অস্তিত্ব সংকটে রয়েল বেঙ্গল টাইগার
মাহবুব রনি, সুন্দরবন থেকে ফিরে
প্রকাশ : ২১ মার্চ ২০১৪, ২২:৫৬
সুন্দরবনের প্রতীক রয়েল বেঙ্গল টাইগার। বনের অভিজাত প্রাণীও এটি। বিশ্বে একমাত্র সুন্দরবনেই দেখা মিলে ‘প্যান্থেরা টাইগ্রিস টাইগ্রিস’ প্রজাতির এ বাঘের। অথচ সুন্দরবনের এই অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ, জাতীয় পশু রয়েল বেঙ্গল টাইগারের অস্তিত্বই এখন হুমকির সম্মুখীন। বনের ভিতরে এবং বাইরে হত্যা করা হচ্ছে বাঘ। তাদের জন্য কমছে নিরাপদ আশ্রয়স্থল ও মিঠা পানির উত্স। ব্যাহত হচ্ছে পশুটির বংশবিস্তার। দুর্যোগ ও মানবসৃষ্ট নানামুখী কারণে এ পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে বলে জানিয়েছেন বন সংশ্লিষ্টরা।
এ প্রসঙ্গে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক মো. আবুল বাশার বলেন, সুন্দরবনের প্রতিবেশগত ভারসাম্য রক্ষার জন্য বাঘের সুষম উপস্থিতি জরুরি। বনের নিরাপত্তা ও সুরক্ষা নিশ্চিত করতে বাঘ অতন্দ্র প্রহরীর ভূমিকা পালন করে। কিন্তু মানুষের হামলা, পাচার, প্রাকৃতিক দুর্যোগসহ নানা কারণে বাঘের অস্তিত্ব হুমকির মুখে। প্রতিবেশগত ভারসাম্য রক্ষার জন্যই বনে কত বাঘ রয়েছে, কত বাঘ হারাচ্ছি কিংবা কত বাঘ বাড়ছে তা জানা দরকার। এজন্য আধুনিক পদ্ধতি ব্যবহার করে বাঘের প্রকৃত সংখ্যা নিরুপণ এবং সংরক্ষণের ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে।
বন অধিদপ্তর এবং সুন্দরবনের পশ্চিম ও পূর্ব বিভাগ থেকে প্রাপ্ততথ্য মতে, সর্বশেষ ২০০৯ সালে বন বিভাগ এবং ওয়াইল্ড লাইফ ট্রাস্ট অব বাংলাদেশে’র এক জরিপে সুন্দরবনে ৪০০ থেকে ৪৫০টি বাঘ রয়েছে বলে জানা যায়। বাঘের পায়ের চিহ্নের উপর ভিত্তি করে এ জরিপ পরিচালনা করা হয়। তবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বাঘের পায়ের ছাপ অনুসরণ করে সংখ্যা নির্ণয় পদ্ধতি বিজ্ঞানসম্মত ও সঠিক নয়। ক্যামেরা ট্যাপিং পদ্ধতি এক্ষেত্রে যথার্থ তথ্য দিতে পারে। এ প্রসঙ্গে বন কর্মকর্তা মো. আমীর হোসাইন চৌধুরী বলেন, বর্তমানে ক্যামেরা ট্রাপিংয়ের মাধ্যমে সুন্দবরনে বাঘ গণনার কাজ চলছে। ক্যামেরা ট্রাপিং অনেকেটা মানুষের ফিঙ্গার প্রিন্টের মত পদ্ধতি। এর মাধ্যমে বাঘের সঠিক সংখ্যা জানা যাবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।
মরছে বাঘ : সুন্দরবনের পশ্চিম ও পূর্ব বিভাগের দেয়া তথ্য মতে, ২০০১ থেকে ২০১২ সাল পর্যন্ত মানুষের হামলায় অন্তত ৩২টি বাঘ মারা গেছে। ১৯৮০ থেকে ২০০০ সাল পর্যন্ত ৩৩টি বাঘ হত্যা করে শিকারীরা। বছরে প্রায় তিনটি বাঘ হত্যা বা শিকার হয়। ২০১৩ এবং চলতি বছরে মানুষের হামলায় বাঘের মৃত্যুর তথ্য পাওয়া যায়নি। তবে এ সময় অনেকগুলো বাঘ হত্যা এবং হামলার শিকার হয়ে আহত হয়েছে বলে জানিয়েছেন স্থানীয় অধিবাসীরা।
