেয়েলিপনা থেকে! একটা দুটা বই বের করেই রাতারাতি সাহিত্যিক! বোঝেন! একটা দুটা গান শিখেই যেমন রাতারাতি টিভি আর্টিস্ট বনে যাওয়া সেরকমই অনেকটা, নাকি বলেন!
টিস্যু দিয়ে লিপিস্টিক বাঁচিয়ে আলতো করে ঠোঁটের আশপাশের জায়গা মোছে মিথিলা। আঙুলের ডগা দিয়ে কপালের টিপের সঠিক উপস্থিতি অনুভব করে নিশ্চিত হয়। বিশ শতকের মানসিকতার মানুষটির সামনে ছোট্ট আয়নাটা বের করতে কিছুটা সংকোচ বোধ করে।
লেখালেখি তো আর কম দিন থেকে করছি না ম্যাডাম। দু-চার জন ভাগ্যবান লেখক ছাড়া লেখকদের দুনিয়া বড়ই ঝুঁকিপূর্ণ। মাঝে মাঝেই আগ্রহ হারিয়ে ফেলি। যারা বিখ্যাত হয়েছেন তাদের লেখাগুলো খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে পড়ি। আবার নিজেকে প্রস্তুত করি। এই সময়ে লিখে বাক্সবন্দি করে রেখে দিলে পঞ্চাশ বছর পর কেউ আর তা খুলে প্রকাশ করার আগ্রহ দেখাবে না। সে যুগ নেই। এখন সব কিছুই করপোরেট স্টাইলে হয়। নিজের ঢাক বাজানোর জন্য নানারকম কৌশলের প্রয়োজন হয়। যেমন ধরুন, ‘অমুক’ গুঁড়ো মশলার বিষয়টা। ওই ব্র্যান্ডের বিস্কুট আছে বাজারে কিন্তু গুঁড়ো মশলাটা নতুন। এখন পেপারে কিংবা টিভিতে যত বিজ্ঞাপন যাবে তত প্রচার। মিনিটে মিনিটে বিজ্ঞাপন। বিজ্ঞাপনের যন্ত্রণায় কঁকিয়ে উঠে মানুষ একসময় না একসময় প্রোডাক্টটা কিনবেই! অন্ততপক্ষে একটা প্যাকেট না কিনে তো এদেশে থাকার উপায় নেই, নয়! স্বতঃস্ফূর্তভাবে কোনো জিনিসের প্রশংসার দিন এখন প্রায় শেষ। এখন সব কিছুতেই হিরক রাজার দেশের ফর্মূলা চলছে। মগজে ঢুকিয়ে দেওয়া! আজকের বই দুটোর খবরটা কোনো দৈনিক পত্রিকায় যখন বের হবে হাজার হাজার মানুষ খবরটা পড়বে। বই দুটোর নাম জানবে, লেখকের নাম জানবে। বইদুটোর বিষয়বস্তু কী, কেমন এবং কোন মানের সেটা পরে বিবেচ্য। আপনি পত্রিকার লোক জোগাড় করে একটা অ্যারেঞ্জমেন্ট করতে পেরেছেন এবং খবরটা পত্রিকায় ছাপানোর ব্যবস্থা করতে পেরেছেন—এটাতেই চল্লিশ পারসেন্ট সাফল্য! এভাবে দু-তিনটে অ্যারেঞ্জমেন্ট যদি করতে পারা যায় তাহলে নামগুলো মানুষের মগজে মোটামুটি লেপ্টে দেওয়া যায়। লেপ্টে যাওয়া জিনিস মোছা কী কঠিন ব্যাপার সে তো জানেনই।
দুর-ও এত কথা শোনাতে কে বলেছে আপনাকে? গুঁড়ো মশলা টশলা দিয়ে বাদশাহি কাবাব বানিয়ে ফেললেন। কাবাবে লেবুর সঠিক প্রপোরশন না হলে মানে বেশি হলে কিন্তু তিতা হয়ে যায়, জানেন তো। নেগেটিভ টেনডেন্সি আর হতাশা নিয়ে ড্রামা! পজিটিভলি ভাবুন জাফর সাহেব। দেখবেন সব স্মুথ চলছে!
