কী খাচ্ছি আমরা
প্রকাশ : ২১ মার্চ ২০১৪, ২১:৫২
জনবহুল রাস্তা, গাড়ি-রিকশার অবিরাম চলাচল। সন্ধ্যা হয়েছে অনেকক্ষণ। নদ্দা বাজার সংলগ্ন নদ্দা বাসস্ট্যান্ড। খোলা ঠেলাগাড়িতে মোমবাতি জ্বালিয়ে তেলেভাজা চানাচুর, নিমকি, মুড়কি, বাতাসা বিক্রি করছে এক কিশোর। মাঝবয়সি এক মহিলা (নাতি হবে বোধহয়) একটি আধময়লা গেঞ্জি পরা এক বালককে নিয়ে দাঁড়ালেন। অনেক দর কষাকষি করে মুড়কি কিনলেন পাঁচ টাকার। তুলে দিলেন বালকটির হাতে। তার একটু আগেই দেখে এলাম বয়স চল্লিশেক বয়সের এক দাড়িওয়ালা মুসুল্লি যান ও মানুষ চলাচলরত ধুলিধূসর রাস্তার পাশে কুপিবাতি জ্বালিয়ে পেঁয়াজু বিক্রি করছেন। কড়াইতে রাখা তেলের চেহারা কালচে হয়ে গেছে। সামনের অ্যালুমিনিয়ামের ট্রেতে রাখা পেঁয়াজুর বেশিরভাগই বিক্রি হয়ে গেছে। যা বাকি আছে, তা কিনতেও ক্রেতা অবশিষ্ট আছে নিশ্চয়ই। নইলে বসে থাকা কেন? যা হোক, পাঁচটাকার মুড়কি পেয়ে বালকটির চোখজোড়া যখন খুশিতে চকচক করে উঠলো; তা দেখে বিক্রেতা, ক্রেতা উভয়ের ওপর আমার ভীষণ রাগ হলো। বালকটি আনন্দে ঐ মহিলার সঙ্গে চলে যাবার পর আমি কষে এক ধমক লাগালাম দোকানিকে—‘খাবার ঢেকে বেচতে পারো না?’ ধমক খেয়ে চুপসে গেলো বেচারা। তড়িঘড়ি করে বাক্স-ঠেলাগাড়ির ভেতরের কুঠুরি থেকে টুকরো টুকরো পলিথিন বের করে খাবারগুলো ঢাকতে লেগে গেলো।
ক’দিন আগে মোহাম্মদপুর গিয়েছিলাম। কাজ শেষে ফেরার পথে দেখলাম প্রিপারেটরি উচ্চ মাধ্যমিক বিদ্যালয় (বালক শাখা)-এর সামনে ছাত্ররা স্কুলের কেচিগেটের ফাঁক দিয়ে হকারদের কাছ থেকে কিনে খাচ্ছে বিভিন্ন রকমের আচার, ঝালমুড়ি। ছোট ছোট শিক্ষার্থীর চিত্কার-চেঁচামেচিতে কান পাতা দায়। সবাই হকারদের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে চেঁচিয়ে যাচ্ছে সমান তালে। উদ্দেশ্য একটাই—যাতে তাদের চাহিদা মোতাবেক খোলা খাবারটি হকার দ্রুত পরিবেশন করে। অথচ আশ্চর্যের ব্যাপার, কিছু অভিভাবক বাচ্চাদের এসব দৃশ্য দেখেও তেমন পাত্তা না দিয়েই নিজেরা নিজেদের গল্পে মেতে আছেন।
