‘বাঁশি বাজিয়ে বাঁশি বিক্রি করে সংসার চালানোর চেষ্টা করছি’

‘বাঁশিতে ফুঁ দেই। সুর ভাসাই বাতাসে। কেউ খুশি হয়ে বলে- এদিকে আয়, একটু শুনি। কেউ বা কিনে নেয় বাঁশি।’ কথাগুলো লাহের। মাদারিপুর থেকে ঢাকায় আসা দুই পয়সা রোজগারের জন্যই। পার্কে, ময়দানে বাঁশি বাজান। বাঁশি বেচেন। দুইয়েই কিছু আয় হয়। তাই দিয়ে সংসার চলে। স্ত্রী, তিন মেয়ে আর এক ছেলেকে নিয়ে তার সংসার। প্রাথমিক বিদ্যালয়ে কিছুদিন যাতায়াত ছিল। দারিদ্র্যের কারণে পড়া হয়নি। অল্প বয়স থেকেই আয় রোজগারের দিকে ঝুঁকতে হয়েছে। এখনো তাই বেশি আয়ের আশায় গ্রাম থেকে শহরে আসা। মাদারীপুরের হোসেনপুরে তার বাড়ি। কোটালিপাড়ার পয়সার হাট থেকে বাঁশি কিনে আনেন। গুলিস্তান, যাত্রাবাড়ি, পোস্তগোলা ও সায়েদাবাদ কিংবা জুরাইনে তাকে দেখা যায়। ঘুরতে ঘুরতে বাঁশির সুর তোলা আর মানুষকে আকৃষ্ট করাই তার ব্যবসা। কেউ বাঁশি শুনে খুশি হয়ে এক কাপ চা খেতে বলে। কেউবা বাঁশি কিনে নেয়। ২/৩শ’ টাকাও হয় না কোনদিন। তাই অস্থিরতা তাকে ঘিরে ধরেছে। ইদানীং অসুস্থতাও। মেরুদণ্ডে ব্যথা। অর্থাভাবে চিকিত্সা করতেও পারেন না তিনি। সন্তানাদির কি হবে সেকথা ভাবতেই চোখে জল আসে। কোমরে বেল্ট বেঁধে দুর্বল হাঁটা এই বংশীবাদকের সুর নিভে গেলে কি হবে তার সংসারের? এমন অনিশ্চিত জীবন নিয়েই এদেশের দরিদ্র মানুষেরা বেঁচে আছেন। জন্মই যেন এদের আজন্ম পাপ-তবুও প্রাণ থাকা পর্যন্ত লড়তে হবে। তাই কখনো নিরবে-বসে বসে বেদনার সুর তোলেন এই বংশীবাদক। তার এই সুর নীতিনির্ধারকদের কান পর্যন্ত যায় না, যারা উপরতলায় বসে সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনীর ছক আঁকেন। তার মতই নানান কিছু করে দুই বেলা দু’মুঠো খেয়ে বাঁচার সংগ্রামে লিপ্ত শাকিল। নীলক্ষেতে বই কিনতে আসে এমন অনেকের চোখ এড়ায় না শাকিলসহ এখানকার অপরাপর ক্ষুদ্র বিক্রেতাদের। শাকিল আম-পেয়ারার ভর্তা বিক্রি করেন। কাসুন্দি আর সামান্য মরিচের গুঁড়া মিশিয়ে পাঁচ কিংবা দশ টাকায় বিক্রি করেন। গরমের এই সময়ে কাঁচা আম বানিয়ে খেতে তরুণ-তরুণীদের অনেকেই তার কাছে খানিক দাঁড়ায়। একটু একটু করে বিক্রি হলেও মাস শেষে সংসারের ব্যয়ভার মিটিয়ে ফেলেন শাকিল। লেখাপড়া নেই, তাই এ ব্যবসা শুরু করেছেন। শাকিলের মতই আরেক তরুণ হানিফ। হাতির ঝিলে বাদাম বিক্রি করেন। বাড়ি ভৈরবে। বাদাম বিক্রি করে যা পান, তা দিয়ে চলে সংসার। বউ,পোলাপান বাড়িতেই রেখে এসেছেন। ‘ঢাকায় এনে খাওয়াবো কি, যা কষ্টের জীবন’। নিজে কষ্ট করতে রাজি, কিন্তু বউ পোলাপানরে ঢাকায় এনে ঠিকমত ভরণপোষণ দিতে পারবেন না তিনি। বললেন, ‘রোজ যা বিক্রি করি তা দিয়ে খুব লাভ থাকে না। তবু কিছু একটা করে তো খেতে হবে।’ ঢাকায় শুধু নয়, সারাদেশে এভাবে ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে এধরনের স্বকর্মজীবী মানুষ। ফেরি করে দিন কাটে তাদের। সবদিন সমান আয় হয় না। অর্থনীতিবিদ ড. মুহম্মদ মাহবুব আলী বলেন, এ ধরনের ভাসমান বিক্রেতাদের জরিপ চালানো যেতে পারে। এদের মধ্যে গ্রুপ করে সেবাধর্মী বিভিন্ন প্রকল্পে নিয়োজিত করলে ভাল ফল আসতে পারতো। কিংবা এদেরকে সরকারিভাবে কারিগরি কোন প্রশিক্ষণ দিয়ে দেশের বাইরে কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করা গেলে দেশও লাভবান হতো। ওরাও ভাল থাকতো।