পজিটিভলি ভাবলেই সব স্মুথ চলে না, ম্যাডাম। যা-ই বলেন নেগেটিভ সাইডটাকে অস্বীকার করতে পারবেন না। একজন নামকরা লেখকের মুখ থেকেই শোনা, ‘লেখকদের একটুখানি নির্লজ্জ হতে হবে, তা না হলে যত ভালো কিছুই লিখেন না কেন, নো ভ্যালু’! কথাটা কেমন বিশ্রী শোনায় না? আসলেই কি তাই!
হ্যাঁ শুনতে খারাপ লাগে, কিন্তু এটাও সত্য।
আপনার লেখা কিন্তু চমত্কার। আমি বেশ পছন্দ করি।
নো ডাউট! লোকে বলে, শুনতে ভালো লাগে। আমার এবারের উপন্যাসটা পড়েছেন, না পড়ে থাকলে পড়ে নেবেন প্লিজ, না হলে কিন্তু মিস করবেন। চমত্কার একটা বিষয় নিয়ে লিখেছি।
আবার ঘাড়ের চুল সরায় মিথিলা। অহঙ্কারী ভাবটা আরও একটু গাঢ় হয়ে এলে বলে, আপনি যে সব বলছেন, সবই যুক্তিসংগত। তারপরেও কথা থাকে, যুগের সাথে তাল মেলানো! যাকগে, নতুন কী লিখছেন?
একটা উপন্যাস করার ভাবনা নিয়ে খাতা কলম নিয়ে বসছি, কিন্তু তেমন অগ্রগতি হচ্ছে না। বটতলার উপন্যাস লিখতে হলেও ধৈর্য সহকারে বিষয়ের গ্রহণযোগ্যতা তৈরি করতে হয়, নাকি বলেন!
একশ ভাগ সত্যি। আজকে যে বইটার ওপর আপনি আলোচনা করলেন, সত্যি করে বলুন তো, বইটি আপনার কেমন মনে হয়েছে? যদিও আমি বইটি পড়িনি, সব বই পড়ার সময়ও পাই না, তবে আমার মনে হয়েছে বিষয়বস্তু বেশ নতুন। এখন কথা হলো উপস্থাপন করা নিয়ে। যদি পেঁচিয়ে পেঁচিয়ে এক কথা বার বার উপস্থাপন করা হয়, তাহলে ওটা একেবারেই বাতিল, কী বলেন? এছাড়া লেখার ভেতর যদি হিউমার না থাকে তাহলে লেখা অ্যাট্রাকটিভ হয় না। ছোটগল্পের বিষয়টায় আমি মনে করি বৈচিত্র্য থাকা চাই ফরমেটের।
সে তো বটেই। আমি একমত। তো, উনি আমার বন্ধু মানুষ। একেবারে খারাপ লেখেন না, আবার এ প্লাসও পেতে পারেন না। চলুন যাওয়া যাক, সবাই প্রায় বের হয়ে গেছে।
আরও পনের জন লেখককে ফোন করে মিথিলা। বই সম্পাদনা করা কি সহজ ব্যাপার! একজন লেখকের চেয়ে একজন সম্পাদকের দায়িত্ব হাজার গুণ বেশি! পনের জন লেখককে ফোন করার যে অভিজ্ঞতা তা দিয়েই চমত্কার একটা বই হয়ে যেতে পারে, ভাবে মিথিলা। বিষয়টা মাথায় রাখে। গতবারের বইটা করতে যেয়ে দারুণ সব অভিজ্ঞতা, এক ভদ্রলোক তার প্রেমে পড়ার জন্য উইগ পরা শুরু করে দিয়েছিল। মাথার অনেকটা জুড়েই ছিল টাক। ভদ্রলোক ফোন করে করে একেবারে হিপনোটাইজ করে ফেলেছিল তাকে। কোন রংয়ের শাড়িতে তাকে অপ্সরীর মতো লাগবে, কোন রংয়ের শাড়িতে ড্যাম স্মার্ট, কোনটাতে বয়স দশবছরের মতো কম মনে হবে ইত্যাদি বলে বলে মিথিলার মাথা বিগড়ে দিয়েছিল প্রায়। মানুষ তো! ভাগ্যিস পাখনা গজানোর আগেই আচ্ছন্ন ভাবটা কেটে গেল মিথিলার। এই বয়সে অপ্সরীর মতো লাগতে পারে কি না, বিষয়টা নিয়ে ভাবতেই খানিকটা গবেষণার মতো অনুসন্ধান শুরু করলে পরিষ্কার হলো। নইলে হয়েছিল আরকি! তার সোনার সংসার তামার বাসন কোসন হয়ে যেত! যদিও ইবলিশ স্বামীটিকে শায়েস্তা করার গোপন একটা ইচ্ছে তার আছে! সুযোগ পেলে করবেও! বয়সটা এখন আর কোনো বিষয় নয়, একটা সংখ্যা মাত্র। চল্লিশ থেকে পঞ্চাশ, পঞ্চাশ থেকে ষাট। এই বয়সেও এখন ধুরধার প্রেমে পড়ে যাচ্ছে অনেকেই। দু-একটা নতুন প্রেম থাকাটাই এখন একটা স্ট্যাটাস মনে করছে অনেকেই। তো, মিথিলা ভেবেছিল সেই সুযোগটা বোধহয় তারও এসে গেছে! কিন্তু ওরে বাবা, ইনি তো আর এক কাঠি সায়ানাইড! সায়ানাইড গেলার আগেই ভাগ্যিস তার হুঁশ হয়েছিল!
