আ ল জে রি য়া

আবারো আব্দেল আজিজ?

আশায় বুক বেঁধেছিল অনেকে— এবার সত্যিই পরিবর্তন আসবে। কিন্তু এখন মনে হচ্ছে, সে গুড়ে বালি। চতুর্থ মেয়াদে ক্ষমতায় থাকতে চাইছেন আলজেরিয়ার প্রেসিডেন্ট আব্দেলআজিজ বউতেফ্লিকা। বয়সের ভার এবং রোগে স্বাস্থ্যের করুণ দশা, তাতে কী— এ অবস্থাতেই তিনি লড়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন আসন্ন প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে। প্রার্থী হিসেবে নাম নিবন্ধনের মাত্র কয়েকদিন আগে এমন ঘোষণা শোনার পর বিস্মিত না হয়ে উপায় ছিল না। অন্য দলের লোকেরা তো বটেই, ক্ষমতাসীন ন্যাশনাল লিবারেল ফ্রন্ট পার্টির (এনএলএফপি) কিছু নেতাও বিষয়টিকে আমলে নিতে চাচ্ছিলেন না। অবশ্য প্রথম ঘোষণাটা তাঁর নিজ মুখ থেকে বেরোয়ইনি। রাজধানী আলজিয়ার্সে আফ্রিকান গ্রীন এনার্জি সম্মেলনের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে বক্তব্য রাখতে গিয়ে তাঁর পক্ষে জাতিকে বার্তাটি শুনিয়েছিলেন দেশের প্রধানমন্ত্রী আব্দেলমালেক সেল্লাল। বক্তব্যের এক পর্যায়ে তিনি বলছিলেন, ‘জনগণের উত্সাহেই আমাদের প্রেসিডেন্ট ফের প্রেসিডেন্ট হবার দৌড়ে শরীক হওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন।’ তারপরেও লোকে বিশ্বাস করতে চাইছিল না। কারণ, গত ২ মার্চ ৭৭তম জন্মদিন পালন করা আব্দেলআজিজ বউতেফ্লিকার শরীররটা ভাল যাচ্ছে না অনেকদিন ধরে। প্রায়ই তাঁকে ছুটে যেতে হয় প্যারিসের একটি হাসপাতালে। সরকারের তরফ থেকে বলা হয়েছে, সেখানে তিনি পাকস্থলির আলসারের জন্য অস্ত্রোপচার করিয়েছেন। কিন্তু রটনা রয়েছে— প্রেসিডেন্ট আসলে ক্যান্সারে ভুগছেন এবং আবার দেশ শাসনের জন্য শারীরিকভাবে ফিট নন। বউতেফ্লিকা প্রেসিডেন্ট পদটি দখলে রেখেছেন ১৯৯৯ সাল থেকে। বিষয়টি এমন হয়ে দাঁড়িয়েছে যে, তিনি নিজে না চাইলে এখান থেকে তাঁকে সরানো প্রায় অসম্ভব। আলজেরিয়ার স্বাধীনতাযোদ্ধা, প্রেসিডেন্ট আব্দেলআজিজ বউতেফ্লিকা সব জল্পনা-কল্পনার অবসান ঘটান তাঁর জন্মদিনের পরেরদিন, ৩ মার্চ। এদিন আনুষ্ঠানিক প্রার্থিতার জন্য নাম নিবন্ধন করতে সংবিধান পরিষদে ঢুকেন কালো লিমুজিনে চড়ে। অথচ গত দু’মাসে তাঁকে জনসমক্ষে খুব একটা দেখা যায়নি। এড়িয়ে চলছিলেন মন্ত্রী পরিষদের সঙ্গে বৈঠক এবং সাক্ষাত্ দিচ্ছিলেন না সফরে আসা বিদেশি রাষ্ট্রপ্রধানদেরকেও। ফাইল সইয়ের কাজ চালিয়ে যাচ্ছিলেন বাড়িতে বসে। গত গ্রীষ্মে মাইনর স্ট্রোকের কারণে ফ্রান্সের হাসপাতালে কয়েকমাস কাটানোর পর এভাবেই চলছিল তাঁর দিনকাল। তারই ফলশ্রুতিতে ধারণা জন্মেছিল, এবার নতুন মুখ আসবে। আসছে ১৭ এপ্রিল আলজেরিয়ার প্রেসিডেন্ট নির্বাচন। অলৌকিক কিছু না ঘটলে ফের জিতবেন আব্দেলআজিজ। দেশের সবচে’ বড় ট্রেড ইউনিয়ন জেনারেল ডেস ট্রাভেইলার্স আলজেরিয়েসন্স অনেক আগেই ঘোষণা করেছিল, দেশের স্থিতিশীলতার কারণে তারা চতুর্থ মেয়াদে বউতেফ্লিকাকে প্রেসিডেন্ট হিসেবে দেখতে চায়। উপরন্তু তিনি সেনাবাহিনীর আশীর্বাদপুষ্ট। সেনাবাহিনীর কাছে তিনি অবশ্য মন্দের ভাল। গতবছর প্রেসিডেন্টের অনুপস্থিতিতে তাঁকে সরিয়ে দেয়ার উদ্যোগ নেয়া হয়েছিল। কিন্তু মিলিটারি এলিটরা ঐকমত্যে পৌঁছুতে না