স্থানীয় সব নির্বাচন দলীয়ভাবে করা উচিত :প্রধানমন্ত্রী

প্রধানমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগ সভানেত্রী শেখ হাসিনা আগামীতে উপজেলাসহ স্থানীয় পর্যায়ের সকল নির্বাচন দলীয়ভাবে অনুষ্ঠান এবং চিরদিনের মতো নির্বাচনে অনিয়ম দূর করতে ‘ইলেকট্রনিক ভোটিং সিস্টেমে’ ভোট গ্রহণের পক্ষে মত দিয়েছেন। গতকাল বৃহস্পতিবার বিকালে কৃষিবিদ ইনস্টিটিউশন মিলনায়তনে মহান স্বাধীনতা দিবস উপলক্ষে আওয়ামী লীগ আয়োজিত আলোচনা সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এ মতামত তুলে ধরেন। প্রধানমন্ত্রী বলেন, স্বাধীনতার ঘোষণা নিয়ে যারা মিথ্যাচার করছে তারাই প্রথম রাষ্ট্রপতি নিয়ে নতুন ফর্মুলা দিচ্ছে। তারা (বিএনপি) এখন ফর্মুলা পাল্টেছে, এতোদিন বলেছে জিয়া স্বাধীনতার ঘোষক, এখন অর্বাচিনের মতো বলছে প্রথম রাষ্ট্রপতি! প্রধানমন্ত্রী প্রশ্ন রেখে বলেন, মুজিবনগর সরকারের ৪শ’ টাকা বেতনের কর্মচারী জেনারেল জিয়া স্বাধীনতার ঘোষক হলে কীভাবে স্বাধীনতাবিরোধী-যুদ্ধাপরাধীদের মন্ত্রী-প্রধানমন্ত্রী বানান? কীভাবে যেসব যুদ্ধাপরাধীর নাগরিকত্ব চলে গিয়েছিল তাদের দেশে ফিরিয়ে এনে নাগরিকত্ব দেন? কীভাবে নিষিদ্ধ জামায়াতসহ স্বাধীনতাবিরোধী দলগুলোকে রাজনীতি করার সুযোগ ও রাজনীতিতে পুনর্বাসন করেন? বঙ্গবন্ধুর আত্মস্বীকৃত খুনীদের বিভিন্ন দূতাবাসে চাকরি দিয়ে পুরস্কৃত করেন? নামে মুক্তিযোদ্ধা হয়ে কীভাবে জিয়া মুক্তিযুদ্ধের চেতনার সঙ্গে এমন গাদ্দারী করেন? আসলে কিছু অর্বাচিন মানুষকে বিভ্রান্ত করতেই এমন মিথ্যাচার করছে। প্রধানমন্ত্রী বলেন, জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানই বাংলাদেশের প্রথম রাষ্ট্রপতি। আর প্রথম উপরাষ্ট্রপতি সৈয়দ নজরুল ইসলাম এবং প্রথম প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদ। আর মুজিবনগর সরকারের চারশ’ টাকা বেতনের কর্মচারী ছিলেন জেনারেল জিয়া। সিআইএসহ বিদেশী বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থা, দেশি-বিদেশি পত্রিকাসহ সব জায়গাতেই আছে ২৬ মার্চকে স্বাধীনতার ঘোষণা দিয়েছেন, কার নির্দেশে ও নেতৃত্বে মুক্তিযুদ্ধ হয়েছে। এসব রিপোর্টে তো জেনারেল জিয়ার নাম নেই। তিনি বলেন, পাক প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া স্বাধীনতা ঘোষণার জন্য বঙ্গবন্ধুকে গ্রেফতার করে ফাঁসি পর্যন্ত দেয়ার চেষ্টা করেছিলেন। ইয়াহিয়ার মুখেও তো একটিবারের জন্য জিয়ার নাম আসেনি, তাকে গ্রেফতার করেনি। ইয়াহিয়া বঙ্গবন্ধুকে পাকিস্তানের শত্রু হিসাবে ঘোষণা করে। আর তো কারো নাম নেয়নি? জিয়া আসলে নামেই মুক্তিযোদ্ধা ছিলেন। তিনি বলেন, মিথ্যা ও অবৈধভাবে যে দলটির জন্ম, সেই দলটির (বিএনপি) কাছে এর থেকে বেশি কিছু আশা করা যায় না। স্থানীয় নির্বাচন প্রসঙ্গে প্রধানমন্ত্রী আরো বলেন, আগামীতে সব নির্বাচন দলীয়ভাবে করা উচিত। দলীয়ভাবে নির্বাচন না হলে প্রার্থীদের ওপর নিয়ন্ত্রণ থাকে না। নির্বাচনে কারচুপি ও অনিয়ম বন্ধ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, প্রথমদিকে