রাতের শেষ প্রহরে রহমতের আমল
প্রকাশ : ২৭ মার্চ ২০১৪, ২০:০৪
রহমতের সময় বলতে রাতের শেষ তৃতীয়াংশকে বুঝায়। সূফী সাধকগণ এ সময়কে ধ্যান বা মোরাকাবার উত্তম সময় হিসেবে বেছে নেন। এ সময়ে নবীজি (স.) ও সাবাহাগণ নফল নামাজ ও মোরাকাবা করতেন। তাছাড়া দয়াল নবীজি প্রায় সারারাতই আল্লাহর দরবারে নামাজ, কান্নাকাটি, নফল ইবাদত ও মোরাকাবায় নিয়োজিত থাকতেন। তিনি শেষ রাতে বিভিন্ন নফল ইবাদত শেষে কিছুক্ষণ ঘুমাতেন। তারপর উঠে ফজরের নামাজ আদায় করতেন। সাহাবাদের অনেকে নবীজিকে অনুসরণ করে সারারাত ইবাদত করতেন। যদিও নবীজি চাইতেন না তারা এতটা কষ্ট করুক। রহমতের সময় হল রাত ৩টা থেকে ফজরের আগ পর্যন্ত। এ সময় প্রকৃতি থাকে নীরব, পরিবার পরিজনও থাকেন ঘুমিয়ে। জাগতিক কোন কাজকর্মেরও তাড়া থাকে না। ফলে এ সময়ে আল্লাহর ধ্যান-মোরাকাবা, নফল নামাজ, কলবে জিকির খেয়াল করা, মিলাদ শরিফ ও দরুদ পড়া, তজবিহ পাঠ করার অতি উত্তম সময়। গভীর রাতের এ ইবাদতগুলো এত মন দিয়ে করা যায় যে, এতে তরিকতপন্থী সাধকগণ সাধনার সোপান অতিক্রমের উত্কৃষ্ট সুযোগ পান। রাতের তৃতীয়াংশের ইবাদতের কথা কুরআন ও হাদিসে নির্দেশিত হয়েছে। এ সময় আল্লাহপাক বান্দার ডাকে অধিক সাড়া দেন। তিনি বান্দাকে অনুপ্রাণিত করতে থাকেন, তাঁকে ডাকতে বলেন, তাঁর ইবাদত করে তাঁর নৈকট্যলাভের আহ্বান করেন। হযরত আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত রসূল (স.) বলেছেন, “আমাদের প্রতিপালক প্রতি রাতের যখন শেষ তৃতীয়াংশ অবশিষ্ট থাকে তখন প্রথম আসমানে অবতরণ করেন এবং বলতে থাকেন, হে বান্দা আমার কাছে প্রার্থনা কর, আমি তোমার প্রার্থনা কবুল করব। আমার কাছে তোমার কি চাওয়া আছে, চাও, আমি তা দান করব। আমার কাছে তোমার জীবনের গুনাহর জন্য ক্ষমা প্রার্থনা কর, আমি তোমার গুনাহ মাফ করে দেব।” (বুখারী : ৬৯৮৬)। এভাবে মহান আল্লাহপাক ফজরের আগ পযন্ত তাঁর বান্দাদের ডাকতে থাকেন। আর যে বান্দা তার মাবুদ মাওলাকে ডাকার মত ডাকতে পারেন এবং আপন মোর্শেদের উসিলা ধরে আল্লাহর নিকট কাকুতি মিনতি করতে পারেন, রহমতের আমলের বদৌলতে তার ভাগ্যের দরজা খুলে যায়। রহমতের সময় যা কিছু আমল করা হয় তার সবগুলোই মূলত নফল ইবাদত। ফরজ ইবাদত পালন করা আমাদের অবশ্য কর্তব্য। তাই নফল এবাদতকে ওভারটাইম কর্মের সঙ্গে তুলনা করা যায়। সে জন্য এর ফজিলত বেশি। তাই সুযোগ পেলেই বেশি বেশি নফল ইবাদত করা উত্তম। অনেকেই ফরজ পড়েই তড়িগড়ি করে নামাজ শেষ করে ফেলেন, নফল পড়ার দিকে গুরুত্ব দেন না। অথচ হাদিসে