পারায় তা আর হয়ে উঠেনি। ১৯৬২ সালে ফ্রান্সের কাছ থেকে স্বাধীনতা লাভের সময় থেকেই আলজেরিয়ার রাজনীতিতে কলকাঠি নাড়ছে সেনাবাহিনী; কখনো প্রকাশ্যে আবার কখনোবা পর্দার অন্তরালে থেকে। আলজেরিয়ার বিরোধী দলগুলো খুবই দুর্বল। বউতেফ্লিকাকে হটাতে তারা জোটবদ্ধ হতে পারে না। তিনিসহ এবারের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে প্রার্থী মোট সাতজন। এর মধ্যে দু’জন মহিলাও আছেন। কাজেই এটি নির্দ্বিধায় বলে দেয়া যায় যে, প্রেসিডেন্ট পরিবর্তন হওয়ার কোনও সম্ভাবনা নেই এবং আগামী পাঁচ বছর বউতেফ্লিকাই প্রেসিডেন্ট থাকছেন।। অথচ তাঁর প্রতি অসন্তুষ্ট লোকের সংখ্যা কিন্তু কম নয়। আফ্রিকার চতুর্থ-বৃহত্ তেল রিজার্ভ এবং দ্বিতীয়-বৃহত্ গ্যাস রিজার্ভ সত্ত্বেও দেশটির অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ঘটছে না প্রত্যাশিত হারে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে কমে এসেছে তেল ও গ্যাসের উত্পাদন। বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ২০০ বিলিয়ন মার্কিন ডলার থাকা সত্ত্বেও বাজেট ঘাটতি ২০ শতাংশ। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের তথ্যানুসারে সার্বিক বেকারত্ব ১০ শতাংশ হলেও তরুণ বেকারত্ব ২১ শতাংশ। যে কারণে কম বয়সীরা তার উপর খুশি নয়। এ প্রসঙ্গে স্থানীয় সাংবাদিক কামাল বেনকাউসা বলছিলেন, ‘ তরুণ আলজেরিয়ানদের প্রত্যাশা খুব বেশি নয়। তারা ভাল চাকরি চায়; সমর্থ হতে চায় একটি বাড়ি কিংবা ফ্ল্যাট কিনতে; চায় ছেলেমেয়েদের ভাল শিক্ষার সুযোগ আর চায় বাবা-মার চিকিত্সা ভাল হাসপাতালে করাতে। কিন্তু বর্তমান প্রেসিডেন্ট এসব স্বপ্নই থেকে যাচ্ছে। তারা আসলে সত্যিকারের গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে আলজেরিয়ার সমৃদ্ধ ভবিষ্যত্ দেখতে চায়।’ পরিবর্তনের সম্ভাবনা নেই জেনেই বহু আলজেরিয়ান ভোট দিতে উত্সাহী নয়। ২০১২ সালে অনুষ্ঠিত সংসদ নির্বাচনে ভোট পড়েছিল মাত্র ৪৩ শতাংশ। ১৭ শতাংশ ভোট পড়েছিল এমন দলগুলোর পক্ষে, যারা কোনো আসন জিততে পারেনি। আলজেরিয়ার নির্বাচনে কারচুপি যেন স্বাভাবিক ঘটনা। আসছে প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে ফলাফল পূর্বনির্ধারিত, এমন অভিযোগ তুলে এ নির্বাচন বর্জন করছে বেশ কিছু দল। এর মধ্যে রয়েছে আধুনিক ইসলামি দল মুভমেন্ট ডি লা সোসাইটে পোর লা পেইক্স ও ধর্মনিরপেক্ষ দল রাসেমব্লেমেন্ট পার লা কালচার এত লা ডেমোক্রেটি। তাদের মতে নির্বাচনের নামে সাজানো নাটক হয় আলজেরিয়ায়। কামাল বেনকাউসা বলেছেন, আপাতদৃষ্টিতে মনে হয়, আলজেরিয়াতে সবকিছু ঠিকঠাকমতোই চলছে। আসলে তেল ও গ্যাসের আয় দিয়ে শান্তি কেনা হচ্ছে। কিন্তু এটি টেকসই নয় এবং কৃত্রিম। সরকারের দেয়া ভর্তুকিতে খুশি হয়ে অনেকে অভিযোগ তুলছে না। তারা বুঝতে পারছে না যে, ভর্তুকি বন্ধ হয়ে গেলে ঠিকই ছড়িয়ে পড়বে সামাজিক অস্থিতিশীলতা। আলজেরিয়ায় সামাজিক অস্থিতিশীলতার সমস্ত উপকরণই রয়েছে। এখনই সংস্কারের উপযুক্ত সময়। তার আগে প্রয়োজন প্রকৃত গণতন্ত্র। এখন যা চলছে, তাকে আর যাই হোক, গণতন্ত্র বলা চলে না। আব্দেল আজিজ বউতেফ্লিকার আমলে তা আশাও করা যায় না।