নবরত্ন মন্দির
প্রকাশ : ২৭ মার্চ ২০১৪, ২০:১৭
বাংলাদেশজুড়েই ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আছে অসংখ্য প্রাকৃতিক আর মনুষ্যনির্মিত দর্শনীয় স্থান। মূলত এই স্থানগুলোর কথা মাথায় রেখেই প্রতি শুক্রবারের আয়োজনে থাকছে একটি করে দর্শনীয় স্থানের বিবরণ। আর আজ এতে প্রকাশিত হলো সিরাজগঞ্জের নবরত্ন মন্দির-এর কথা।
বাংলাদেশের বিভিন্ন স্থানে হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের যে কয়টি প্রাচীন মন্দিরের সন্ধান পাওয়া যায় তার মধ্যে অন্যতম হলো সিরাজগঞ্জ জেলার প্রায় পাঁচ কিলোমিটার পূর্বে হাটিকুমরুল ইউনিয়নে অবস্থিত নবরত্ন মন্দিরটি। ধারণা করা হয়ে থাকে যে, আনুমানিক ১৭০৪ থেকে ১৭২০ সালের মধ্যে নবাব মুর্শিদকুলি খানের শাসনামলে তার জনৈক নায়েব রামনাথ ভাদুরী এই মন্দির স্থাপন করেন। জানা যায়, মথুরার রাজা প্রাণনাথের অত্যন্ত প্রিয় ব্যক্তি ছিলেন জমিদার রামনাথ ভাদুরী। প্রাণনাথ দিনাজপুর জেলার ঐতিহাসিক কান্তজির মন্দির নির্মাণে বিপুল অর্থ ব্যয় করে সংকটে পড়ে যান এবং তিনি বাত্সরিক রাজস্ব পরিশোধ করতে ব্যর্থ হন। সে সময় বন্ধুত্বের খাতিরে নিজ কোষাগার থেকে টাকা দিয়ে রাজা প্রাণনাথের বকেয়া শোধ করেন রামনাথ ভাদুরী। তবে তিনি এই অর্থ প্রদানের শর্ত হিসেবে দিনাজপুরের কান্তজির মন্দিরের আদলে হাটিকুমরুলে ১টি মন্দির নির্মাণের দাবি জানান। পরবর্তী সময়ে রামনাথ ভাদুরীর শর্ত পূরণ করতেই রাজা প্রাণনাথ কান্তজির মন্দিরের অবিকল নকশায় হাটিকুমরুলে এ নবরত্ন মন্দির নির্মাণ করে দেন। এদিকে অপর একদল ঐতিহাসিকের মতে, রাজা প্রাণনাথ নন, বরং রাখাল জমিদার নামে পরিচিত রামনাথ ভাদুরী তার জমিদারি আয়ের সঞ্চিত কোষাগারের অর্থ দিয়েই এ মন্দির নির্মাণ করেছিলেন। প্রাচীন স্থাপত্যের অনন্য নিদর্শন হিসেবে কালের সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে থাকা এই নবরত্ন মন্দিরের মূল মন্দিরটি তিনতলা বিশিষ্ট। এ ছাড়া মূল মন্দিরের আশেপাশেই রয়েছে আরও কয়েকটি দোচালা ও আটকোনাকৃতি মঠ সদৃশ মন্দির। এক সময় প্রায় বারো শতক জায়গার ওপর নির্মিত মূল মন্দিরটির আয়তন ছিল প্রায় ১৫.৪ বর্গমিটার। আর পোড়ামাটির ফলকে লতা-পাতা ও দেব-দেবীর মূর্তি সদৃশ কারুকাজ দিয়ে গড়ে তোলা মন্দিরটিতে মোট চূড়ার সংখ্যা ছিল নয়টি। মূলত এ কারণেই মন্দিরটি নবরত্ন মন্দির নামে পরিচিতি পায়। এ ছাড়া অনেকে এটিকে দোল মন্দির হিসেবেও আখ্যায়িত করতেন। নবরত্ন মন্দিরের বিশাল চত্বরে বিক্ষিপ্তভাবে আরও ৩টি মন্দির রয়েছে। নবরত্ন মন্দিরের উত্তর পাশেই শিব-পার্বতী মন্দির, তার পাশে দোচালা চণ্ডি মন্দির এবং দক্ষিণপাশে পুকুরের পাড় ঘেঁষে রয়েছে পোড়ামাটির টেরাকোটা কারুকার্যখচিত শিবমন্দির। বহুকাল ধরে মহা ধুমধামে এ ৪টি মন্দিরেই পূজা অর্চনা করা হতো। তবে কালের বিবর্তনে ভারত উপমহাদেশে জমিদারি প্রথার বিলুপ্তি, দেশ বিভাগ ও নানা রাজনৈতিক পট পরিবর্তনে ক্রমেই অরক্ষিত হয়ে পড়া এই মন্দিরটি থেকে নানা সময়ে মূল্যবান সব সামগ্রী খোয়া যায়। তবে স্বাধীনতার পর প্রত্নতত্ত্ব বিভাগ পর্যায়ক্রমে এটি সংরক্ষণ ও রক্ষণাবেক্ষণ করে আসছে।