বুদ্ধদেব বসুর কবিতা
শীতভাবনার পাঠ-প্রতিক্রিয়া
প্রকাশ : ২০ মার্চ ২০১৪, ২০:২৬
‘আমি যদি ম’রে যেতে পারতুম/ এই শীতে,/ গাছ যেমন ম’রে যায়,/ সাপ যেমন ম’রে থাকে/ সমস্ত দীর্ঘ শীত ভ’রে’।
কবিতাটি বুদ্ধদেব বসুর। সেই বুদ্ধদেব বসু যাঁর নাম শুনলেই আমাদের সামনে একজন বহুমাত্রিক প্রতিভাবান জিনিয়াসের মুখ ভেসে ওঠে। সময়ের ব্যবধানে যিনি বেশি পরিচিত রবীন্দ্রবলয় ভাঙা ত্রিশি নতুন কাব্য আন্দোলনের সম্পাদক হিসেবে। যিনি কবিতা, গল্প, উপন্যাস, নাটক ও অসংখ্য গদ্য লেখার পাশাপাশি আমাদের সামনে প্রথম তুলে ধরেন বোদলেয়ার আর রিলকের কবিতার অনুবাদ।
‘এই শীতে’ কবিতাটি ১৯৪০ সালে প্রকাশিত তাঁর ‘নতুন পাতা’ বইয়ের অন্তর্ভুক্ত।
আশ্চর্য কবিতাটির শুরুতেই একজন কেউ চাইছেন মরে যেতে। মৃত্যুর জন্য তিনি বেছে নিয়েছেন শীতকালকে। কিন্তু মৃত্যুর জন্য শীতকাল কেন? মৃত্যুর পর আমাদের শরীর শীতল হয়ে যায় বলেই কি এই ইচ্ছা? নাকি বিষয়টা অন্য কিছু। কবিতাটি পড়তে পড়তে এগোতে থাকলে দেখা যায়, নিজ মৃত্যুকামনাকারী ব্যক্তিটি কোনো স্বাভাবিক মৃত্যু চান না, তিনি চান তার মৃত্যু যেন হয় গাছের ঘুমের মতো, সাপের খোলস বদলের জন্য চুপচাপ থেমে থাকার সময়ের মতো। তিনি আমাদের মনে করিয়ে দেন শীত এলেই গাছ তার শরীর থেকে পাতা ঝেরে ফেলে ঘুমিয়ে পড়ে। সাপ বদলে ফেলে শরীরের চামড়া। সারাটা শীতকাল সাপ আর বের হয় না গর্ত থেকে।
দেখা যাচ্ছে ব্যক্তিটির এই ইচ্ছামৃত্যু একেবারে হারিয়ে যাওয়ার মৃত্যু নয়। এই মৃত্যু... একটি নির্দিষ্ট মৌসুমের জন্য, হয়তো কেবলমাত্র এই শীতকালের জন্যই। কবিতাটির প্রথম প্যারার পরের পঙিক্তগুলোর দিকে তাকালেই আমরা দেখতে পাব মৃত্যুকামনাকারী ব্যক্তিটি প্রকৃতিতে মিশে গিয়ে প্রকৃতির নিয়মেই পুনরায় জেগে উঠতে চাইছেন নতুন উদ্যমে, আমাদের শোনাচ্ছেন শীতের পরের বসন্তের কথা—‘শীতের শেষে গাছ নতুন হ’য়ে ওঠে,/ শিকড় থেকে ঊর্ধ্বে বেয়ে ওঠে তরুণ প্রাণরস,/ ফুটে ওঠে চিক্কণ সবুজ পাতায়-পাতায়/ আর অজস্র উদ্ধত ফুলে।/ আর সাপ ঝরিয়ে দেয় তার খোলশ,/ তার নতুন চামড়া শঙ্খের মতো কাজ-করা;/ তার জিহ্বা ছুটে বেরিয়ে আসে আগুনের শিখার মতো,/ যে-আগুন ভয় জানে না।’
লক্ষ করার বিষয়, শীতের দীর্ঘ বিরতির পর প্রকৃতি যে পুনরায় অতিরিক্ত উচ্ছ্বাস নিয়ে জেগে ওঠে এর কারণ হিসেবে কবির দার্শনিক অনুভূতি নির্দিষ্ট একটি সময়ের জন্য প্রকৃতির নিজেকে ঘুম পাড়িয়ে রাখার ক্ষমতাকেই মূল শক্তি মনে করে। যে ঘুমকে মৃত্যুর সাথে তুলনা করা যায়—‘কেননা তারা ম’রে থাকে/ সমস্ত দীর্ঘ শীত ভ’রে,/ কেননা তারা মরতে জানে’। ফলে এই মৃত্যু যেন কোনোভাবেই অনাকাঙ্ক্ষিত নয় তার কাছে বরং কাঙ্ক্ষিত।
