চট্টগ্রামে বাসায় ঢুকে মা-মেয়েকে খুন
প্রকাশ : ২৪ মার্চ ২০১৪, ২২:৪৬
চট্টগ্রামে বাসার ভেতর খুন হয়েছেন এসএসসি পরীক্ষার্থী এক ছাত্রী ও তার মা। নগরীর ডবলমুরিং থানাধীন আগ্রাবাদ সিডিএ আবাসিক এলাকার একটি ভবনের চতুর্থ তলার বাসায় ঢুকে মা-মেয়ের হাত ও পায়ের রগ কেটে খুন করে দুর্বৃত্তরা। গতকাল সোমবার সকালে এ ঘটনা ঘটে। খবর পেয়ে পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে মা ও মেয়েকে মুমূর্ষু অবস্থায় উদ্ধার করে চট্টগ্রাম মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে নিলে কর্তব্যরত চিকিত্সকরা তাদের মৃত ঘোষণা করেন।
নিহতরা হলেন, গৃহবধূ রিজিয়া খাতুন (৪৭) ও মেয়ে সায়মা নাজনীন নিশাত নিশো (১৬)। সায়মার বাবা সিঅ্যান্ডএফ ব্যবসায়ী মো. রেজাউল করিম। তাদের গ্রামের বাড়ি সিরাজগঞ্জ জেলার সদর উপজেলার কুরালিয়া গ্রামে। তারা দীর্ঘদিন ধরে আগ্রাবাদ সিডিএ আবাসিক এলাকার ১৭ নম্বর সড়কের ১২৯ নম্বর প্লটে যমুনা ভবনের চতুর্থ তলার বাসায় ভাড়া থাকতেন।
কী কারণে মা ও মেয়েকে নৃশংসভাবে খুন করা হয়েছে সে সম্পর্কে পুলিশ কোনো ধারণা দিতে পারেনি। তবে নিহতদের হাত ও পায়ের রগ কাটার ধরন দেখে পুলিশ অনুমান করছে এর সঙ্গে পেশাদার খুনীরা জড়িত থাকতে পারে। এদিকে, পরিবারের সদস্যরা দাবি করেছেন, রায়হান নামে এক যুবক বিয়ের কথা বলে সায়মাকে কিছুদিন ধরে উত্ত্যক্ত করছিল। তার প্রস্তাবে রাজি না হলে সায়মাকে দেখে নেয়ার হুমকি দেয়া হয়। রায়হানই এই খুনের ঘটনা ঘটিয়েছে বলে তারা দাবি করেন।
অন্যদিকে মাত্র এক সপ্তাহের মধ্যে দ্বিতীয় জোড়া খুনের ঘটনা নগরীতে ব্যাপক চাঞ্চল্য সৃষ্টি করেছে। গত সোমবার নগরীর ষোলশহর এলাকায় একটি খালি প্লটে সেপটিক ট্যাংকের ভেতর থেকে উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষার্থী কামরুল ও তার বন্ধু ফোরকানের হাত-পা বাঁধা মৃতদেহ উদ্ধার করে পুলিশ।
পুলিশ ও প্রত্যক্ষদর্শী জানায়, সায়মা সিডিএ গার্লস স্কুল থেকে এ বছর মাধ্যমিক পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করে। গতকাল তার গার্হস্থ্য বিজ্ঞান ব্যবহারিক পরীক্ষা ছিল। সায়মাকে নিয়ে এক সাথে পরীক্ষা দিতে যাওয়ার জন্য গতকাল সকালে বান্ধবীরা তার বাসায় যায়। দরজা খোলা দেখতে পেয়ে তারা ভেতরে প্রবেশ করে মা ও মেয়েকে রক্তাক্ত অবস্থায় পড়ে থাকতে দেখে। এরপর চিত্কার করে প্রতিবেশীদের ডাকাডাকি করে ঘটনার কথা জানায় তারা।
