বিমান নয়, মিলছে শুধু হতাশা
প্রকাশ : ২৩ মার্চ ২০১৪, ২২:০৬
মালয়েশিয়ান এয়ারলাইন্সের থ্রি সেভেন জিরো ফ্লাইট আর বিমান ভর্তি দু’শ’ ঊনচল্লিশ জন মানুষ কোথায় গেলো? গত এক পক্ষকাল ধরে এ প্রশ্নই সবার মনে। শুরুতে ধারণা করা হচ্ছিল, যান্ত্রিক গোলযোগ বা যাত্রীবেশী সন্ত্রাসী হামলার কবলে পড়ে বিমানটি বিধ্বস্ত হয়েছে। বিমানের ধ্বংসাবশেষের খোঁজে তাই দক্ষিণ চীন সাগর আর মালাক্কা প্রণালী এলাকায় চালানো হয় বড় ধরনের অনুসন্ধান কাজ। কারণ ঐ এলাকার উপর দিয়ে বিমানটি বেইজিং যাবার পথে নিখোঁজ হয়। তন্ন তন্ন করে খোঁজাখুঁজির পর কোন কিছু না পাওয়ায় হতবাক হয় গোটা বিশ্ববাসী। যেন কোন অদ্ভুত ভূতুড়ে ম্যাজিশিয়ানের কাণ্ড। উড্ডয়মান অবস্থায় গোটা একটা বিমান উধাও। অনুসন্ধান কর্মীদের ব্যর্থতার সুযোগে গণমাধ্যমে ছড়ায় মুখরোচক নানা কল্পকাহিনী। যেমন, ঐ বিমানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের আইটি বিশেষজ্ঞরা ছিলো। যারা রাডার ও স্যাটেলাইট ফাঁকি দেয়ার নয়াপ্রযুক্তির অধিকারী। ঐ বিশেষজ্ঞরাই সুপরিকল্পিত ও পরীক্ষামূলকভাবে পুরো বিমান গায়েব করে দিয়েছে। এও বলা হচ্ছে যে, বিমানটিকে ভিনগ্রহের অধিবাসী এলিয়েনরাও তুলে নিয়ে যেতে পারে।
এক সপ্তাহেরও বেশি সময় ধরে অনুসন্ধান চালিয়ে বিমানের খোঁজ না পাওয়ায় যে প্রশ্নটি সবার আগে আসে, সেটা হলো, বিমানটি আদৌ বিধ্বস্ত হয়েছে কি-না! বিমান বিধ্বস্ত হবার প্রধান কারণ যান্ত্রিক ত্রুটি। কিন্তু মালয়েশিয়ার রাডারে বিমানটি সর্বশেষ যে সিগনাল পাঠায়, তাতে দেখা যায়, যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হবার আগমুহূর্ত পর্যন্ত বিমানটি ছিলো সব ধরনের ত্রুটিমুক্ত। এয়ার ট্রাফিক কন্ট্রোলারের সাথে পাইলটের সর্বশেষ কথা ছিলো, ‘অল রাইট, গুড নাইট’। এরপরও চুরি যাওয়া পাসপোর্ট নিয়ে দুই সন্দেহভাজনের বিমানে ওঠার নিশ্চিত তথ্য থাকায় আশঙ্কা করা হয়, হয়তো মুহূর্তের মধ্যেই সন্ত্রাসী হামলার কবলে পড়ে ঐ বিমানের সলিল সমাধি হয়েছে। তাই রাডারের সিগনাল অনুযায়ী বিমানের সর্বশেষ অবস্থানের আশপাশেই অর্থাত্ দক্ষিণ চীন সাগরেই এর ধ্বংসাবশেষের সন্ধান পাবার চেষ্টা করা হয়। ক্রমান্বয়ে বাড়ানো হয় অনুসন্ধান এলাকার ব্যাপ্তি। স্যাটেলাইট ছবিতে যখনই সমুদ্রপৃষ্ঠে জ্বালানি তেল বা ধ্বংসাবশেষ ভাসতে দেখা গেছে, তাত্ক্ষণিকভাবে সেখানে ছুটে গেছে অনুসন্ধানী জাহাজ বা এয়ারক্রাফ্ট। অত্যাধুনিক বিমান ও জাহাজ সামগ্রী নিয়ে ঐ কাজে অংশ নেয় চীন, মালয়েশিয়া, থাইল্যান্ড, ভিয়েতনামসহ অন্তত ২৬ টি দেশ। অনুসন্ধান কাজে চীন তার ১০টি স্যাটেলাইট কাজে লাগানোরও ঘোষণা দেয়। সেই সাথে বিভিন্ন স্থান থেকে প্রাপ্ত তথ্য বিশ্লেষণ করে বিমানের অবস্থান বা অবস্থা জানতে তদন্ত কাজ চালিয়ে যায় মালয়েশিয়া।