বিদ্রোহী প্রার্থী বেশী থাকায় আমাদের অনেক জায়গায় হারতে হয়েছে। এখন বিদ্রোহী প্রার্থী দমনের ফলে নির্বাচনে ফল যখন আমাদের দিকে আশা শুরু করলো, তখন এক শ্রেণির লোক আছে যারা এমনভাবে লেখালেখি শুরু করলো যেন আমরা নির্বাচনে ভোট রিগিং (কারচুপি) করেছি! তিনি বলেন, বেশ কয়েকটি উপজেলা চেয়ারম্যান পদে এবং অনেকগুলো ভাইস-চেয়ারম্যান পদে জামায়াতের প্রার্থীরা বিজয়ী হয়েছেন। উপজেলা নির্বাচনে আওয়ামী লীগ যদি রিগিং করতো তাহলে জামায়াতের প্রার্থীরা একটি উপজেলাতেও জিততে পারতো না। তিনি বলেন, নির্বাচনে অনিয়ম বন্ধে ইলেকট্রনিক ভোটিংয়ে যেতে হবে, তাহলে ব্যালট ছিনতাই, সিল মারাসহ যেসব অনিয়মের অভিযোগ উঠে তা বন্ধ হয়ে যাবে। অবৈধ ভোট দেয়াও বন্ধ হয়ে যাবে। যুদ্ধাপরাধীদের বিচার ঠেকাতে দেশি-বিদেশি নানা চাপের কথা উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, বাংলাদেশ সব দিক থেকে এগিয়ে যাচ্ছে, এগিয়ে যাবেই। বাঙালি বীরের জাতি। তাই বাঙালি জাতিকে কেউ দাবায়ে রাখতে পারবে না। তিনি বলেন, যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের রায় যাতে কার্যকর না হয় সেজন্য আমার ওপর দেশি-বিদেশি প্রচণ্ড চাপ ছিল। কিন্তু আমি বঙ্গবন্ধুর কন্যা। একমাত্র আল্লাহ ছাড়া কারোর কাছে মাথা নত করি না। যেটা সত্য বলে জানবো সেটা বাস্তবায়ন করবোই। জাতীয় সঙ্গীত গেয়ে বিশ্বরেকর্ড সৃষ্টিতে অংশ নেয়া দেশবাসীর প্রতি কৃতজ্ঞতা জানিয়ে শেখ হাসিনা বলেন, এ কর্মসূচির মাধ্যমে বাংলাদেশসহ সারাবিশ্বে বাঙালিদের মধ্যে যে চেতনা জাগ্রত হয়েছে, প্রজন্মের পর প্রজন্ম সেই দ্বীপ শিখা নতুন করে জ্বালিয়ে দেশকে এগিয়ে নিয়ে যাবে। সংসদ উপনেতা সৈয়দা সাজেদা চৌধুরীর সভাপতিত্বে আলোচনা সভায় আরও বক্তব্য রাখেন আওয়ামী লীগের প্রবীণ নেতা আমির হোসেন আমু, তোফায়েল আহমেদ, সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত, বেগম মতিয়া চৌধুরী, সাধারণ সম্পাদক সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম, এম এ আজিজ, জাহাঙ্গীর কবির নানক, আহমদ হোসেন, খাদ্যমন্ত্রী কামরুল ইসলাম প্রমুখ। সভার শুরুতেই জাতির জনক বঙ্গবন্ধুসহ একাত্তরের বীর শহীদের স্মরণে এক মিনিট দাঁড়িয়ে নিরবতা পালন করা হয়। সৈয়দা সাজেদা চৌধুরী বলেন, জেনারেল জিয়া বাধ্য হয়ে মুক্তিযুদ্ধে গেলেও তার মনে ছিল পাকিস্তান। স্বাধীনতার রক্ষক না হয়ে পরবর্তীতে তিনি ভক্ষকের ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়েছিলেন। আমির হোসেন আমু তারেক রহমানের নাম উল্লেখ না করে বলেন, পাগল-ছাগলের বিষয়ে কোন কথা বলে তাঁর মূল্য বাড়াতে চাই না। প্রবীণ নেতা তোফায়েল আহমেদ বঙ্গবন্ধুর রাজনৈতিক সচিব থাকাকালে একটি অজানা সত্যি ইতিহাস তুলে ধরে বলেন, কোন অর্বাচিন কী বললো না বললো, সেটি নিয়ে কোন কথা বলতে চাই না। সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত বলেন, বিএনপি নেত্রী সব কূল হারিয়ে এখন দেশি-বিদেশি মোক্তার খুঁজে বেড়াচ্ছেন। সংলাপের কথা