সড়ক ব্যবহারের জন্যও টোল আদায়ের সিদ্ধান্ত
প্রকাশ : ২৪ মার্চ ২০১৪, ২২:৪৮
সেতুর পাশাপাশি সড়ক ব্যবহারের জন্যও টোল আদায়ের সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তরের আওতাধীন সারাদেশের জাতীয়, আঞ্চলিক ও জেলা সড়ক-মহাসড়কগুলো ব্যবহারের জন্য সর্বোচ্চ ১ হাজার টাকা এবং সর্বনিম্ন পাঁচ টাকা টোল নির্ধারণ করে ‘টোল নীতিমালা ২০১৪’র খসড়া চূড়ান্ত অনুমোদন দিয়েছে মন্ত্রিসভা। গতকাল সোমবার সচিবালয়ে মন্ত্রিসভার নিয়মিত বৈঠকে এ অনুমোদন দেয়া হয়। বৈঠকে সভাপতিত্ব করেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।
বৈঠক শেষে মন্ত্রিপরিষদের সচিব মোহাম্মদ মোশাররাফ হোসাইন ভূইঞা প্রেস ব্রিফিংয়ে বলেন, টোল থেকে পাওয়া টাকা জমা হবে সড়ক উন্নয়ন তহবিলে। এতে কর-বহির্ভূত রাজস্ব আয় বাড়বে, যা মহাসড়কের উন্নয়ন ও রক্ষণাবেক্ষণেই ব্যয় করা হবে। সরকারের এই সিদ্ধান্তের যৌক্তিকতা তুলে ধরে তিনি বলেন, এটা হচ্ছে সার্ভিস। সার্ভিসের জন্য টোল দিতেই হবে। তিনি বলেন, নীতিমালা হওয়ায় এ সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের জন্য জাতীয় সংসদে পাস করার প্রয়োজন পড়বে না। সড়ক বিভাগ তাদের সুবিধামতো সময়ে এই নীতিমালার আওতায় পর্যায়ক্রমে জাতীয়, আঞ্চলিক ও জেলা মহাসড়কগুলোকে টোলের আওতায় আনবে। মন্ত্রিপরিষদ সচিব জানান, টোল আরোপযোগ্য স্থাপনা চিহ্নিত করে কীভাবে আদায় করা হবে, টোলের টাকা কীভাবে ও কোথায় জমা হবে, কোন নির্ণায়কের ভিত্তিতে টোল নির্ধারণ করা হবে এসব বিষয়ে উল্লিখিত নীতিমালায় বিস্তারিত উল্লেখ রয়েছে। তিনি বলেন, টোল আদায়ের পদ্ধতিকে স্বচ্ছ, আধুনিক ও যুগোপযোগী করতেই এ নীতিমালা। টোল আদায় পদ্ধতির সঙ্গে মিনিটরিং ব্যবস্থাও শক্তিশালী করা হবে।
মন্ত্রিপরিষদ সচিব বলেন, জাতীয়, আঞ্চলিক ও জেলা সড়ক-মহাসড়কের পাশাপাশি জাতীয় মহাসড়কের মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ মহাসড়ক বলে আরো একটি ক্যাটাগরি করা হয়েছে। সরকার বিভিন্ন সময় এই গুরুত্বপূর্ণ মহাসড়ক নির্ধারণ করবে। বর্তমানে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ককে বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ মহাসড়ক হিসাবে গণ্য করা হয়। এসব ক্যাটাগরির সড়কের ওভারপাস, উড়ালসেতু (ফ্লাইওভার), সেতু, টানেল, ফেরি ছাড়াও একই ধরনের স্থাপনা টোল নীতিমালার আওতায় আসবে। নীতিমালায় টোল আদায়ের জন্য ‘ভিত্তি টোল’ নির্ধারণ করা হয়েছে জানিয়ে মন্ত্রিপরিষদ সচিব বলেন, টোলের হার বাড়ানোর সুযোগ ছাড়াও নীতিমালা সংশোধনের বিধানও রয়েছে। তিনি বলেন, যোগাযোগ মন্ত্রণালয়ের সড়ক বিভাগ বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে আলোচনা করেই টোল আদায়ের খসড়া নীতিমালা অনুমোদন দিয়েছে। ১৮৫১ সালের টোল আইন যুগোপযোগী করার লক্ষ্যে টোল নীতিমালা প্রণয়ন করা হয়েছে।
টোল ক্যাটাগরি
