কিডনি রোগের ঝুঁকি: করণীয়
প্রকাশ : ২১ মার্চ ২০১৪, ১৯:৫১
বিগত ২০০৬ সাল হতে প্রতিবছরই মার্চ মাসের ২য় বৃহস্পতিবার ‘বিশ্ব কিডনী দিবস’ পৃথিবীর সবদেশে পালিত হয়। এই দিবস উদযাপনের মূল উদ্দেশ্য নীরব ঘাতক কিডনি রোগের ভয়াবহতা সম্পর্কে সারা দুুনিয়ার মানুষকে অবহিত করা এবং কিডনি বিকল প্রতিরোধের জন্য সবাইকে সচেতন করা। বিভিন্ন উপাত্ত থেকে জানা যায় কিডনি রোগের হার দিন দিন মহামারী আকারে বৃদ্ধি পাচ্ছে। যদি সময় মত চিকিত্সা না করা হয় তবে কিডনি রোগের শেষ পরিনতি দীর্ঘস্থায়ী কিডনি রোগ। দীর্ঘস্থায়ী কিডনি রোগ মাসের পর মাস, বছরের পর বছর ধরে স্থায়ী ভাবে কিডনির গঠন ও কার্যক্ষমতা নষ্ট করতে থাকে। এভাবে পাঁচটি ধাপে কিডনি বিকলের দিকে অগ্রসর হয়। প্রথম চারটি ধাপ পর্যন্ত চিকিত্সার মাধ্যমে নিরাময় অথবা যে গতিতে কিডনি ক্ষয় হচ্ছে তা অনেক কমিয়ে আনা যায়। তবে একবার পাঁচ নম্বর ধাপে চলে গেলে তখন বেঁচে থাকার উপায় হলো ডায়ালাইসিস অথবা কিডনি সংযোজন, যা এতটাই ব্যয় বহুল যে আমাদের দেশের শতকরা দশ ভাগ লোকেরও সাধ্য নেই এই চিকিত্সা চালিয়ে যাবার। তাই এই ঘাতক ব্যাধি থেকে বাঁচার একমাত্র উপায় হল কিডনি বিকল
প্রতিরোধ করা।
এবারের বিশ্ব কিডনি দিবসের প্রতিপাদ্য বিষয় হলো Chronic Kidney disease and ageing অর্থাত্ বয়সের সাথে বাড়ে দীর্ঘস্থায়ী কিডনি রোগ। আর একটি সত্য এভাবে বলা যায় যে, ‘আপনার কিডনির বয়স ঠিক আপনার মত’ অর্থাত্ আপনি যখন যৌবনে, আপনার কিডনির ক্ষমতাও যৌবনে, আপনি যখন বয়স্ক আপনার কিডনিও বয়সের ভারে ক্ষয়প্রাপ্ত। গবেষণায় দেখা গেছে ৪০ বছর বয়সে কিডনির রক্ত প্রবাহ ৬০০ সিসি, প্রতি মিনিটে, পক্ষান্তরে ৮০ বছর বয়সে তা কমে দাড়ায় ৩০০ সিসি/মিনিট। ৭০ বছর বয়সে কিডনির ক্ষমতা অর্ধেক হয়ে যায়। বয়সের সাথে বাড়ে ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপ, প্রস্রাব প্রবাহে বাধা জনিত রোগ, মূত্রতন্ত্রের প্রদাহ ইত্যাদি। এসব কারণে দীর্ঘস্থায়ী কিডনি রোগের হার বয়স্কদের মাঝে অনেকগুন বেশী। এক সমীক্ষায় দেখা গেছে যাদের বয়স ষাটের বেশী তাদের প্রতি তিন জনের মধ্যে এক জনের দীর্ঘস্থায়ী কিডনি রোগ বিদ্যমান। আর একটি
দুঃসংবাদ হলো যে, যাদের দীর্ঘস্থায়ী কিডনি রোগ আছে তাদের ১ জনের যদি মূত্যু হয় কিডনি সম্পূর্ণ নষ্ট হয়ে, তার প্রেক্ষিতে ১০ থেকে ৪০ জনের মূত্যু হয় কিডনি রোগের কারণে হার্ট এ্যাটাক, ব্রেইন ষ্ট্রোক অথবা রক্ত নালীর রোগে আক্রান্ত হয়ে। অর্থাত্ দীর্ঘস্থায়ী কিডনি রোগ অন্য রোগের জন্ম দেয়।
দিন যতই যাচ্ছে বয়স্ক লোকের সংখ্যা বাড়ছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা-এর পরিসংখ্যাণ অনুযায়ী এই সংখ্যা ২০৩০ সালে দ্ব্বিগুন এবং ২০৫০ সালে তিন গুন হবে। বাংলাদেশে এই সংখ্যা বাড়বে আরও অনেক বেশীগুনে। বয়সের রোগ বিশেষ করে কিডনি রোগও সেই হারে বাড়বে। এ জন্য সরকারকে এখন থেকে এদের চিকিত্সার মহাপরিকল্পনা প্রনয়ণ করতে হবে। বিভিন্ন সমীক্ষায় জানা যায় বাংলাদেশে প্রায় দুই কোটিরও অধিক লোক কোন না কোন কিডনি রোগে আক্রান্ত। কিডনি রোগে আক্রান্ত হয়ে প্রতি ঘন্টায় অকাল মৃত্যুবরণ করছে পাঁচ জন লোক।
