ঘুরে দাঁড়িয়েছে অদম্য তোফাজ্জল
প্রকাশ : ২০ মার্চ ২০১৪, ২১:৫৯
শাহীনবাগ সিভিল এভিয়েশন উচ্চ বিদ্যালয়ে বছরের প্রথম সিটি পরীক্ষার একটি হল। প্রথম বেঞ্চে বসে বাঁ হাতে পরীক্ষা দিচ্ছে তোফাজ্জল। ডান হাতে হাত মোজা। ৪র্থ শ্রেণির শিক্ষার্থী হওয়ায় স্বভাবিকভাবে এটা তার জীবনের প্রথম পরীক্ষা নয়। তবে তার চেয়ে বেশি তাত্পর্যপূর্ণ হলো বোমা হামলায় ডান হাতের কব্জি হারানোর পর এবারই সে পরীক্ষা দিতে বসেছে। মায়ের মনে শঙ্কা ছিল সে কি আবার পড়তে পারবে! মায়ের অনুশোচনা পড়াশুনা ছাড়া কি করবে ছেলে। সেই অনুশোচনাকে শক্তি করে নিজে নিজে বাঁ হাত দিয়ে লেখা অনুশীলন করে তোফাজ্জল। একদিন ঠিক রপ্ত করে ফেলে বাঁ হাতে লেখা। মা ফরিদা আক্তারের আশা, পড়াশুনা করে একদিন ছেলে একটা সাধারণ চাকরি অন্তত করতে পারবে। শিক্ষকরা বলেন, মনোবল তৈরিতে উত্সাহিত করতে পারলে তোফাজ্জলের অদম্য ইচ্ছা আর মেধা তাকে এগিয়ে নিয়ে যাবে।
তোফাজ্জলের বয়স দশ বছর। গত ২০ নভেম্বর মহাখালীর সিভিল এভিয়েশন কোয়ার্টারে বাসার পাশে পড়ে থাকা বোমা নিয়ে খেলতে গিয়ে সে আহত হয়। তারপর থেকে তার চারবার অপারেশন হয়েছে। এবার ক্ষতস্থানের চামড়া প্রতিস্থাপন করা হয়। বিভিন্ন পত্রিকায় প্রতিবেদন হয়। সহযোগিতা আসে না তেমন। বাড়ি ফিরে তোফাজ্জল তার সহপাঠিদের দেখে তাদের মতো করে খেলতে আর পড়তে উদ্বুদ্ধ হয়। হাতে তুলে নেয় কলম। তোফাজ্জল বলে, বাংলা লিখতে তার বেশি কষ্ট হয়েছিল। তবে এখন আর কষ্ট নেই । দিব্যি লিখে যায়, আগের চেয়ে একটু ধীরে হয় এই যা। তবে সে মনে করে আগের মতো করেই লিখতে পারবে একদিন।
সিভিল এভিয়েশন উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক সূধন্য কুমার বাড়ৈ বলে, ছেলেটি মেধাবী এবং আগ্রহী হওয়ায় আমরা তাকে বার্ষিক পরীক্ষা ছাড়াই প্রমোশন দিয়ে ৪র্থ শ্রেণিতে ভর্তি করাই।
দরিদ্র হওয়ায় স্কুল থেকে কিছু সহযোগিতা করাসহ সম্পূর্ণ বিনা বেতনে পড়ার সুযোগ দেয়ার ব্যবস্থা প্রক্রিয়াধীন আছে। বন্ধু জয়,সিব্বির আবিদ জানায়, তারা তোফাজ্জলের সাথে ক্রিকেট ও ক্যারাম খেলে। তোফাজ্জল এক হাতে ভাল ব্যাট করে। এই অবস্থায় রিক্সা চালক বাবা জামালউদ্দিন, আর একটু আধটু আয় করা মা ফরিদা আক্তার তোফাজ্জলের ভবিষ্যত্ নিয়ে অনিশ্চিত বোধ করছেন। তোফাজ্জলের পড়াশুনাসহ হাতে চিকিত্সার দায়িত্ব নিতে অপারগ তারা। গতবছর রাজনৈতিক সহিংসতায়— তোফাজ্জলের মতো প্রায় ২০ জন শিশু আহত হয়েছে বলে গণমাধ্যমে প্রকাশ পায়। তাদের মধ্যে একজন তোফাজ্জল আজ এক হাত নিয়ে ঘুরে দাঁড়াবার চেষ্টা করছে। সমাজের আর কোন হাত কি পারে না তার অন্য আর এক হাত হতে এমন প্রশ্ন করেন, তোফাজ্জলের শ্রেণি শিক্ষক আব্দুল মান্নান মোল্লা।