উহ্, মানুষ এত বেশি কথা বলে কেমন করে! চটর চটর ঘটর ঘটর! ফোন ধরলে আর ছাড়ার নাম নেই! এক লাইনের কথাকে সতের লাইনে বলার চেষ্টা। ‘জানেন তো আমার না....’। আরে বাবা লেখা চেয়েছি, লেখা দিবা, এত প্রশ্ন কেন! একটা উন্নতমানের গ্রন্থে তোমার গল্পটা স্থান পাবে—এটা কি কম ভাগ্যের ব্যাপার। সতের লাইন কথা শোনা মানে কমপক্ষে দশ টাকার ফোন বিল। পনের জনের সাথে সতের লাইন করে কথা বললে একশ পঞ্চাশ টাকার বিল সন্দেহ নেই। এটা তো কেবল শুরু। এর পর তো আরও ফোনাফুনি গোনাগুনি আছেই। এসব গোনাগুনি কথাশিল্পীদেরও জানতে হবে, লাইনের পর লাইন বাক্য তৈরি করলেই শুধু চলবে না। ‘ওয়ার্ড কাউন্ট’-এর বিষয়টা মাথায় রাখতে হবে!
কয়েক বছর একটা লিটল ম্যাগাজিন চালিয়েছে মিথিলা, আর্থিক সংকটের কারণে বন্ধ করে দিতে হয়েছে। কিন্তু সম্পাদনা বিষয়টায় দুর্বলতাটা রয়ে গেছে। সম্পাদকের জায়গায় নিজের নামটা দেখার প্রবল তাড়না অনুভব করে মাঝে মাঝেই। এর আগে কিছু চিঠিপত্রের একটা সম্পাদনা করেছিল। এবার একটা ছোটগল্পের সংকলনের ভাবনায় মস্তিষ্কের নিউরন আন্দোলিত। লেখক হিসেবে মোটামুটি একটা সফলতা তার আছে। আমজনতা না জানলেও সাহিত্য সমাজে তার পরিচিতি অস্বীকার করার উপায় নেই। যারা অস্বীকার করার চেষ্টা করে তারা কুচুটে টাইপের। তাদের দ্বারা ভালো কোনো কাজ কখনোই হয় না। তো, সেই ভরসাতেই পনের জন লেখকের কাছে গল্প চেয়ে ফোন করা। একজন তো বলেই ফেললেন, সম্মানী দেওয়া হবে কি না। সম্মানী না দিলে গল্প দিতে পারবেন না। অযৌক্তিক নয় বিষয়টা তারপরেও শোনার সাথে সাথে কানে খটাস করে লাগে। লেখকদের বুঝতে হবে, এই যে এরকম একটা বইয়ে তার গল্পটা ইতিহাস হয়ে থেকে যাবে—এর মূল্য কতখানি। পঞ্চাশ বছর পর কোনো গবেষক এরকম একটা বইয়ের গল্পগুলোকে গবেষণার বিষয়বস্তু হিসেবে বেছে নেবেন, মিথিলার বিশ্বাস। তাই অত্যন্ত সতর্কতার সাথে গল্প বাছাই করতে হবে। বন্ধু-বান্ধবরা গল্প পাঠিয়ে দিলেই হবে না, মানসম্মত হতে হবে। এতে অভিমান করে যদি কেউ বন্ধুত্ব না রাখতে চায়, কিচ্ছু করার নেই মিথিলার। মুখে কিছু না বলতে পারলেও সে ইমেইল করে জানিয়ে ক্ষমা চেয়ে নেবে। এটুকু ভদ্রতা অবশ্যই সে করবে। সব কথা কি আর মুখে বলা যায়? যায় না।