বুদ্ধদেব বসুর কবিতার ব্যক্তিটি চান এক দীর্ঘঘুমের মতো মৃত্যুর পর পুনরায় জেগে উঠতে। বলা চলে তিনি পরিপূর্ণ পুনর্জন্ম চান, হয়ে উঠতে চান সাপের জিহবার মতো চৌকস। কিন্তু বুদ্ধদেব বসুর মৃত্যুকামনাকারী ব্যক্তিটির এই ধরনের সাময়িক ইচ্ছামৃত্যু চাওয়া কেন? এই ধরনের ইচ্ছে তো আমাদেরও হয় কখনো কখনো। বিশেষ করে মানসিক দুঃসময়গুলোতে। ভাবি, দীর্ঘ একটা ঘুম শেষে যদি জেগে দেখতাম সব ঠিক হয়ে গেছে। আবার যদি নতুনভাবে শুরু করতে পারতাম সমস্ত কিছু, যদি শুধরে নিতে পারতাম পেছনের সমস্ত ভুলগুলো।
প্রশ্ন জাগে, কবিতায় সাময়িক নিজের মৃত্যুকামনাকারী ব্যাক্তিটি কে? তিনি কী করেন? কেনই বা তিনি চাচ্ছেন এভাবে সাময়িভাবে পালাতে। তিনি কি মুখোমুখি এমন কোনো দুঃসময়ের, যা শেষ হওয়ার প্রতীক্ষায় আছেন?
কবিতাটির শেষ প্যারায় এসে আমরা জানতে পারি ব্যক্তিটির পরিচয়। ব্যক্তিটি একজন কবি, তিনি চাইছেন জীবনের একঘেয়েমি থেকে বের হয়ে সমস্তকিছুই নতুনভাবে, সফলভাবে শুরু করতে। সৃষ্টিশীলতায় নিজেকে তুষ্ট করতে না পেরে এবং জীবনের জটিল ঘূর্ণিপাকে পড়ে মানসিকভাবে ক্লান্ত হয়ে চাইছেন যেন একটা শীতকাল পুরোপুরি ধ্যানমগ্ন হয়ে পরিপূর্ণ বিশ্রাম নিতে। তাই তিনি শেষ প্যারাতে এসে লেখেন, ‘যদি আমিও ম’রে থাকতে পারতুম—/ যদি পারতুম একেবারে শূন্য হ’য়ে যেতে,/ ডুবে যেতে স্মৃতিহীন, স্বপ্নহীন অতল ঘুমের মধ্যে—/ তবে আমাকে প্রতি মুহূর্তে ম’রে যেতে হ’তো না/ এই বাঁচার চেষ্টায়,/ খুশি হবার, খুশি করার,/ ভালো লেখার, ভালোবাসার চেষ্টায়’।
কবিতাটি শেষ করে আমাদের মনে প্রশ্ন জাগে, এই কবিতার ব্যক্তিটি কি কবি নিজেই? উত্তর খুঁজতে গিয়ে মনে হয়, কবি নিজে হলেও, এই অনুভূতি কখনো কখনো আসলে পৃথিবীর সমস্ত সৃষ্টিশীল মানুষেরই!
আমি যদি ম’রে যেতে পারতুম
এই শীতে,
গাছ যেমন ম’রে যায়,
সাপ যেমন ম’রে থাকে
সমস্ত দীর্ঘ শীত ভ’রে।
শীতের শেষে গাছ নতুন হ’য়ে ওঠে,
শিকড় থেকে ঊর্ধ্বে বেয়ে ওঠে তরুণ প্রাণরস,
ফুটে ওঠে চিক্কণ সবুজ পাতায়-পাতায়
আর অজস্র উদ্ধত ফুলে।
আর সাপ ঝরিয়ে দেয় তার খোলশ,
তার নতুন চামড়া শঙ্খের মতো কাজ-করা;
তার জিহ্বা ছুটে বেরিয়ে আসে আগুনের শিখার মতো,
যে-আগুন ভয় জানে না।
কেননা তারা ম’রে থাকে
সমস্ত দীর্ঘ শীত ভ’রে,
কেননা তারা মরতে জানে।
যদি আমিও ম’রে থাকতে পারতুম—
যদি পারতুম একেবারে শূন্য হ’য়ে যেতে,
ডুবে যেতে স্মৃতিহীন, স্বপ্নহীন অতল ঘুমের মধ্যে—
তবে আমাকে প্রতি মুহূর্তে ম’রে যেতে হ’তো না
এই বাঁচার চেষ্টায়,
খুশি হবার, খুশি করার,
ভালো লেখার, ভালোবাসার চেষ্টায়।
(এই শীতে )