বিমান নিখোঁজ হবার চারদিন পর যুক্তরাষ্ট্র দাবি করে, মালয়েশিয়ার সাথে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হবার পর অন্তত চারঘণ্টা বিমানটি সচল ছিলো। এই চারঘণ্টায় কয়েক হাজার কিলোমিটার পাড়ি দেয়া সম্ভব। কিন্তু শুরুতেই এই দাবি নাকচ করে মালয়েশিয়া। অবশ্য এখন যুক্তরাষ্ট্রের ঐ তথ্যই তদন্তকারীদের কাছে সবচেয়ে বড় সম্পদ। তবে স্যাটেলাইট সিস্টেম পরিচালনাকারী লন্ডনভিত্তিক প্রতিষ্ঠান ‘ইনমারস্যাট’ জানিয়েছে, নিখোঁজ হবার পর পাঁচ ঘণ্টারও বেশি সময় ধরে ফ্লাইট এমএইচ-থ্রি সেভেন জিরো স্বয়ংক্রিয় সিগনাল পাঠিয়েছে। পরে জানা যায়, চার ঘণ্টা নয়, আট ঘণ্টারও বেশি সময় ধরে বিমানটি আকাশ পথে ছিলো। মালয়েশিয়ার সেনাবাহিনীর রাডারে ধারণকৃত তথ্য বিশ্লেষণের পর গোয়েন্দারা এক রকম নিশ্চিত যে, বিমান বন্দরের সাথে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন করে বিমানটি উদ্দেশ্যমূলকভাবে কয়েকশ’ মাইল পাড়ি দিয়েছে। ধারণা করা হচ্ছে, পাইলট নিজে অথবা এমন কেউ বিমানের গতিপথ পাল্টেছেন যিনি আকাশপথ বিশেষজ্ঞ। আর এমন ধারণা থেকেই নাশকতার সন্দেহ বাড়ছে।
কুয়ালালামপুর বিমানবন্দর থেকে বেইজিংয়ের পথে উড্ডয়নের আধা ঘণ্টারও কম সময়ের মধ্যে তথা মালয়েশিয়ার স্থানীয় সময় ৮ মার্চ রাত দেড়টার দিকে বেসামরিক রাডারের পর্দা থেকে অদৃশ্য হয় ফ্লাইট থ্রি সেভেন জিরো। সে পর্যন্ত বিমানটি উত্তর-পূর্ব থাই উপসাগর বরাবর নির্ধারিত রুটেই ছিলো। পরে মালয়েশিয়ার বিমানবাহিনীর প্রধান জানান, রাত সোয়া দুইটার দিকে দেশের পশ্চিম উপকূলবর্তী পেনাং দ্বীপের উত্তর-পশ্চিম আকাশে সেনাবাহিনীর রাডারের পর্দায় একটি বিমান ধরা পড়ে, যেটা ঐ নিখোঁজ বিমান হতে পারে। তদন্তকারীরা বলছেন, আকাশ পথে দু’টি সরল রুটের ছেদক বিন্দু (ওয়েপয়েন্ট) থেকেই বিমানটি পশ্চিমের পথ ধরে। আর ঠিক ঐ মুহূর্তেই এয়ার ট্রাফিক কন্ট্রোলের সাথে সব ধরনের যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেয় তৃতীয় কোন পক্ষ। যিনি হয়তো ঐ বিমানেরই যাত্রীবেশী কেউ।
