বীমা
কোম্পানীর
বর্তমান
হালচাল
প্রকাশ : ২১ মার্চ ২০১৪, ১৯:১২
রাজনৈতিক সহিংসতার বিরূপ প্রভাব পড়েছে বীমা ব্যবসায়। টানা হরতাল অবরোধে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড ব্যাহত হওয়ায় গতবছরে বেশির ভাগ বীমা কোম্পানীর ব্যবসা কমে গেছে। একই সঙ্গে লক্ষ্য পূরণে ব্যর্থ হয়েছে অনেক কোম্পানী। সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, রাজনৈতিক অস্থিরতার কারণে ২০১৩ সালে বীমা খাতের ব্যবসায় আগের বছরের চেয়ে অন্তত ১২ থেকে ১৫ শতাংশ কমে গেছে
শিল্প বাণিজ্য অঙ্গনে বীমা শিল্প একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ। আমাদের দেশের ব্যবসা-বাণিজ্য বীমা শিল্পের উপর অনেকটা নির্ভরশীল। বিশেষ করে আমদানি-রপ্তানি বাণিজ্য এবং শিল্প-কারখানার সমস্ত কর্মকাণ্ড সাধারণ বীমা শিল্পের সাথে সম্পৃক্ত। বিদেশ থেকে পণ্য আমদানি করতে হলেও বীমা করতে হয়। শিল্প-কারখানা প্রতিষ্ঠা করলে এর নিরাপত্তার জন্য অগ্নিবীমা করতে হয়। দেশের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে বীমা শিল্পটি বিশেষ অবদান রেখে যাচ্ছে। দেশ স্বাধীন হওয়ার পর একমাত্র রাষ্ট্রায়ত্ত সাধারণ বীমা কর্পোরেশন বীমা শিল্পের সব কর্মকাণ্ড পরিচালনা করত। এতে করে দেশের ব্যবসায়ী, শিল্পপতিদের ভীষণ অসুবিধা হত। দেশের ব্যবসায়ী এবং শিল্পপতিদের সুবিধার্থে ১৯৮৫ সালের দিকে সর্বপ্রথম বেসরকারি পর্যায়ে সাধারণ বীমা কোম্পানী খোলার অনুমতি প্রদান করা হয়। প্রাথমিক অবস্থায় ১১টি বেসরকারি সাধারণ বীমা কোম্পানী ব্যবসা শুরু করে। পরবর্তীতে ধীরে ধীরে সাধারণ বীমা কোম্পানীর সংখ্যা বাড়তে বাড়তে এখন ৪৪ এ পৌঁছেছে। বর্তমানে আমাদের দেশে ৪৪টি সাধারণ বীমা কোম্পানী ব্যবসা করছে। আমাদের মত ক্ষুদ্র এবং গরীব রাষ্ট্রে এতগুলো সাধারণ বীমা কোম্পানীর প্রয়োজনীয়তা কতটুকু তা বোধগম্য নয়। কারণ আমাদের দেশে সীমিত সংখ্যক এবং নির্ধারিত অঙ্কের ব্যবসা নিয়ে এতগুলো কোম্পানীর মধ্যে তীব্র প্রতিযোগিতা চলে। বীমা কোম্পানীগুলো বীমা ব্যবসা পাওয়ার জন্য বিভিন্ন ধরনের কৌশল অবলম্বন করে থাকে। অনেক বীমা কোম্পানীর কর্মকর্তা বীমা গ্রাহককে বিভিন্ন প্রলোভন দেখাতে দুনীর্তির আশ্রয় নিয়ে থাকেন। বিশেষ করে বীমা প্রিমিয়ামের উপর নির্ধারিত কমিশন নিয়ে চলে অসুস্থ্য প্রতিযোগিতা। যদিও আইডিআরএর (বীমা নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষের) সার্কুলার অনুযায়ী বীমা প্রিমিয়ামের উপর কমিশন প্রদানের কোন নিয়ম নেই। কিন্তু আমাদের দেশের কতিপয় সাধারণ বীমা কোম্পানী বীমা গ্রাহককে বীমা প্রিমিয়ামের উপর মাত্রাতিরিক্ত কমিশন দিচ্ছে। এতে করে বীমা কোম্পানীগুলোর মধ্যে চলছে এক নোংরা প্রতিযোগিতা। বীমা প্রিমিয়ামের উপর এত বেশি কমিশন দেয়া হচ্ছে যে বীমা প্রিমিয়ামের টাকা আর বেশি অবশিষ্ট থাকে না। কিছু বীমা কোম্পানি কোন পদ্ধতিতে এত বেশি কমিশন প্রদান করে তা রহস্যজনক।
