দুর্নীতিবাজদের কঠোর শাস্তি দিন

দুর্নীতি বাংলাদেশের এক চলমান ও চিরচেনা সমস্যা। নিম্নবিত্তদের চেয়ে সমাজের উচ্চবর্গের লোক, সরকারের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তারাই এর সঙ্গে বেশি সম্পৃক্ত। বাংলাদেশের প্রায় প্রতিটি ক্ষেত্রেই দুর্নীতির পরিমাণ উদ্বেগজনকহারে বাড়ছে। দুর্নীতি যেন আমাদের অভ্যাসে পরিণত হয়েছে। সুযোগ পেলেই যেন তার অসত্ ব্যবহার করার একটা মানসিকতা কাজ করে দুর্নীতিবাজ চোরদের মধ্যে। ভোগবাদী মানসিকতা এবং দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির অভাবই এর পিছনে মূল কারণ হিসেবে কাজ করে। বিশেষ করে সেবা, শিক্ষা ও ভূমি খাতের দুর্নীতি আমাদের আতঙ্কিত করছে। সেবা খাতগুলোর মধ্যে পাসপোর্ট বিভাগ সর্বাধিক দুর্নীতিগ্রস্ত। ট্রান্সপারেসি ইন্টারন্যাশনাল (টিআইবি)র তথ্যমতে ৭৭ শতাংশ মানুষকে এখান থেকে সেবা নিতে এসে ঘুষ প্রদান বা দুর্নীতির শিকার হতে হচ্ছে। এই খাতে এর পরের অবস্থানে আছে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। এখানে এসে দুর্নীতির শিকার হতে হয় ৭৪.৬ শতাংশ মানুষকে। এছাড়াও স্বাস্থ্য, শিক্ষা, বিদ্যুত্, গ্যাস, বিচারিকসহ অন্তত ১৬টি খাতের সেবা পেতে বছরে আট হাজার ৮২১ কোটি ৮০ লাখ টাকা ঘুষ দিতে হয় বলে টিআইবির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে। বাংলাদেশ রেলওয়ের লোকসান সার্বজনীন ব্যাপার। কয়েক দফা ভাড়া বাড়ানোতেও এর লোকসান যেন পিছু ছাড়ছে না। কেননা দুর্নীতির ব্যাপকতা গ্রাস করে আছে রেলওয়েকে। রেলওয়ের প্রচুর জায়গা দখল করে আছে প্রভাবশালী মহল। রেলের তেল চুরি এখনো বন্ধ হয়নি। আবার রেলওয়ের টিটি হতে পারলে নাকি লাইফ সেটেল্ড। কারণ অসংখ্য যাত্রী আছে যারা টিকিট ছাড়া যাতায়াত করে। দশদিনে একদিন টিটির হাতে ধরা পড়লে টিটিকে টাকা দিলেই সমস্যা সমাধান। যার ফলে টিটির ব্যবসাও বেশ রমরমা। তাহলে রেলওয়ের লোকসান কি শুধু ভাড়া বাড়ালেই ঘুচবে? দুর্নীতিগ্রস্ত আরেকটি বড় খাত স্বাস্থ্যখাত। এখানে চাকরি পাওয়া, বদলি, পদোন্নতিসহ এগারোটি সেক্টরে দুর্নীতি চলছে বলে অভিযোগ করেছে দুদক। অর্থের লোভে ডাক্তাররা বিভিন্ন কোম্পানির সাথে চুক্তিবদ্ধ হয়ে তাদের নিম্নমানের ওষুধ লিখে দিচ্ছে। যা সেবন করে সুস্থ হওয়ার পরিবর্তে আবারো ডাক্তারের কাছে যেতে হচ্ছে। সরকারি হাসপাতালগুলোতে সরকার কর্তৃক বিনামূল্যে যে ওষুধগুলো দেওয়ার কথা সাধারণ মানুষকে না দিয়ে এগুলো কালোবাজারে বিক্রির অভিযোগ তুলেছে দুদক। বিভিন্ন প্রাইভেট হাসপাতালের বিরুদ্ধে আইসিউতে লাশ আটকে রেখে বাণিজ্যের অভিযোগও আছে। রোগী মারা যাওয়ার পরেও লাইফ সাপোর্ট দিয়ে বেঁচে আছে বলে ওরা হাতিয়ে নিচ্ছে লাখ লাখ টাকা। কেন এই দুর্নীতি বন্ধ করা যাচ্ছে না? এর পেছনে কয়েকটি কারণ থাকতে পারে। প্রথমত রাজনৈতিক সদিচ্ছার অভাব। আমাদের দেশে যখন যে দল ক্ষমতায় বা সরকারে থাকে তাদের দলের নেতাকর্মী কিংবা দলীয় ছত্রচ্ছায়ায় অনেকেই দুর্নীতি করেও পার পেয়ে যায়। দলের উপর থেকে দায় এড়াতে সরকারও এই ধরনের অপরাধগুলো ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টা করে। আরেকটি কারণ হচ্ছে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির অভাব। ‘চোরের দশদিন গৃহস্থের একদিন’ বলে একটি কথার প্রচলন আছে। দুর্নীতিবাজরাও কিন্তু একদিন চুরি করেই ধরা পড়ে না। ১০০ কোটি টাকা চুরি করে একদিন ধরা পড়ে। তখন তার শাস্তি হয় ১০ কোটি টাকা জরিমানা ও ছয়মাসের জেল। তাহলেতো তার লোকসান নয় বরং লাভই হলো। এই ধরনের শাস্তি কিংবা বিচার ব্যবস্থা দিয়ে দুর্নীতি দমন কতটুকু সম্ভব? ঐ লোক তো আবার চুরি করবে। ওনারা উচ্চ শ্রেণির সম্মানিত ব্যক্তি তাই কি কঠোর শাস্তি দেওয়া যাচ্ছে না? যে দুর্নীতি করে সে চোর। সে দেশের টাকা, জনগণের কষ্টের টাকা চুরি করেছে। চোরের আবার কিসের সম্মান? কিসের আত্মমর্যাদা? চোরকে চোর হিসেবেই বিবেচনা করতে হবে। আর দুর্নীতির হার বিবেচনা করে অর্থদণ্ডের পাশাপাশি কঠোর শাস্তির বিধান করতে হবে। এবং শাস্তি বাস্তবায়ন করতে হবে। বড় ধরনের দুর্নীতির জন্য দুর্নীতিবাজের সমস্ত সম্পদ বাজেয়াপ্ত করতে হবে। এমন শাস্তি প্রদান করতে হবে যাতে অন্যরা দেখে আর দুর্নীতি করার সাহস না পায়। মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর দুর্নীতির ব্যাপারে যে জিরো টলারেন্স ঘোষণা সদিচ্ছার সঙ্গে দল মত নির্বিশেষে তা বাস্তবায়িত হলেই দুর্নীতি প্রতিরোধ করা সম্ভব হবে। অন্যথায় বালিশ তুলতে ৭৭০ টাকা, কেটলি তুলতে সারে তিন হাজার টাকার মতো ঘটনা ঘটেই যাবে।

n লেখক:শিক্ষার্থী, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়