বলছেন। বিমানকে লাভজনক প্রতিষ্ঠানে পরিণত করতে হবে বাসস জানায়, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সেবার মান বাড়িয়ে বাংলাদেশ বিমানকে লাভজনক প্রতিষ্ঠানে পরিণত করতে বিমানের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন। তিনি বলেছেন, ‘লোকসানের বোঝা মাথায় নিয়ে কোন প্রতিষ্ঠান টিকে থাকতে পারে না। মনে রাখবেন, বিমান যাতে লাভজনক প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়, সে জন্য যথাযথভাবে সেবা দিয়ে যাবেন, কাজ করবেন, সেটাই আমরা চাই।’ প্রধানমন্ত্রী গতকাল বৃহস্পতিবার সকালে হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে ভিভিআইপি লাউঞ্জে বাংলাদেশ বিমানের উড়োজাহাজ বহরে সংযোজিত চতুর্থ ৭৭৭-৩০০ ইআর উড়োজাহাজ ‘রাঙা প্রভাত’ এর উদ্বোধন উপলক্ষে আয়োজিত অনুষ্ঠানে এসব কথা বলেন। একই অনুষ্ঠানে ইজিপ্ট এয়ার এর কাছ থেকে ভাড়া করা একটি বোয়িং ৭৭৭-২০০ ইআর উড়োজাহাজ বাংলাদেশ বিমান বাহিনীকে অর্পণ করা হয়। বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রী রাশেদ খান মেনন, একই মন্ত্রণালয়ের সচিব খুশিদ আলম চৌধুরী, বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের পরিচালনা বোর্ডের চেয়ারম্যান এয়ার মার্শাল (অব.) জামাল উদ্দিন আহমেদ, মার্কিন চার্জ দ্য এফেয়ার্স জন ডানিলোউইজ ও বাংলাদেশ বিমানের ব্যবস্থাপনা পরিচালক কেভিন স্টিল অনুষ্ঠানে বক্তৃতা করেন। শেখ হাসিনা বাংলাদেশ বিমানকে লাভজনক প্রতিষ্ঠানে পরিণত করতে পৃথক কার্গো সিস্টেমের প্রবর্তনের উপর জোর দেন। তিনি বলেন, বিমানবন্দর রেলওয়ে স্টেশন ও হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের মধ্যে আধুনিক যোগাযোগ ব্যবস্থার একটি সুরঙ্গ পথ তৈরি করা হবে। যাতে সারাদেশের যাত্রীরা সহজেই বিমানবন্দরে পৌঁছতে পারে। প্রধানমন্ত্রী বলেন, চুক্তি অনুযায়ী বোয়িং কোম্পানি এ পর্যন্ত ৪টি ৭৭৭-৩০০ ইআর উড়োজাহাজ বিমানের কাছে হস্তান্তর করেছে। অবশিষ্ট ২টি ৭৩৭-৮০০ উড়োজাহাজ ২০১৫ সালের নভেম্বর ও ডিসেম্বর মাসে হস্তান্তর করবে। ইতোমধ্যে উড়োজাহাজ দু’টির জন্য প্রি-ডেলিভারি পেমেন্ট বাবদ অর্থ পরিশোধ করা হয়েছে। সবগুলো উড়োজাহাজ সংগ্রহ সম্পন্ন হলে বাংলাদেশ বিমান বহরের উত্কর্ষ আরও বৃদ্ধি পাবে এবং বিমানের ভাবমূর্তি ও সেবার মান উন্নত হবে। প্রধানমন্ত্রী জানান, এছাড়াও দেশের অভ্যন্তরীণ সার্ভিস পরিচালনার জন্য বাংলাদেশ বিমান ২টি টারবো-প্রপ উড়োজাহাজ লীজ নিচ্ছে। আশা করা যাচ্ছে, খুব শিগগিরই টারবো-প্রপ উড়োজাহাজ বিমান বহরে যোগ হবে। তিনি বিমানবন্দরে চোরাচালানকৃত সোনা বাজেয়াপ্ত প্রসঙ্গে বলেন, চোরাচালান বৃদ্ধি পেয়েছে বলেই স্বর্ণ আটকের ঘটনা বেড়ে গেছে তা নয়, বরং বিমানবন্দরের নিরাপত্তা ব্যবস্থা আধুনিক ও যুগোপযোগী করা হয়েছে বলেই চোরাচালান আটকে দেয়া সম্ভব হচ্ছে। এভাবেই বিমানের পূর্বের দুর্নাম আমরা ঘুচাতে চাই। পরে প্রধানমন্ত্রী বিমানবন্দরের ভিভিআইপি লাউঞ্জের সামনে রাখা ৭৭৭-৩০০ উড়োজাহাজটি (রাঙা প্রভাত) পরিদর্শন করেন।