[আ ন্ত র্জা তি ক ]

এমন সফরই কাম্য

১৯৭২ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে যুক্তরাষ্ট্রের তত্কালীন প্রেসিডেন্ট রিচার্ড নিক্সন গিয়েছিলেন চীন সফরে। সেই সফরে তাঁর সঙ্গী হয়েছিলেন স্ত্রী প্যাট নিক্সন। ঐতিহাসিক সেই সফরকালে চীনের প্রধানমন্ত্রী চৌ এন লাইয়ের আমন্ত্রণে একাধিক ভোজসভায় যোগ দিয়েছিলেন অতিথিরা। এখনকার তুলনায় তখন যুক্তরাষ্ট্র-চীন সম্পর্ক ছিল অনেক বেশি স্পর্শকাতর, অনেক বেশি জটিল এবং দূরত্বের। তবে খাবার টেবিলে খুব হালকা আলোচনা, রসিকতা, তুচ্ছ বিষয়ে দৃষ্টি বিনিময় বড়বড় রাষ্ট্রনায়কদের একটি বরাবর কালচার। একসঙ্গে খেতে খেতে নিক্সন এবং চৌ এন লাই একপর্যায়ে আলোচনা করছিলেন যে চিড়িয়াখানায় জায়ান্ট পান্ডা দেখে ফার্স্ট লেডি প্যাট কেমন আচরণ করেছেন। প্যাট তখন চৌ এন লাইয়ের পাশেই বসেছিলেন। ফার্স্ট লেডি প্যাট দেখলেন টেবিলের এক পাশে গোলাপি মোড়কে জড়ানো সিগারেটের একটি বাক্স রাখা আছে। তিনি সেটি কাছে টেনে নিয়ে দেখলেন, গোলাপি মোড়কের গায়ে পান্ডার ছবি। উচ্ছ্বসিত হয়ে চৌ এন লাইয়ের দিকে সেটি তুলে ধরে বললেন, ‘কী অপূর্ব সুন্দর তাই না? সত্যিই ওদের আমার ভীষণ পছন্দ!’ চৌ এন লাই মুচকি হেসে বললেন, ‘এর দুটো আমি তোমাদের উপহার দেব।’ চৌ এন লাই সত্যিই উপহার দিলেন। ১৯৭২ সালে প্রেসিডেন্ট নিক্সন ওয়াশিংটনের ন্যাশনাল জু’তে পান্ডা হাউস উদ্বোধন করলেন, যেখানে ঠাঁই হল নতুন দুই চাইনিজ অতিথি লিং লিং এবং শিং শিং-এর। যুক্তরাষ্ট্রের কর্তৃপক্ষ অবাক হয়ে দেখল, শতশত দর্শক প্রতিদিন ভিড় করে পান্ডা দুটোকে শুধু একনজর দেখতে। বছরের পর বছর সে আগ্রহ তাঁদের এক ফোঁটাও কমেনি। ১৯৯০ সাল পর্যন্ত এই পান্ডা দুটো বেঁচেছিল। ওরা পাঁচটি বাচ্চাও প্রসব করেছিল। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্রের প্রাণী বিজ্ঞানীরা শত চেষ্টা করেও বাচ্চাগুলোকে কয়েকদিনের বেশি বাঁচিয়ে রাখতে পারেনি। প্রকৃতির খেয়াল, যত যত্নই করো, চীন ছাড়া আর কোথাও যেন ওদের জন্ম নেওয়া নিষেধ! যাহোক, পশ্চিমা কূটনীতিকদের অনেকেই মনে করেন, সেই পান্ডা কূটনীতি থেকেই চীন-যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্কের কঠিন বরফ গলতে শুরু করেছিল। সেটাই নাকি ছিল চৌ এন লাইয়ের কূটনৈতিক সম্পর্ক গড়ে তোলার বড় ইঙ্গিত। সম্পর্কের এই বরফ যত ধীরেই হোক, এখনও অব্যাহতভাবে গলছে। কী অর্থনীতিতে, কী রাজনীতিতে। ওই পান্ডা দুটোর মৃত্যুর পর চীন নতুন করে কোনো পান্ডা চিরতরে উপহার না দিলেও প্রতি পাঁচ বছরের জন্য যুক্তরাষ্ট্রকে পান্ডা ধার দিয়ে আসছে। চীনের দীর্ঘদিনের একটি অলিখিত রেওয়াজ হল, কোনো রাষ্ট্রের সঙ্গে উষ্ণ সম্পর্ক তৈরি হলে হয় পান্ডা উপহার অথবা ধার দেওয়া। সম্পর্কোন্নয়নে চীনে প্রথম পান্ডার ব্যবহার করেছিলেন কমিউনিস্ট নেতা মাও সে তুঙ। তাই প্রায়শই ভিন্ন দেশের রাষ্ট্রনায়কদের সঙ্গে চীনের নেতাদের কূটনীতিকে ‘পান্ডা ডিপ্লোমেসি’ বলা হয়ে থাকে। ফার্স্টলেডি প্যাট নিক্সনের সেই সফরের ৪২ বছর পর আরেক ফার্স্টলেডি মিশেল ওবামা ২০ মার্চ পা ফেলেছিলেন চীনের মাটিতে। এক প্রাণোচ্ছল