এসময় সায়মার বড় ভাই সাইফ রেজা তার বোনের মোবাইলে ফোন করেন। সায়মার এক বান্ধবী ফোন ধরে সায়মা ও তার মা রক্তাক্ত অবস্থায় পড়ে রয়েছে বলে জানান। এ খবর পেয়ে কিছুক্ষণের মধ্যেই সাইফ রেজা বাসায় ছুটে আসেন। অন্যদিকে স্ত্রী ও মেয়ের সংকটাপন্ন অবস্থার কথা শুনে ব্যবসায়ী রেজাউল করিম অজ্ঞান হয়ে পড়েন। সহকর্মীরা দ্রুত তাকে চট্টগ্রাম মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে যান।
ডবলমুরিং থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা কাজী মতিউল ইসলাম মা ও মেয়ের খুনের সংবাদ নিশ্চিত করে ইত্তেফাককে বলেন, সকাল ৯টা থেকে ১০টার মধ্যে দুর্বৃত্তরা ঘরে ঢুকে ধারালো অস্ত্র দিয়ে মা ও মেয়ের হাত পায়ের রগ কেটে দেয়। স্থানীয় সূত্রে খবর পেয়ে পুলিশ পৌনে ১১টার দিকে মা ও মেয়েকে মুমূর্ষু অবস্থায় উদ্ধার করে চট্টগ্রাম মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে যায়। হাসপাতালের কর্তব্যরত চিকিত্সকরা তাদের মৃত ঘোষণা করেন। কারা এ হত্যাকাণ্ড ঘটিয়েছে সে সম্পর্কে তিনি কোনো ধারণা দিতে পারেননি। এ ঘটনায় ওই বিল্ডিংয়ের দুই নিরাপত্তা প্রহরীকে আটক করে থানায় নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে বলে তিনি জানান।
সাইফ রেজা ইত্তেফাককে বলেন, রায়হান গত কিছুদিন ধরে তার বোনকে বিয়ে করার কথা বলে উত্ত্যক্ত করে আসছিল। তার প্রস্তাবে রাজী না হলে সে সায়মাকে দেখে নেবে বলে হুমকি দিয়েছিল। তিনি আরো বলেন, ‘আমি যখন সায়মার মোবাইলে ফোন করি, তখন ওর এক বান্ধবী ফোন রিসিভ করে আমাকে জানায় সায়মা আর মা রক্তাক্ত অবস্থায় মেঝেতে পড়ে আছে। এ সময় ভবন থেকে রায়হান ও তার সঙ্গে একজনকে বের হতে দেখেছে বলে সায়মার ওই বান্ধবী আমাকে জানায়।’ কিছুদিন আগে রায়হান আমাদের বাসায় এসে সকলের সাথে হম্বিতম্বি করে। তখন আমি বাসায় ছিলাম। আমি তাকে বলি সায়মার মাধ্যমিক পরীক্ষা চলছে। এসময় তাকে বিরক্ত করো না। এরপর সে ক্ষুব্ধ হয়ে বাসা থেকে বের হয়ে যায়।
সায়মার আরেক ভাই ডা. আসিফ এবার বিসিএস হেলথ ক্যাডারে উত্তীর্ণ হয়েছেন। তিনি ইত্তেফাককে বলেন, সায়মা আমাদের একমাত্র বোন। সে পড়াশোনায় খুব মনোযোগী ছিল। ক্লাসে যাওয়া ছাড়া সে বাসার বাইরে যেতো না। চট্টগ্রামের একটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে বিবিএ শেষ সেমিস্টারের ছাত্র রায়হানই এ ঘটনার জন্য দায়ী ।
এদিকে মা ও মেয়ে নিহতের ঘটনায় গতকাল চট্টগ্রাম মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল মর্গের সামনে স্বজনদের আহাজারি করতে দেখা যায়। নিহত সায়মার চাচাতো বোন নাজনীন বলেন, আমাদের কোনো শত্রু ছিল না। যারা এ হত্যাকাণ্ড ঘটিয়েছে আমরা তাদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দাবি করছি।