মন্ত্রিপরিষদ সচিব বলেন, ২০০ মিটারের বেশি দৈর্ঘ্যের সেতু টোলের আওতায় আসবে। এছাড়া যেখানে ফেরি আছে সেখানে স্থায়ী সেতু হলে তার দৈর্ঘ্য যাই হোক না কেন কমপক্ষে এক বছরের জন্য তা টোলের আওতায় আসবে। সরকারি-বেসরকারি অংশীদারিত্বের (পিপিপি) ভিত্তিতে কোনো সড়ক, সেতু বা এ ধরনের অন্য স্থাপনা হলে তাও টোলের আওতায় আসবে। সেতু ও ফেরির ক্ষেত্রে টোল নির্ধারণে চারটি ‘স্লাব’ নির্ধারণ করা হয়েছে বলে জানান মোশাররাফ হোসাইন। তিনি বলেন, ২শ’ থেকে ৫শ’ মিটারের জন্য, ৫০১ থেকে ৭৫০ মিটার, ৭৫১ থেকে ১ হাজার মিটার এবং এক হাজার মিটারের ঊর্ধ্বের জন্য একেক মাত্রার টোল নির্ধারণ করা হয়েছে। সড়কের ক্ষেত্রে তিন ক্যাটাগরির ভিত্তি টোল নির্ধারণ করা হয়েছে জানিয়ে মন্ত্রিপরিষদ সচিব বলেন, জেলা সড়কের ভিত্তি টোল ধরা হয়েছে ১শ’ টাকা। এছাড়া আঞ্চলিক মহাসড়কের ভিত্তি টোল ২শ’ টাকা, জাতীয় মহাসড়ক ৩শ’ টাকা এবং জাতীয় মহাসড়কের মধ্যে যেগুলোকে সরকার গুরুত্বপূর্ণ হিসাবে বিবেচনা করবে সেগুলোর ভিত্তি টোল হবে ৪শ’ টাকা।
ভিত্তি টোল
গুরুত্বপূর্ণ মহাসড়কের ভিত্তি টোল নির্ধারণ করা হয়েছে ৪শ’ টাকা। অর্থাত্ গুরুত্বপূর্ণ মহাসড়কে সাধারণ ট্রাকের টোল হবে ভিত্তি টোলের ১শ’ শতাংশ, অর্থাত্ ৪শ’ টাকা। গুরুত্বপূর্ণ মহাসড়কে চলতে ভারি ট্রাককে ভিত্তি টোলের ২শ’ শতাংশ অর্থাত্, ৮শ’ টাকা টোল দিতে হবে। আর এই সড়কে ট্রেইলরের ক্ষেত্রে টোল হবে ভিত্তি টোলের ২৫০ শতাংশ অর্থাত্ এক হাজার টাকা। গুরুত্বপূর্ণ মহাসড়কে বড় বাসের টোল হবে ভিত্তি টোলের ৯০ শতাংশ, মিনি ট্রাকের ৭৫ শতাংশ, মাইক্রোবাসের ৪০ শতাংশ, কৃষিপণ্য ব্যবহারের যানবাহন ৬০ শতাংশ, প্রাইভেট কার ২৫ শতাংশ এবং রিক্সা-ভ্যান, বাইসাইকেল, ঠেলাগাড়ির টোল হবে ভিত্তি টোলের আড়াই শতাংশ। সর্বনিম্ন টোল ৫ টাকার কম হবে না। ১৩টি শ্রেণীর যানবাহনের জন্য আলাদা আলাদা ভিত্তি টোল নির্ধারণ করা হয়েছে।
টোল আদায়
তিনভাবে টোল আদায় হবে জানিয়ে মন্ত্রিপরিষদ সচিব জানান, বড় গুরুত্বপূর্ণ মহাসড়কের জন্য অপারেশন অ্যান্ড ম্যানেজম্যান্ট পদ্ধতিতে টোল আদায় করা হবে, যা খোলা দরপত্রের মাধ্যমে নির্ধারিত হবে। বঙ্গবন্ধু সেতুতে বর্তমানে এই পদ্ধতিতে টোল আদায় করা হচ্ছে। অন্যগুলোতে উন্মুক্ত অকশনের মাধ্যমে টোল আদায় করা হবে। অকশনের মাধ্যমে টোল আদায় করা না গেলে ‘ডিপার্টমেন্টাল’ টোল আদায় করা হবে। তিনি বলেন, অকশন করা গেল না বা অকশন হচ্ছে না কিংবা অকশন নেয়ার পরেও নতুন করে টোল নির্ধারণ করতে হবে সেক্ষেত্রে ডিপার্টমেন্টাল (বিভাগীয়) পদ্ধতি ব্যবহার করা হবে। এটা অন্তর্বর্তী বা সাময়িক ব্যবস্থা। তিনি বলেন, সড়কের শ্রেণি (জাতীয়/আঞ্চলিক/জেলা) এবং যানবাহনের ক্যাটাগরির ভিত্তিতে টোল হার নির্ধারণ করা হবে। দুইটি সেতু কাছাকাছি হলে সময় বাঁচাতে এবং যানজট কমাতে দুইটি সেতুর টোল এক জায়গায় সংগ্রহ করা হবে।
মন্ত্রিপরিষদ সচিব বলেন, প্রতি তিন বছর পর পর টোলের হার রিভাইজ, সংশোধন এবং র্যাশনালাইজ করা হবে। অর্থ বিভাগের সম্মতিক্রমে ভিত্তি টোল রিভাইজ হবে। কারণ ভিত্তি টোল রিভাইজ করা হলে অন্যগুলো অ্যাডজাস্টমেন্ট হয়ে যাবে। তিনি বলেন, টোলের বিদ্যমান হার বাড়লেও সিগনিফিকেন্ট কোনো ইমপ্যাক্ট হবে না। দ্রব্যমূল্যের উপর কোনো প্রভাব পড়বে না। আদায়কৃত টোলের পরিমাণ আমাদের ওভারঅল জিডিপির তুলনায় অনেক কম। কবে থেকে এটা বাস্তায়ন করা হবে সে বিষয়ে নীতিমালায় কোনো তারিখ নির্ধারণ করে দেয়া হয়নি বলেও জানান মোশাররাফ। তিনি বলেন, সড়ক বিভাগ তাদের সুবিধামত সময়ে পর্যায়ক্রমে এটা বাস্তবায়ন করবে। এটা রাতারাতি বাস্তবায়ন করা যাবে না। প্রসঙ্গত, বর্তমানে কেবল সেতু ও দুইটি মহাসড়ক ব্যবহারের জন্য টোল আদায় করা হয়।
মন্ত্রিসভার বৈঠকে বীমা নীতিমালা উত্থাপনের কথা থাকলেও অর্থমন্ত্রী অনুপস্থিত থাকায় নীতিমালাটি ওঠেনি বলেও জানান মন্ত্রিপরিষদ সচিব।