মুক্তিযুদ্ধের নিরাবেগ আন্তরিক আখ্যান

একাত্তর মোরশেদ সফিউল হাসান প্রচ্ছদ :ধ্রুব এষ প্রকাশক :মাওলা ব্রাদার্স প্রকাশকাল :ফেব্রুয়ারি ২০১৪ মূল্য :একশত ষাট টাকা। এই উপন্যাসের কাহিনির উন্মোচন ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ থেকে, বাঙালি জাতির জীবনে যেদিন ঘটেছিল ইতিহাসের নৃশংসতম হত্যাকাণ্ড। আর তার পরদিন অর্থাত্ ২৬ মার্চ থেকেই শুরু হয়েছিল তার আনুষ্ঠানিক সশস্ত্র স্বাধীনতার সংগ্রাম। মোরশেদ সফিউল হাসান তার এই উপন্যাসের মাধ্যমে আমাদের সেই বীরত্বগাথাকে এক রৈখিকভাবে নয়, তার সবলতা-দুর্বলতা সমেত বহু কৌণিক দৃষ্টিভঙ্গি থেকে তুলে ধরেছেন। ফলে এই উপন্যাস স্লোগানধর্মিতার ধারকাছ ঘেঁষবার সুযোগ পায়নি। আমাদের সাহিত্যে মুক্তিযুদ্ধকে ছকবন্দি করে, সে উপন্যাস কি প্রবন্ধ, প্রবন্ধ কি ছোটগল্পের মাধ্যমে চিত্রিত করার যে চলের সৃষ্টি হয়েছে, মোরশেদের এই উপন্যাস তার থেকে একেবারেই ভিন্নতর পথের অভিসারী। এ উপন্যাস একদিকে যেমন ফ্যাকচুয়ালি, তেমনি কাহিনির পটভূমিও বিচিত্রমুখী। প্রতিটি চরিত্র রক্ত-মাংসের মানুষ হয়ে উঠেছে। ঢাকা, ঢাকার বাইরে কয়েকটি মফস্বল শহরের বৃত্তে এই উপন্যাসের কাহিনি যেমন তার ডালপালা মেলে দিয়েছে, তেমনি ভারতের কলকাতা, আগরতলা হয়ে সেখানকার সামরিক প্রশিক্ষণ কেন্দ্র পর্যন্ত তা বিস্তৃত হয়েছে। মোরশেদ তার এই উপন্যাসের পাত্র-পাত্রীদের যেখানেই যখন নিয়ে যাচ্ছেন, তারা যে পরিস্থিতির শিকার হচ্ছে, এবং সেসবের বর্ণনা এতটাই আন্তরিক যে, কখনোই তা এতটুকু আরোপিত মনে হয় না। আমাদের মুক্তিযুদ্ধ যখন চলছে, তখনকার পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতির ধারা, চীন, আমেরিকা ও রাশিয়ার ভূমিকা, যেভাবে তুলে ধরেন তিনি, মনে হয়, এসব-কিছুর বর্ণনা ব্যতিরেকে এই উপন্যাস যেন প্রাণ পেত না। এমন কি, তিনি যখন এই নীরেট সত্যটা তুলে ধরেন যে, আমাদের মুক্তিযুদ্ধকে পশ্চিমবঙ্গের বেশিরভাগ বাঙালি মুসলমান মেনে নেননি মন থেকেই, এক ধরনের নিরাপত্তা ভাবনা থেকে, তখন থমকে গিয়ে ভাবনার গভীরে ডুবে যেতে ইচ্ছে করে। মুক্তিযুদ্ধের চলমান পটভূমিতে উপন্যাসের পাত্র-পাত্রীদের যেসব পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হয়, ভয়-ভীতি ও যে ভয়ঙ্কর নির্যাতনের ভেতর দিয়ে যেতে হয়, মোরশেদের কলমে তা পুরোপুরি জীবন্ত হয়ে উঠেছে। এ উপন্যাসের অন্যতম চরিত্র হেলাল উদ্দিনের পরিণতি আবেগে থরো থরো করে তোলে। শেষত সেই মহাযুদ্ধের প্রস্তুতি। তরুণ সোহেল ট্রেনিং নিচ্ছে যুদ্ধের। চিনছে অস্ত্রের পর অস্ত্রের নাম। ট্রেনিং শেষে রওনা হয় দেশের উদ্দেশে। ‘শত্রু অধিকৃত হলেও ওই দেশটা তার’। যুদ্ধাভিযান শুরু হয় তাদের। দুস্তর বাধা। শত্রু নিধনের অভিযানে তবুও সামনে এগোনো। উপন্যাসের শেষ এখানেই। কিন্তু এই উপন্যাসের পাঠ শেষে মনে একটা গভীর খেদের জন্ম হয়। মাত্র ৮০ পৃষ্ঠায় এই উপন্যাস শেষ হবার ছিল না। এত বিস্তৃত এর পটভূমি, এতসব ঘটনার ঘনঘটা, মনে হয়েছে, মোরশেদ বেশ তাড়াহুড়ো করেই যেন সমাপ্তি টেনেছেন। তবুও যা পেয়েছি, তা অতুলনীয়। ‘একাত্তর’ আমাদের কথাসাহিত্যে নিশ্চিতই এক নতুন সংযোজনস্বরূপ সাহিত্য-ফসল।