যে কারণে মরছে :বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সুন্দরবন এলাকায় পানির লবণাক্ততা বাড়ছে। বাঘ মিষ্টি পানি পান করে। এছাড়া সিডর ও আইলার কারণে বনের অভ্যন্তরে কিছু স্থানে মিঠা পানির উত্স ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। তাই মিঠাপানির খোঁজে বাঘ লোকালয়ের দিকে আসে। এ যাতায়াতকালে বাঘ মানুষের উপর হামলা করে। পরিপ্রেক্ষিতে মানুষও বাঘের উপর হামলা করে। এছাড়া বাঘ নিজের ও বাচ্চার নিরাপত্তা বিষয়ে সবসময়ই সতর্ক থাকে। বনের ভিতরে মৌয়ালি, বাওয়ালি, জেলেদের প্রবেশে সে নিরাপত্তাহীনতায় ভোগে। আর বনে প্রবেশকারীরাও পর্যাপ্ত নিরাপত্তা ব্যবস্থা গ্রহণ করে না। তাই বাঘ মানুষের উপর হামলার সুযোগ পায়। সংঘর্ষে বাঘ ও মানুষের প্রাণহানি ঘটে। এছাড়া বনের ভিতর লবণাক্ত পানির আধিক্য, সমুদ্রের উচ্চতা বৃদ্ধি এবং বনে অনুপ্রবেশকারীদের যাতায়াত বৃদ্ধি হওয়ায় বাঘের ‘হোম রেঞ্জ’ বা বিচরণ এলাকা পরিবর্তিত হয়ে যায়। এতেও মানুষের উপর বাঘের হামলার আশংকা তৈরি হয়। অন্যদিকে বাঘের খাদ্য তালিকায় সবেচেয়ে প্রিয় হরিণ। কিন্তু সুন্দরবনে হরিণসহ অন্যান্য বাঘ-খাদ্য কমতে শুরু করায় খাবারের সন্ধানে বাঘ লোকালয়ে চলে আসে কিংবা সামনে পেলে মানুষের উপর হামলা করে।
এ প্রসঙ্গে সুন্দরবন পশ্চিম বিভাগের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা জহিরউদ্দিন আহমেদ বলেন, সুন্দরবনে একটি বাঘের সাধারণ বিচরণস্থল বিস্তৃত থাকে ১৪ থেকে ১৬ বর্গকিলোমিটার জুড়ে। পরিবেশ বা মানুষের কারণে এটি বিঘ্নিত হলে কিংবা খাবারের অভাব হলে বাঘ হিংস্র হয়ে উঠে এবং তার ‘হোম রেঞ্জ’ ত্যাগ করে। ফলে বাঘ-মানুষ সংঘর্ষ ঘটে।
পাচারের অভিযোগ:সুন্দরবনের বাঘের জন্য সবচেয়ে বড় হুমকি পাচার। দেশি-বিদেশি চক্র বাঘ পাচারে জড়িত বলে ধারণা বন সংস্লিষ্টদের। তারা জানান, চীন ও পূর্ব এশিয়ার দেশগুলোতে বাঘের অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের চাহিদা রয়েছে। কয়েকটি দেশে বাঘের অঙ্গপ্রত্যঙ্গ ওষুধ হিসেবেও ব্যবহূত হয়। আবার অনেকে বাঘ পালনেরও শখ করেন। এ চাহিদা মেটাতে সুন্দরবনের বাঘ হত্যার পাশাপাশি পাচারও করা হয়।
প্রসঙ্গত, ২০১১ সালে ঢাকার শ্যামপুরের একটি বাসা থেকে বাঘের তিনটি বাচ্চা উদ্ধার করে আইন-শৃংখলা রক্ষাকারী বাহিনী। এ বছরই সুন্দরবনের পাশের এলাকা থেকে বাঘের তিনটি চামড়া এবং চারটি মুন্ডু উদ্ধার করা হয়। সম্প্রতি বনের ভিতরে জাহাজ-মানুষের চলাচলে বন বিভাগের নিয়ন্ত্রণ কিছুটা কমে যাওয়ায় পাচারের ঝুঁকি আরো বেড়েছে। তবে বাঘ পাচাররোধে বন অধিদপ্তর অপরাধ নিয়ন্ত্রণ ইউনিট চালু করেছে বলে জানিয়েছেন উপ-বন সংরক্ষক জহিরউদ্দিন আহমেদ।