শহীদুল জহিরের একটি কাল্পনিক সাক্ষাত্কার
প্রকাশ : ২০ মার্চ ২০১৪, ২০:২৬
শহীদুল জহিরকে (১১ সেপ্টেম্বর ১৯৫৩—২৩ মার্চ ২০০৮) আমি দেখিনি। শহীদুল জহিরকে আমি দেখেছি; তাঁর সদাজ্যান্ত আখ্যানসমুচ্চয় শারীরিক অনুপস্থিতিকে যেন তুড়ি মেরে উড়িয়ে দেয়। তখন অনায়াসে আমি কথা বলি শহীদুল জহিরের সঙ্গে। কী স্বাভাবিক-স্বাচ্ছন্দ্যে অতীত-বর্তমান-ভবিষ্যত্ কালসীমা চূর্ণ করে তিনি বলে চলেন তাঁর কথা! পাঠক, পড়ে দেখুন—কোনো প্রতিকথার জন্ম হয় কি না ...
জনাব শহীদুল জহির, আপনাকেই খুঁজছি; ঠিক এই মুহূর্তে কোথায় পাব আপনাকে?
—এই বসন্তে আমার ডলু নদীর তীরে একটু ঘুরে আসতে পারেন। ডলু নদীর বাসন্তী হাওয়ায় পেলেও পেতে পারেন আমাকে কিংবা সমসাময়িক জীবন ও রাজনৈতিক বাস্তবতার আড়ালে চুপটি করে বসে থাকতেও দেখতে পারেন আমাকে। আর সেখানেও যদি না পান তাহলে ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশনের শ্যামাপ্রসাদ চৌধুরী লেন থেকে উত্তর ঢাকার র্যাডিসন ব্লু-এর বিদেশি ডোনার-এনজিও আর দেশি সুশীলদের বাংলাদেশ বিষয়ক হরেক কিসিমের ইন্দুরবিলাই খেলার দর্শক হিসেবে দেখা যেতে পারে এই নিরুপায় আখ্যান-লেখক শহীদুল জহিরকে।
সেদিন আপনার ওপর একটা সেমিনার শুনছিলাম। আমলা-সভাপতির বক্তব্যে একরোখা কথাকার শহীদুল জহিরের বদলে যেন বাধ্যগত সিভিল সার্ভেন্ট শহীদুল হকের চেহারাই ভেসে উঠল আমাদের কাছে। তো, কতটা স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন আপনি এই দ্বিবিধ চরিত্রে?
—আপনারাতো আমার পাঠক। আমার ‘আবু ইব্রাহিমের মৃত্যু’ উপন্যাসিকা এবং আরও কিছু লেখাপত্রে একটু মনোযোগ দিলে লক্ষ করবেন, মাও সেতুং-এর একটি কথা আমি প্রায়ই উদ্ধৃত করি—‘কিছু কিছু মৃত্যু হাঁসের পালকের চেয়েও পলকা আর কিছু মৃত্যু হয় থাই পাহাড়ের চেয়েও ভারী’। তো লিখতে যখন আমি বসি তখন হাঁসের পালকের মতো পলকা হয়ে মরতে থাকে আমার আমলাসত্তা। থাকে বললে ভুল হবে, বলা দরকার এই সত্তার মৃত্যু না ঘটলে আমি এক কলমও লিখতে পারব না, তবে আমার কাছে ভয়াবহ ছিল সিভিল সার্ভিসের নিয়মকানুনের খোঁড়ল। থাই পাহাড়ের মতো ভারী হয়ে যেন মৃত্যু না ঘটে আমার লেখকসত্তার, এই নিয়ে আমি সচেতন ছিলাম। কিন্তু এ বিষয়ে আমি খুব মজা পেলাম দেখে যখন আমার মৃত্যুর পর কিছু পত্রিকা মৃত্যুসংবাদ ছাপল ‘সরকারের পার্বত্য চট্টগ্রাম মন্ত্রণালয়ের ভারপ্রাপ্ত সচিব জনাব শহীদুল হকের ইন্তেকাল’ শিরোনামে। ওই মজা পর্যন্তই; এর বেশি অনুরণন তোলার মতো ঘটনা এগুলো আমার কাছে মনে হয় না, নিজের জীবনের অভিজ্ঞতায় আপনাদের শুধু এটুকু বলতে পারি—লেখকের সৃজনশীল হাতের কাছে অনুগতের ভৃত্য হাত শেষত নতজানু হতে বাধ্য।
আপনার আখ্যানের চরিত্ররা যেন প্রসাধনহীন, মনে হয় না গল্প-উপন্যাসের জন্য এরা তৈরি হয়েছে। যেন চিরকাল তারা আমাদের সাথেই ছিল। আপনার গল্প বা উপন্যাসের কাঠামোর সঙ্গে যেন জীবনপথে পাঠকের দেখা হয়ে যায় অনায়াসে। এত নির্লিপ্ত-নিরাসক্ত-নৈর্ব্যক্তিক কীভাবে আপনি?
