ভারতের নির্বাচনে অর্থনৈতিক ইস্যু
প্রকাশ : ২৮ মার্চ ২০১৪, ২০:১২
খাদ্য নিরাপত্তা বিল, জমি অধিগ্রহণ বিল এবং পেনশন বিলে সমর্থন দিয়ে লাভ হল না-কি লোকসান, তার হিসাব করতে ব্যস্ত হয়ে পড়েছিল ভারতীয় জনতা পার্টি (বিজেপি)। সংসদে দলের অবস্থা হয়েছিল শাঁখের করাতের মত। বিরোধিতা করলে বিপদ; ‘আমজনতার দুশমন’ অপবাদ জুটে যাওয়ার আশঙ্কা, সমর্থন করেও কোনও লাভ হয়নি। বিশেষ করে খাদ্য নিরাপত্তা বিল ও জমি অধিগ্রহণ বিল পাস হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই টেলিভিশন চ্যানেলে বিজ্ঞাপন মারফত সাফল্যের বয়ান দিতে শুরু করে কংগ্রেস নেতৃত্বাধীন ইউপিএ সরকার। লাভের গুড় ঘরে তুলতে ব্যস্ত কংগ্রেস আর এই বিলগুলো যে বিজেপির সাহায্য নিয়ে পাস করাতে সক্ষম হল ক্ষমতাসীন সংখ্যালঘু সরকার, সেই বিজেপি অসহায় দর্শক। তবে এ নিয়ে তাদের খুব বেশি চিন্তিত হওয়ার কারণ নেই। কারণ, আসছে লোকসভা নির্বাচন-পূর্ব সমস্ত জরিপেই অনেক এগিয়ে রয়েছে বিজেপি।
খাদ্য নিরাপত্তা ও জমি অধিগ্রহণের মতো দু’টি ব্রহ্মাস্ত্র প্রয়োগ করে বিজেপিকে এতটাই কোণঠাসা করে ফেলেছিল কংগ্রেস যে বিজেপি শুধুমাত্র কয়লাখনি বন্টন কেলেঙ্কারির মাঝে নিজেদের সীমাবদ্ধ রাখতে বাধ্য হয়েছিল। এই দু’টি বিল পাস করাতে সরকারকে সাহায্য করলেও কোনও ইতিবাচক প্রচারে যাওয়ার সুযোগ ছিল না প্রধান বিরোধী দলের। খাদ্য নিরাপত্তা বিল পাস হওয়ায় ভারতের ১২০ কোটি লোকের ৭০ শতাংশের কাছে শতকরা ৯০ ভাগ ভর্তুকিতে খাদ্যশস্য পৌঁছে যাওয়ার স্বীকৃতি মিলেছে। তার মানে প্রতিমাসে মাথাপিছু তিন রুপি কেজি দরে পাঁচ কেজি চাল, দু’রুপি কেজি দরে গম এবং এক রুপি কেজি দরে ভুট্টা পাওয়ার হকদার বনে যাচ্ছে গরিব জনগণ। এখন সরকারকে বছরে ৭০ লাখ টন খাদ্যশস্য অধিগ্রহণ করতে হয়। খাদ্য নিরাপত্তা প্রকল্পের জন্য বছরে ৬ কোটি ২০ লাখ খাদ্যশস্যের প্রয়োজন পড়বে। একেবারে গরিব তালিকাভুক্ত আড়াই কোটি পরিবার অন্তত অন্ন যোজনার আওতায় মাসে ৩৫ কেজি করেই খাদ্যশস্য পাবে। তবে প্রকল্প বাস্তবায়নের কাজ শুরু হতে আরো কয়েক মাস লেগে যাবে। কারণ, কারা এই প্রকল্পের আওতায় পড়বেন সেই তালিকাটা চূড়ান্ত করবে রাজ্য সরকারগুলো, আর এটি একটি দীর্ঘ প্রক্রিয়া। এর সুফল যদি ভালভাবে পাওয়া শুরু করতো লোকজন, তাহলে নিশ্চিতভাবেই ভোটের বাক্সে এর প্রভাব পড়তো। আমজনতা নগদ পেতে চায়। ভবিষ্যতে কখন কী হবে, সে হিসেব তারা খুব একটা করে না।
