‘রাজনীতি নিয়ে মারামারি না থাকলে আমরা ভাল থাকব’

মগবাজারের ওয়্যারলেস গেট ও রেলগেট সংলগ্ন এলাকায় ফেরি করে দুধ বিক্রি করেন আবুল হাশেম ও তার ছোট ভাই সাইফুল। বাড়ি বগুড়ার গাবতলীতে। প্যাটেকজাত দুধ খেতে অভ্যস্ত নগরবাসীর একটি অংশের ‘খাঁটি গরুর দুধের’ চাহিদা মেটাতে চার বছর আগে থেকে এই এলাকায় দোকান ও বাসায় ফেরি করে দুধ বিক্রি করছেন তারা। রামপুরার আফতাব নগর এলাকা থেকে গরুর দুধ সংগ্রহ করে ছোট ভ্যানে করে নিয়ে আসেন মগবাজারে। বিক্রি করেন প্রতি লিটার ৭৫ থেকে ৮০ টাকা দরে। প্রতিদিন গড়ে ৩০ লিটার দুধ বিক্রি হয়। খরচাপাতি বাদ দিয়ে লিটারে ৪ থেকে ৫ টাকা মুনাফা থাকে। পরিবার-পরিজন নিয়ে আফতাব নগরের কাছেই তারা থাকতেন। দিন ভালই যাচ্ছিলো। একটু বেশি লাভের আশায় ধার-দেনা করে নিজেরাই ৬০ হাজার টাকায় ৬ মাস আগে একটি গাভী কিনেছিলেন; কিন্তু রাজনৈতিক অস্থিরতা তাদের সেই ‘আশায় গুড়ে বালি’ হয়ে দেখা দেয়। হরতাল অবরোধের কারণে অনেক দিনই দুধ নিয়ে বেরুতে পারেননি। হাশেম বললেন, ‘ওই কয় মাস ঘরভাড়া দিতেও কষ্ট হয়েছে। বাধ্য হয়ে বৌ-পোলাপান বাড়িতে পাঠায়ে কোন রকমে টিকেছিলাম। তবে এখন বিক্রি বেড়েছে।’ এতক্ষণ দাঁড়িয়ে কথা বলার সময় তার নেই। ভেতরে যেন তাড়া দিচ্ছে কেউ। তাই ছোট ভাই সাইফুলকে ভ্যানের প্যাডেলে চাপ দেয়ার ইশারা দিয়ে বলেন,‘ ল- যাই’। হাশেমদের মতই আরেক স্বউদ্যোগী বাবু। লেখাপড়া মাত্র দশম শ্রেণী পর্যন্ত। ভাল চাকরি মেলার সুযোগ নেই। তাই ভাল থাকতে হলে ব্যবসা করতে হবে। নতুন নতুন ব্যবসায় জড়াতে হবে নিজেকে। এই ধারণা নিয়েই পথে-ঘাটে-হাটের স্টিকার বিক্রেতা বাবু বর্ষায় ছাতা বিক্রিরও পরিকল্পনা করছেন। কিছু পুঁজির যোগাড়ও করছেন। তার মতে, ‘ব্যবসায় বৈচিত্র্য থাকলে লাভ থাকে বেশি।’ পুরো নাম মমিন হোসেন। বাড়ি চাঁদপুরের মতলবে। থাকেন আজিমপুর নিউপল্টনে। পান্থপথে কথা হয় তার সঙ্গে। নানা রঙের স্টিকার বিক্রি করে নিজের জীবনকে রাঙাতে চান বাবু। বাচ্চাদের জন্য তার আকর্ষণীয় স্টিকারগুলো দেখে অভিভাবকদেরও চোখ আটকায়। এভাবেই দৈনিক বারো থেকে চৌদ্দশ টাকার মতো বিক্রি হয়। স্টিকারগুলো কিনে আনেন চকবাজার থেকে। বাবু জানালেন, বর্ষায় স্টিকারের বিক্রি হয় কম। তাই এই বর্ষায় ছাতা বিক্রি করবো। তাতে পুষিয়ে যাবে। সংসারে বাড়তি খরচ মেটাতে হলে বাড়তি আয়তো করতে হবেই। বাবুর মতই স্বকর্মসংস্থানের মাধ্যমে সংসারের খরচ যোগাচ্ছে লাখ লাখ তরুণ। তারুণ্যের উদ্দমে ভেসে যায় আলস্য। পরিশ্রম করে বড় হওয়ার অভিপ্রায় নিয়ে তাই মৌচাকের পাশে ফুটপাথে ‘শো-পিস’ এর পসরা সাজিয়ে বসেছেন রমিজ। থাকেন বনশ্রীতে। তারও পণ্য কিনতে হয় চকবাজার থেকে। নিম্ন-মধ্যবিত্ত শ্রেণিই তার প্রধান ক্রেতা। চীনের তৈরি বলেই চালিয়ে দেন ক্রেতাদের। দেশি বললে অনেকেই কিনতে আগ্রহী হন না। বিক্রিও হয় বেশ। দিনে হাজার টাকা ছাড়িয়ে কখনো ১২/১৩শ টাকা বিক্রি হয়। সেক্ষেত্রে ৪শ টাকার মতো লাভ থাকে। তবে রাজনৈতিক অস্থিরতার কোপ পড়েছে এই স্বউদ্যোগীর ঘাড়েও। হতাশা নিয়েই বললেন, হরতাল-অবরোধ পড়লে বিক্রি হয় কম। রমিজ বললেন, ‘আগে পেটে ভাত, পরে শখ। মানুষ ভাল থাকলে শো-পিসও কিনবে। তাই রাজনীতি নিয়ে মারামারি না থাকলে আমরা ভাল থাকবো। নইলে সংসার চালানো যাবে না।’