কুদসিতে আল্লাহ বলেন, “যখন আমার বান্দা নফল ইবাদত দ্বারা আমার নৈকট্য লাভ করে, তখন আমি তাকে বন্ধু হিসেবে গ্রহণ করি, এমতাবস্থায় আমি তার কর্ণ হই, যদ্বারা সে শ্রবণ করে; আমি তার চক্ষু হই, যদ্বারা সে দর্শন করে; আমি তার হাত হই, যদ্বারা সে ধারণ করে; আমি তার পদযুগল হই, যদ্বারা সে হেঁটে বেড়ায়। এমন অবস্থায় সে আমার কাছে যা কিছু চায় আমি সঙ্গে সঙ্গে তা দান করি” (বুখারি : ৬০৫৮)। তরিকতপন্থী একজন সাধক প্রত্যহ ৫ ধরনের ফায়েজ কলবে ধারণ করেন। ১। ফজর ওয়াক্তে কুয়াতে এলাহীয়ার ফায়েজ। ২। জোহর ওয়াক্তে হযরত রসূল (স.)-এর মহব্বতের ফায়েজ। ৩। আসর ও মাগরিবে তওবা কুবলিয়াতের ফায়েজ। ৪। এশা’য় গাইরিয়াতের ফায়েজ এবং ৫। রাতের তৃতীয়াংশে রহমতের ফায়েজ। ফায়েজ শব্দের অর্থ প্রেমের প্রবাহ। এটা ঐশী শক্তি বা আল্লাহর নূরের তাপদাহ। প্রতিদিন পাঁচবার আল্লাহপাকের পক্ষ থেকে মোর্শেদের সিনাহ হয়ে মুরিদের অন্তরে ফায়েজ ওয়ারেদ হয় বা প্রবেশ করে। সাধককে মোরাকাবার মাধ্যমে মোর্শেদের দিলে দিল মিশিয়ে ফায়েজ অর্জন করতে হয়। ফায়েজ লাভের তিনটি ধাপ রয়েছে। প্রথমে মোর্শেদের দিলের সঙ্গে দিল মিশাতে হয়, পরে নবীজির দিলের সঙ্গে দিল মেশাতে হয়, অতঃপর রুহানীভাবে নবীজির দুখানা জুতা মোবারকের ধূলিকণা সেজে আল্লাহপাকের হুজুরে পৌঁছে মহান মাওলার নূর বা ফায়েজ অন্তরে ধারণ করতে হয়। এভাবে প্রতি ওয়াক্ত নামাজ শেষে সাধকের দিলে ফায়েজ পড়ে দিলের ময়লা দূর হয়। ফলে দিল আলোকিত হয়। আর আলোকিত দিলে এবাদতের মুহূর্তে আল্লাহর দর্শন লাভ হয়। এবং এবাদত কবুলের সুসংবাদ তথা শান্তিময় ফায়েজের শীতলতা দেহ ও আত্মা জুড়ে অনুভূত হয়। শেষরাত বা রহমতের সময়ের ইবাদতে একাগ্রতা স্থাপন করা সহজ। কেননা গভীর রাত কলবে জিকির খেয়াল করা বা চর্চা করার উত্তম সময়। কেননা, গৃহে বা অফিসে রাখা একটি ঘড়ির টিকটিক শব্দ সারাদিন শোনা যায় না। কিন্তু রাত যত গভীর হয় ওই ঘড়িটির শব্দও তত জোরে হয়। কালবের জিকিরের আওয়াজ ঠিক তেমনি অনুধাবিত হয়। হাদিসে আছে, “শেষ রাতে বান্দা আল্লাহপাকের খুবই নৈকট্য লাভ করে থাকে।” শেষ রাতে গভীর ধ্যান-মোরাকাবা ও আল্লাহর দরবারে কান্নাকাটি করলে আল্লাহ দয়া করে আমাদেরকে তাঁর নূরের ছায়াতলে জায়গা করে দেবেন। মোরাকাবার মূল কর্মসূচি হল, আপন হূদয়ে প্রথমে মোর্শেদ ও পরে রাসূলল্লাহ (স.)-এর কদম মোবারক ধরে নিজের জীবনের গুনাহ স্মরণ করে দরখাস্ত পেশ করা।
লেখক :সভাপতি, সূফীশীলন ফাউন্ডেশন, ঢাকা
e-mail : naturepathy@yahoo.com