যাদের উচ্চরক্তচাপ, ডায়াবেটিস, নেফ্রাইটিস আছে- তাদের কিডনি রোগের সম্ভাবনা সবচেয়ে বেশি। আমাদের দেশে শতকরা ৮০ ভাগ কিডনি এই তিন কারণে নষ্ট হয়ে থাকে। ঘনঘন কিডনিতে ইনফেকশন, পাথরজনিত রোগ, প্রস্রাব প্রবাহে বাধা, বয়স চল্লিশ এর উর্দ্ধে, স্থূলতা, ধূমপান, অতিমাত্রায় এন্টিবায়োটিক ও তীব্রবেদনা-নাশক ওষুধ সেবন, অলস জীবনযাপন এবং রোগের অন্যান্য কারণ। মাত্র দুটি পরীক্ষায় জানা যায় কিডনি রোগ আছে কিনা এবং একটি সহজ সমীকরনে বের করা যায় কিডনি শতভাগে কতভাগ কাজ করছে। একটি হলো প্রস্রাবে এলবুমিন বা মাইক্রোএলবুমিন যায় কিনা এবং অন্যটি রক্তের ক্রিয়েটিনিন। একটু লক্ষ করলেই বুঝা যাবে, একটু সচেতন হলেই এবং একটু কষ্ট করে যদি লাইফ স্টাইল বা জীবনযাত্রার প্রনালী বদলীয়ে স্বাস্থ্যকর উপায়ে চলা যায় তবে কিডনি বিকল হওয়ার এ সকল কারণ নিয়ন্ত্রন করা সম্ভব এবং প্রতিরোধ করা সম্ভব জীবন নাশা কিডনি বিকল। যদিও কিডনি রোগের হার বয়স্কদের মাঝে বেশী। এরোগের সূত্রপাত কিন্তু হয় যৌবন কালের আগ থেকেই। তাই সুস্থ লাইফ স্টাইল চর্চার অভ্যাস গড়ে তুলতে হবে স্কুলে যাবার বয়স থেকেই। নিম্নে কিডনি ভালো রাখার কতগুলো টিপস দেয়া হলো। এ নিয়মগুলো সবাই মেনে চললে শুধু যে কিডনি বিকল রোধ হবে তা নয়, প্রতিরোধ করা যাবে অন্যান্য সকল ঘাতক ব্যধি।
কিডনি ভাল রাখার উপায় সমূহ
ডায়াবেটিস আক্রান্ত রোগীদের নিয়মিত রক্তের শর্করা এবং প্রস্রাবের অ্যালবুমিন পরীক্ষা করা ও রক্তের হিমোগ্লোবিন এ-ওয়ান সি (HbA1c) সাত এর নীচে রাখা।
উচ্চ-রক্তচাপে আক্রান্ত রোগীদের রক্তচাপ নিয়ন্ত্র্রণে রাখা (১৩০/৮০ এর নীচে, যাদের প্রস্রাবে অ্যালবুমিন থাকে তাদের ১২০/৭০ এর নীচে) ।
ডায়াবেটিস ও উচ্চরক্ত চাপে আক্রান্ত রোগীদের কিডনির কার্যকারিতা প্রতি ৬ মাস অন্তর পরীক্ষা করা ।
শিশুদের গলা ব্যথা, জ্বর ও ত্বকে খোশ-পাঁচড়ার দ্রুত সঠিক চিকিত্সা করা উচিত্। কারণ এগুলো থেকে কিডনি প্রদাহ বা নেফ্রাইটিস রোগ দেখা দিতে পারে ।
ডায়রিয়া, বমি ও রক্ত আমাশয় এর কারণে রক্ত, পানি ও লবণ শূন্য হয়ে কিডনি বিকল হতে পারে। তাই দ্রুত খাবার স্যালাইন খেতে হবে। প্রয়োজনে শিরায় স্যালাইন দিতে হবে।
ধূমপান বর্জন করুন, ওজন নিয়ন্ত্রণে রাখুন ও নিয়মিত ব্যায়াম করুন ।
চর্বি জাতীয় খাবার ও লবণ কম খাবেন এবং পরিমিত পানি পান করবেন ।
চিকিত্সকের পরামর্শ ব্যতীত এন্টিবায়োটিক ও তীব্র ব্যথার ওষুধ সেবন না করা ।
প্রস্রাবের ঘনঘন ইনফেকশনের জন্য প্রয়োজনীয় চিকিত্সা নিতে হবে।
সুষম খাবার খাবেন যেখানে অন্যান্য খাবারের সাথে থাকবে প্রচুর শাকসবজি ও ফলমূল ।
আসুন এবারের ‘বিশ্ব কিডনি দিবস' থেকে বিষ্ময়কর কার্যক্ষম এই ছোট্ট দুটো কিডনির প্রতি যত্নশীল হই এবং কিডনি ভালো রাখতে উপরের টিপ্স গুলো প্রতিদিন চর্চা করি। সবাই মিলে আওয়াজ তুলি-
“কিডনি রোগ জীবন নাশা, প্রতিরোধই বাঁচার আশা”