অভিযোগ রয়েছে, বীমা প্রিমিয়ামের অংক কম দেখিয়ে এবং বীমার পুনঃবীমা না করে গ্রাহককে বেশি কমিশন প্রদান করে থাকে। যা সম্পূর্ণ বেআইনী। অতিরিক্ত কমিশন প্রদানকারী বীমা কোম্পানীগুলো বীমাদাবি নিষ্পত্তির সময় বীমা গ্রাহককে নানাভাবে হয়রানির মধ্যে ফেলে দেয়। এতে করে বীমা কোম্পানীগুলোর দুর্নাম হয়ে থাকে। কোম্পানীগুলো আইডিআরএর নির্দেশ মতে চললেও কিছু বীমা কোম্পানী ঐ নির্দেশ মানছে না। তারা মর্জিমাফিক ব্যবসা করে যাচ্ছে। এতে করে ভালো বীমা কোম্পানীগুলো ব্যবসায়িকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। এ ব্যাপারে আইডিআরএর হস্তক্ষেপ জরুরি হয়ে পড়েছে। তাছাড়া রাজনৈতিক সহিংসতার বিরূপ প্রভাব পড়েছে বীমা ব্যবসায়। টানা হরতাল অবরোধে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড ব্যাহত হওয়ায় গতবছরে বেশির ভাগ বীমা কোম্পানীর ব্যবসা কমে গেছে। একই সঙ্গে লক্ষ্য পূরণে ব্যর্থ হয়েছে অনেক কোম্পানী। সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে রাজনৈতিক অস্থিরতার কারণে ২০১৩ সালে বীমা খাতের ব্যবসায় আগের বছরের চেয়ে অন্তত ১২ থেকে ১৫ শতাংশ কমে গেছে। এছাড়া গাড়ি ভাংচুর ও অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা বৃদ্ধি পাওয়ায় অনেক কোম্পানী আর্থিক চাপে পড়েছে। ২০১৩ সালের অক্টোবর মাস থেকে সহিংসতা ভয়াবহ রূপ ধারণ করায় বীমা কোম্পানীগুলোতে ক্ষতিপূরণের দাবির চাপ বেড়েছে। বাড়তি দাবি পরিশোধের খেসারত দিতে গিয়ে অনেক কোম্পানীর আয় কমে গেছে। রাজনৈতিক অস্থিরতার কারণে অর্থনীতির অন্যান্য খাতের মত বীমা খাতও মন্দার কবলে পড়েছে। বর্তমানে বীমা শিল্প বড় দুঃসময় অতিক্রম করছে। বাংলাদেশ ইন্স্যুরেন্স এসোসিয়েশন সূত্রে জানা গেছে ২০১২ সালে সাধারণ বীমা কোম্পানীগুলো প্রায় ১ হাজার ৯০০ কোটি টাকার ব্যবসা (প্রিমিয়াম আয়) করেছে। সাধারণত বাংলাদেশে বার্ষিক বীমা ব্যবসায় (সাধারণ) প্রবৃদ্ধির হার গড়ে ১০ থেকে ১২ শতাংশ। কিন্তু ২০১৩ সালে এই প্রবৃদ্ধি হয়নি। উল্টো আরো কমে গেছে।
বীমা ব্যবসা অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের সাথে সরাসরি জড়িত। রাজনৈতিক অস্থিরতার কারণে দেশের আমদানি-রপ্তানি কার্যক্রম চরমভাবে ব্যাহত হয়েছে। ব্যাংকগুলোতে কোন বীমা গ্রাহক পণ্য আমদানীর জন্য এলসি খুলেনি। অন্যদিকে বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবাহ কমে যাওয়ায় শিল্প-কারখানা স্থাপন কমে গেছে। এর বিরূপ প্রভাব অগ্নিবীমার উপর পড়েছে। নৌ-বীমা এবং অগ্নিবীমা ব্যবসার উপর বীমা কোম্পানীগুলো নির্ভরশীল। এসব ব্যবসা কমে গেলে বীমা কোম্পানীগুলোর ব্যবসা একেবারে নিচে নেমে এসেছে এবং এসব কোম্পানীগুলো আর্থিকভাবে চরম ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।