—দেখেন, রূপকথার রাজকন্যা আর কোটালপুত্রের গল্পলেখার সৌভাগ্য আমার হয়নি। বা ইচ্ছে পূরণের ফর্মাবদ্ধ ফ্যান্টাসি আমার হাতে ছিল না। আমি আমার লেখার রাস্তায় যখনই হাঁটতে বেরুতাম তখন খুব স্বাভাবিকভাবেই পথে পড়ত দক্ষিণ মৈশুণ্ডি কবরস্থান, গেণ্ডারিয়া নারী শিক্ষা মন্দির, ওয়ারির সিলভারডেল স্কুল কিংবা নয়নতারা ফুলবিহীন আগারগাঁও কলোনি। আমার সাথে হাঁটতে হাঁটতেই কথা হতো উত্তর বাংলার খৈমন কিংবা চাটগাঁর খারকোশের। এরা ছিল আমার প্রাত্যহিকের সঙ্গী। তাই তাদের জন্য আলাদা কোনো শিল্পের মোড়ক তৈরি করতে হয়নি আমাকে। এরা তাদের নিজস্ব ধরনে, স্বভাবে ও ভাষায় লতিয়ে উঠেছে আমার কলমবৃক্ষের শাখায়-প্রশাখায়।
আপনার সম্পর্কে সবচেয়ে আগ্রহোদ্দীপক বিশেষণ এই যে আপনি জাদুবাস্তবতাবাদী লেখক; একটু ব্যাখ্যা করে বলুন যেন আমরাও বুঝে উঠতে পারি আপনার এই জাদু আর বাস্তবতার রসায়ন।
—আগ্রহোদ্দীপক বলছেন কেন? আমিতো মনে করি এটা আমার সম্পর্কে অত্যন্ত চটকদার ও ভ্রান্তি-উত্পাদক বিশেষণ। আপনারা তো আমার ‘জীবন ও রাজনৈতিক বাস্তবতা’ পড়েছেন। আজ ২০১৪ সালে আপনারা তো যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের দাবিতে সোচ্চার আর আমি তো গত শতকের আশির দশকেই নির্যাতিত মোমেনার মুখকে বাংলাদেশের অদৃশ্য প্ল্যাকার্ড বানিয়ে রংবেরংয়ের বদু মোল্লার বিচারের দাবি তুলেছি। এই যদি জাদুবাস্তব হয় তাহলে বাস্তবটা কী! হ্যাঁ, জাদুবাস্তব আপনি বলতে পারেন আমার আখ্যানের চরিত্র মোমেনার সেই প্রশ্নকে, যে বুঝে উঠতে পারে না—এ কী খল সময় এল যে রাজাকার আর মুক্তিযোদ্ধার মধ্যে যে সময় কোনো প্রভেদ টানতে পারে না? এই কালপরিস্থিতি যদি জাদুবাস্তব হয় তবে আমার লড়াই তো তারই বিরুদ্ধে।
মিলান কুণ্ডেরার মতো আমিও শিল্পের মধ্য দিয়ে জারি রাখতে চেয়েছি বিস্তৃতির বিরুদ্ধে স্মৃতির সংগ্রাম।