মিরপুর ১০-এর ফলপট্টি লাগোয়া মূল সড়ক থেকে রাস্তাটি এঁকেবেঁকে জনতা হাউজিং পর্যন্ত চলে গেছে। ফলপট্টি থেকে একটু সামনে এগুলেই মিরপুর ব্যাপ্টিস্ট চার্চ সংঘ। এ সংঘের উত্তর দেয়াল ঘেঁষা ফুটপাতের ওপর গড়ে উঠেছে কিছু খোলা খাবারের দোকান। এখানে মাংসের চপ, কাটলেট, ডিমের বড়া ও নুডুলসসহ অনেক খাবারই পাওয়া যায়। নামমাত্র ঢেকে রাখা এসব খাবার খাচ্ছেন সচেতন অনেকেই শুধু মুখরোচক বলে। এ রাস্তার ধার ঘেঁষেই বেশ ক’টি স্কুল। শিক্ষার্থীও খাচ্ছে বড়দের দেখাদেখি। মিরপুর ২-এর স্টেডিয়ামের বাইরের রাস্তায় খোলা খাবার বিক্রি হচ্ছে এভাবেই।
এরকম দৃশ্য হরহামেশাই দেখা যাবে ঢাকা শহরের বিভিন্ন জায়গায়। এসব খাবারের রকমফের থাকলেও (আচার, ঝালমুড়ি, চানচুর মাখা, কাসুন্দি মাখানো ফল বিশেষত পেয়ারা- কামরাঙা কিংবা ঘুগনি, পেঁয়াজু, ছোলা সেদ্ধ, কাটা পেঁপে, কাটা আনারস, চটপটি, ফুচকা, হালিম, সসপেনের রঙিন শরবত, ঘোল বা মাঠা) বিক্রি ও পরিবেশন হচ্ছে একই রকমভাবে অর্থাত্ খোলামেলা। রাস্তায় পথচারীদের হাঁটা-পায়ের ওড়ানো ধূলা, গাড়ির ধোঁয়া, বাতাসে উড়ে আসা গাছের ঝরা পাতা জীবাণু বহন করে এনে ফেলছে এসব খাবারে।
ভোক্তাদের রসনার তোড়ে স্বীকার করতে বাধ্য হচ্ছি— হ্যাঁ, এসব খাবার মুখরোচক। তবে এর সঙ্গে এও জানাচ্ছি— খাবারগুলো স্বাস্থ্যের পক্ষে মারাত্মক ক্ষতিকর। বাংলাদেশ সরকার জনস্বাস্থ্যের কথা বিবেচনা করে ‘বাংলাদেশ স্ট্যান্ডার্ডস অ্যান্ড টেস্টিং ইনস্টিটিউশন অর্ডিন্যান্স ১৯৮৫’ জারি করেছে। এর আগে মানুষের ভোগের জন্য খাদ্য প্রস্তুত ও বিক্রি নিয়ন্ত্রণের উদ্দেশ্যে ‘বিশুদ্ধ খাদ্য অধ্যাদেশ ১৯৫৯’ জারি হয়।
কিন্তু বাস্তবতা হচ্ছে, প্রচণ্ড ধূলাময়লা পড়ছে খাবারের ওপর, ঢাকনা নেই। খাবারে ধূলি-ময়লা, মাছি যাতে না বসতে পারে তা নিশ্চিতকরণের আইন আছে, যথার্থ বাস্তবায়ন নেই। ফলে একদিকে দেদার বিক্রি হচ্ছে খোলা খাবার, আর স্বাস্থ্যহানিতে ধুঁকছে নাগরিক। কর্মব্যস্ত জীবনের কঠিন বাস্তবতায় আমরা বাধ্য হচ্ছি নগরের অলিতেগলিতে গড়ে ওঠা খাদ্য পরিবেশনকারী হোটেল-রেস্তোরাঁয় খেতে কিন্তু কতটুকু মানসম্পন্ন খাবার খেতে পারছি আমরা?
বড়দের চেয়ে শিশুদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কম। ওরাও খাচ্ছে খোলা খাবার, ভেজাল খাবার। দিনে দিনে গোটা নগরবাসী আক্রান্ত হচ্ছি নানার অসুখে। এর প্রতিকার কীভাবে? আইনের সঠিক প্রয়োগের মাধ্যমে? খোলা খাদ্য বর্জন করতে গণসচেতনতা সৃষ্টির মাধ্যমে? খাদ্য পরিবেশন প্রতিষ্ঠানগুলোর মানসম্মত খাদ্য পরিবেশনার মাধ্যমে? নাকি প্রয়োজন সবগুলোরই!
ঢাকা