তদন্তকারীরা জানান, মধ্যপ্রাচ্য ও ইউরোপগামী বাণিজ্যিক বিমানের পাইলটরা আকাশ পথ ব্যবহারের ক্ষেত্রে দু’টি ম্যাপ অনুসরণ করে থাকেন। এর একটি হলো এন-৫৭১। এই ম্যাপের কোরিডোর ধরে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া থেকে মধ্যপ্রাচ্যে যেতে হয়। অন্যটি হলো পি-৬২৮। এই ম্যাপের রুট অনুসরণ করে ইউরোপে যেতে হয়। সেনাবাহিনীর রাডারে ধারণকৃত তথ্য অনুসারে, নিখোঁজ বিমান পশ্চিমে মোড় নিয়েই এন-৫৭১ ম্যাপ অনুসরণ করতে থাকে। রাডারে থাইল্যান্ডের ফুকেট দ্বীপের দক্ষিণে ‘গিভাল’ থেকে সর্বশেষ উত্তর-পশ্চিম ‘আইগ্রেক্স’ ছেদকের (ওয়েপয়েন্ট) দিকে যেতে দেখা যায় ঐ বিমানকে। পি-৬২৮ ম্যাপ অনুসারে ভারত মহাসাগরের আন্দামান দ্বীপপুঞ্জের উপর ‘আইগ্রেক্স’ রুট ইউরোপে যাবার পথ। তাই বেশ কয়েকদিন ধরে আন্দামান সাগর ও বঙ্গোপসাগরসহ ভারত মহাসাগরে অনুসন্ধান কাজ চালায় ভারত ও বাংলাদেশের বিমান বাহিনী, কোস্টগার্ড ও নৌবাহিনী। অত্যাধুনিক এয়ারক্রাফ্টসহ এ কাজে সহযোগিতা করে মার্কিন যুদ্ধ জাহাজ ডেস্ট্রয়ার।
এরপর অত্যন্ত আশাব্যঞ্জক একটি স্যাটেলাইট ছবি প্রকাশ করে অস্ট্রেলিয়া। এতে দেখা যায়, অস্ট্রেলিয়ার পশ্চিম উপকূল থেকে প্রায় তিন হাজার কিলোমিটার পশ্চিমে দক্ষিণ ভারত মহাসাগরে দু’টি বড় আকারের বস্তু ভাসছে। এর একটির আকার অন্তত ২৪ মিটার। ১৬ মার্চে তোলা ঐ ছবি প্রকাশ করা হয় ২০ মার্চ। আর ঐ এলাকায় পৌঁছাতে একদিন লেগে যায় অনুসন্ধানকারীদের। পাঁচদিন পর সেখানে কিছুই মেলেনি। তবে গোয়েন্দাদের বিশ্বাস, দক্ষিণ ভারত মহাসাগরেই পড়েছে বিমানটি। তাই বাড়ানো হয় অনুসন্ধান এলাকার পরিধি। এরই মধ্যে আরেকটি স্যাটেলাইট ছবি প্রকাশ করে চীন। এতে দেখা যায়, দক্ষিণ ভারত মহাসাগরেরই কোন এক স্থানে অন্তত ২২ মিটার দৈর্ঘ্যের একটি বস্তু ভাসছে। অস্ট্রেলিয়ার প্রধানমন্ত্রী টনি অ্যাবোট এই ছবিকে অত্যন্ত আশাব্যঞ্জক বলে দাবি করেছেন। তবে ভারত মহাসাগরের সম্ভাব্য ঐ এলাকার আবহাওয়া মোটেই সুখকর নয়। তারপরও অনুসন্ধান কার্যক্রমের ব্যাপকতা দেখে মনে হয়, হয়তো হঠাত্ই টিভি পর্দায় ভেসে উঠবে কোন ব্রেকিং নিউজ। বলা হবে, পাওয়া গেছে। কিন্তু নিখোঁজ যাত্রী আর পাইলটদের স্বজনদের অনেকেই ক্ষুব্ধ। তাদের কাছে পুরো ঘটনাচক্রই যেন এক মহানাটক। কুয়ালালামপুর বিমানবন্দরে অপেক্ষমান এক পাইলটের বাবা বিষয়টিকে দেখছেন ভিন্নভাবে। সাংবাদিকদের তিনি জানান, তার দৃঢ়বিশ্বাস তার ছেলে বেঁচে আছে। কিন্তু নিখোঁজ বিমানের যাত্রীদের স্বজনরা যতই আশা করছেন, হতাশা ততই তাদের সঙ্গে ছুটছে।