উচ্চাকাঙ্ক্ষী ও বহু প্রতীক্ষিত খাদ্য নিরাপত্তা বিল পাস করাতে গিয়ে শেষ পর্যন্ত খুব একটা বেগ পেতে হয়নি কংগ্রেসকে। ৫০ শতাংশ শহুরে বাসিন্দা এবং ৭৫ শতাংশ গ্রামীণ জনগণ সুফল পাবে বলে ক্ষমতাসীন কোয়ালিশন সরকারের মনে করাটাই স্বাভাবিক যে, এটি তাদের জন্য বিরাট এক সফলতা। কিন্তু সমালোচকরা বলছেন ভিন্ন কথা— খাদ্য নিরাপত্তা বিল পাস হওয়ায় খাদ্যশস্য বাবদ সরকারের ভর্তুকি অনেক বেড়ে যাবে। এ মুহূর্তে ভারত সরকারের ভর্তুকি বাবদ মোট ব্যয়ের ৪০ শতাংশেরও বেশি হয় খাদ্য বাবদ। পৃথিবীর অন্য কোনও দেশ এখন পর্যন্ত এত বড় খাদ্য নিরাপত্তা কর্মসূচি হাতে নেয়নি। প্রায় সোয়া এক লাখ কোটি রুপির খাদ্য নিরাপত্তা প্রকল্পের কারণে সরকারের খাদ্য ভর্তুকি অন্তত ৪০ শতাংশ বেড়ে যাবে। অনেকে বলছেন, এই সোয়া এক লাখ কোটি রুপিই যদি রাস্তাঘাট, বিদ্যুত্, বিদ্যালয় ও আইন-শৃঙ্খলার পেছনে ব্যয় করা হয় তাহলে বেশি সুফল আসবে। এতে করে উদ্যোক্তারা নতুন ব্যবসা খোলার জন্য উত্সাহিত হবে। ফলশ্রুতিতে বাড়বে দীর্ঘস্থায়ী চাকরি; বাড়বে সরকারের কর রাজস্ব। তাদের কথামতে, খাদ্য নিরাপত্তার নামে কাজের কাজ কিছুই হবে না; বাড়বে কালোবাজারি ও দুর্নীতি। ভারতে রেশনের দোকানগুলো থেকে প্রায় অর্ধেক সামগ্রী সরিয়ে নেয়া হয়। তারপর বিক্রি হয় খোলাবাজারে। কেউ কেউ বলছেন, খাদ্যশস্যের বদলে নগদ অর্থ দিয়ে সাহায্য করলেই বেশি ফল পাওয়া যাবে। আসলে ভোটের যুদ্ধে জিততেই খাদ্য নিরাপত্তা বিলটি পাস করাতে কংগ্রেস উঠেপড়ে লেগেছিল। তবে বিলের একটি দিক খুবই ভাল— শিশু, গর্ভবতী ও স্তন্যপান করানো মায়েদের প্রতি বিশেষ দৃষ্টি দেয়ার বিধান রাখা হয়েছে।
নানা চিন্তা-ভাবনা থেকেই খাদ্য নিরাপত্তা বিল পাস করানোর উদ্যোগ নেয় ইউপিএ সরকার। অপুষ্টি ভারতীয়দের কাছে নতুন কোনও বিষয় নয়। ইন্টারন্যাশনাল ফুড পলিনি রিসার্চ ইনস্টিটিউট প্রদত্ত বৈশ্বিক ক্ষুধা সূচকে ৭৯টি দেশের মধ্যে ভারতের অবস্থান ৬৫। তাদের তথ্যানুযায়ী, ভারতের ৬০ মিলিয়ন শিশু কম ওজন ও অপুষ্টিতে আক্রান্ত আর মো্ট জনসংখ্যার ২১ শতাংশ অপুষ্টির শিকার। ২০০৫ থেকে ২০১০, এই সময়ে কম ওজনের শিশুর প্রশ্নে ১২৯টি দেশের মধ্যে ভারত নিচের দিক দিয়ে দ্বিতীয় স্থানে ছিল। তাদের উপরে ছিল ইথিওপিয়া, নাইজার, নেপাল ও বাংলাদেশের মতো দেশ। একটি জরিপে দেখা গিয়েছিল, ভারতে সন্তান জন্মদানের বয়সসীমার ৩৬ শতাংশ নারীই কম ওজনবিশিষ্ট। তেইশটি সাব-সাহারান দেশের বেলায় এর গড় ছিল ১৬ শতাংশ। বিশ্বব্যাংকের রিপোর্ট অনুসারে, ব্যাহত শারীরিক প্রবৃদ্ধি, আয়োডিন ও আয়রনের ঘাটতিতে ভারতে উত্পাদনশীলতার ক্ষতির পরিমাণ জিডিপির ৩ শতাংশের সমান। ঔপনিবেশিক আমলের দুর্ভিক্ষ ও অপুষ্টির কথা না হয় মানা যায়। কিন্তু খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণ বর্তমান ভারতে অপুষ্টির বিষয়টি কিছুতেই মানা যায় না। সেজন্যেই আইনপ্রণেতা ও অর্থনীতিবিদদের কাছে উদ্বেগের বিষয় এই অপুষ্টি। তা দূর করতেই কংগ্রেস পাস করিয়ে নেয় খাদ্য নিরাপত্তা বিল, যাকে অনেকেই বলছেন নির্বাচনী কূটচাল। তবে বাস্তবতা হচ্ছে, সমস্ত জনমত সমীক্ষায় এখনও পর্যন্ত কংগ্রেসের থেকে শত যোজন এগিয়ে রয়েছে বিজেপি। ব্যক্তিগত জনপ্রিয়তায় কংগ্রেসের প্রধানমন্ত্রী পদপ্রার্থী রাহুল গান্ধীকে পেছনে ফেলেছেন নরেন্দ্র মোদি। কিন্তু একসময় যেমন একশ’ দিনের কাজ ও নারেগা প্রকল্প পাশা উল্টে দিয়েছিল, কংগ্রেসের পক্ষে সেইরকমভাবে খাদ্য নিরাপত্তা এবং জমি অধিগ্রহণ বিল দু’টি আগামী সংসদ নির্বাচনে কোনও যাদু দেখাতে পারে কি-না তা নিয়ে দুশ্চিন্তায় পড়ে গিয়েছিল বিজেপি। সে কারণে দলের মধ্যে দাবি ক্রমশ জোরালো হচ্ছিল নরেন্দ্র মোদিকে দ্রুত প্রধানমন্ত্রী পদপ্রার্থী হিসেবে ঘোষণা করা হোক। যাতে সংসদের বাদল অধিবেশনে কংগ্রেসের যে সাফল্য তা মোদির ভারে ও ধারে চাপা পড়ে যায়। সম্ভবত সেজন্যেই বিজেপির তত্পর শীর্ষনেতারা আরএসএস নেতৃত্বের সঙ্গে ঘনঘন বৈঠক ও চূড়ান্ত আলোচনা সেরে তাদের প্রধানমন্ত্রী পদপ্রার্থী হিসেবে বেছে নিয়েছিলেন।
ইউপিএ সরকারের এই দ্বিতীয় মেয়াদে ভারতের অর্থনৈতিক পরিস্থিতি খুব একটা সুখকর থাকেনি। প্রণব মুখোপাধ্যায়ের (বর্তমানে রাষ্ট্রপতি) পর পি.চিদাম্বরম অর্থমন্ত্রী হয়েও আগের মতো অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি দেখাতে পারেননি। ভাল ভাল পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়েছে সত্য; কিন্তু এগুলোর সুফল জনগণ পেতে শুরু করেনি। তার উপর বৈশ্বিক অর্থনৈতিক মন্দার ধাক্কা ভারতের উপরও লেগেছে। পরপর দু’বছর অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির হার ৫ শতাংশের নিচে থাকতে যাচ্ছে। অথচ পি. চিদাম্বরম চলতি অর্থবছরে প্রবৃদ্ধিকে ৬ শতাংশের উপরে টেনে তোলার ঘোষণা দিয়েছিলেন। আর এতে করে মনমোহন সরকারের বিরুদ্ধে তোলা নরেন্দ্র মোদির ব্যর্থতার অভিযোগ আরো জোরালো হয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে গুজরাটকে অন্যান্য রাজ্যের তুলনায় অনেক উপরে নিয়ে যাওয়াতেই তাঁর উপর ভরসা করতে চাইছে ভারতের বেশিরভাগ ভোটার। সেজন্যেই প্রধানমন্ত্রী পদপ্রার্থীদের মধ্যে তিনি রয়েছেন সুবিধাজনক অবস্থানে।