পনেরটা গল্প বাছাই করে ফেলে মিথিলা। চার জন দুটো করেও পাঠিয়েছিল। সবগুলো রাখতে পারলে বইয়ের স্বাস্থ্যটা ভালো দেখা যেত, কিন্তু উপায় নেই। ফর্মার ব্যাপার আছে। প্রকাশক ঠিক হয়ে গেছে। বইটি বের করতে পারলে প্রকাশক ধন্য হবেন—এরকমটাই বলেছেন। তবে কথা আছে...।
ফোনে সবাইকে জানায় মিথিলা। গল্প বাছাই হয়ে গেছে। প্রুফ দেখাও শুরু হয়ে গেছে। তার আগে সে নিজে খুব ভালো করে পড়ে দেখেছে, কিছু সংশোধন করতে হয়েছে। খুব সহজ কাজ নয়। এর আগেরটায় কিছু ভুলত্রুটি হয়ে গিয়েছিল, এবার আর হতে দেবে না। এবার বেশি পয়সা খরচ করে প্রফেশনাল প্রুফরিডারকে দিয়ে কাজটা করিয়ে নেবে। প্রচ্ছদও নামকরা শিল্পীকে দিয়েই করাবে। বই হাতে নিয়ে পাঠক যেন কোনো ত্রুটি খুঁজে বের করতে না পারে, এরকমই ব্যবস্থা নিচ্ছে সে। জাফর শামস ফোনে একদিন বইটির খরচ বিষয়ক একটা কথা বলার চেষ্টা করলে মিথিলা একুশ শতক স্টাইলে মৃদু তিরস্কার করে। জাফর শামস তার বন্ধু মতোন। এটুকু মৃদু তিরস্কার করা যেতেই পারে!
সে নিয়ে আপনি ভাবছেন কেন! বলেছি না আপনাকে...। আপনি শুধু ভালো একটা গল্প দেন। ব্যাস। আমারও একটা গল্প থাকছে। অতএব মোট ষোলটা গল্প। আট ফর্মার মতো হবে হয়তো। একেবারে চিকন আকারের নয়, কি বলেন! জানেন তো, আমার মোটা বই দেখতে ও পড়তে ভালো লাগে। একটা মোটা আকারের বই হাতে নিলে মনে হয়, হ্যাঁ, পড়ছি একটা বই।
আমারও অবশ্য এরকম একটা ব্যাপার আছে। এখানে বোধহয় আপনার সাথে মিল হয়ে যাচ্ছে কি বলেন। হা হা হা।
আরে কিছু কিছু মিল না থাকলে কি বন্ধুত্ব হয়!
পনের জনের সাথে ফোনে কথা বলার সময় সতর্কতা অবলম্বন করা সত্ত্বেও প্রায় একশ ত্রিশ টাকার মতো ব্যালেন্স শেষ হয়ে যায় মিথিলার। এটুকু অবশ্য করতেই হতো! তাও তো সবাই ইমেইল করে লেখা পাঠিয়েছে, নইলে কম্পোজের বিষয়টাও এসে যেত। এই একটা সাংঘাতিক সুবিধা হয়েছে, মেইলে লেখা জোগাড় হয়ে যাওয়া। সম্পাদনার বিষয়টা সে কারণে অনেকটাই সহজ হয়ে গেছে। তারপরেও একশ ত্রিশ টাকার ফোন বিল ওঠার পরেও যে কথাটা সে ফোনে কাউকে বলতে পারেনি বা বলেনি সেটা ইমেইল করে পাঠায়। এটা না করে উপায় ছিল না! বিষয়টা আগে থেকেই তাকে এভাবেই ভেবে রাখতে হয়েছে।
ইমেইল—মাননীয় লেখক, সম্পাদিত বইটি অবশ্যই দশটি করে কিনে বন্ধু-বান্ধবদের উপহার দিন। আপনার লেখা সম্পর্কে গভীর করে বন্ধুদের জানতে দিন! ধন্যবাদ। মিথিলা রহমান।