ও ব্যতিক্রম সফর সেরে ফিরে গেছেন নিজ দেশে। যুক্তরাষ্ট্রের ফার্স্ট লেডি হিসাবে এটি ছিল তাঁর এক ব্যতিক্রম সফর। যেন এলেন, দেখলেন এবং জয় করে নিলেন। সাত দিনের শিক্ষা সফরে তাঁর সঙ্গী ছিল দুই মেয়ে মালিয়া এবং শাশা। আর সঙ্গে ছিলেন মিশেল ওবামার মা মারিয়ান রবিনসনও। চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিঙপিঙ এবং ফার্স্ট লেডি পেঙ লিউয়ানের উষ্ণ আতিথেয়তার মধ্য দিয়ে আনন্দে ভেসে বেড়িয়েছেন যুক্তরাষ্ট্রের ফার্স্টলেডি, দুই মেয়ে আর ওদের নানী। বিশেষ করে ফার্স্ট লেডি মিশেল ছিলেন সবচেয়ে সরস। কখনো শারীরিক কসরতের চীনের ঐতিহ্যবাহী তাই চি খেলতে নেমে পড়েছেন মাঠে স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থীদের সঙ্গে, আবার দৌড়ে চলে গেছেন জিয়ান প্রদেশের চীনের প্রাচীরের উপর। কোথাও বা প্রাণ খুলে নেচেছেন চীনের ঐতিহ্যবাহী লোকনৃত্য। দুই মেয়েকে নিয়ে উল্লাসে মেতে উঠেছেন। এক পর্যায়ে জেঙদু শহরে পান্ডা দেখতে গিয়ে পরম আদরে কচি বাঁশের ডগা (জায়ান্ট পান্ডার প্রধান খাবার) খাইয়েছেন বিরল এই প্রাণীদের। আন্তরিকতা ও প্রাণবন্ত আচরণ দিয়ে বন্ধু করে নিয়েছেন চীনে দেখা হওয়া তরুণ-তরুণীদের। গোটা চীনের মানুষকে তাঁর আবেগ, আনন্দমুখর বিভিন্ন অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণ দিয়ে যার পর নাই মুগ্ধ করেছেন। তিনি চীনের শিক্ষার্থীদের জন্য অত্যন্ত তাত্পর্যপূর্ণ বক্তব্য রেখেছেন। একটি স্কুলে ভাষণ দিতে গিয়ে বলেছেন, ‘অনেক বছর আগে আমেরিকায় কালোদের প্রতি বৈষম্যমূলক আইন ছিল, যে কালোরা ছিল সংখ্যালঘু। কিন্তু সময়ের পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে আমেরিকার সাধারণ জনগণ সিদ্ধান্ত নিয়েছে যে ওই আইনগুলো সঠিক নয়। আজ পঞ্চাশ বছর পর আমার স্বামী আমেরিকার প্রেসিডেন্ট এবং আমি ফার্স্ট লেডি।’ এসব কথার মধ্য দিয়ে তিনি চীনের সংখ্যালঘু তিব্বতীদের ইঙ্গিত করেছেন বলেই সবাই মনে করছে। কিন্তু মিশেল ওবামার এই সফর কী শুধুই আনন্দ আর উষ্ণ আতিথেয়তার মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল? তা মনে হয় না। এত আনন্দ, উষ্ণতার মধ্যে তিনি পিকিং বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্র-ছাত্রীদের সামনে একথা বলতে ভুলে যাননি যে প্রত্যেকের নিজেকে স্বাধীনভাবে তুলে ধরার অধিকার আছে। গোটা দুনিয়ার মানুষের ইন্টারনেট ও সংবাদ মাধ্যমের সাহায্যে তথ্য জানা উচিত। ইঙ্গিত সুস্পষ্ট। চীনের নাম উল্লেখ না করলেও এ আওয়াজ যে চীন সরকারের দিকে তা দেশটিও ভাল করেই বুঝতে পেরেছে। কারণ চীনে ইন্টারনেটের ব্যবহার নিয়ন্ত্রিত। বিশেষ করে ফেসবুক, টুইটার এসব ব্যবহারে রয়েছে বেশ কড়াকড়ি। আর এমন কথা চীনের খুব একটা ভালো লাগেনি তা বোধগম্য। তারপরও মিশেল ওবামার এই সফরে অত্যন্ত প্রীত হয়েছেন চীনের কর্তৃপক্ষ, অতিথিদের প্রতি উষ্ণ ছিলেন চীনের নেতারা। মুগ্ধ হয়ে টেলিভিশনে চীনের কোটি কোটি মানুষ দেখেছে ওবামা পরিবারের সব আচরণ। এ সফরে তিনি সরাসরি রাজনৈতিক একটি শব্দও ব্যবহার করেননি। কিন্তু বিশ্বের রাজনৈতিক ভাষ্যকারদের মতে, রাজনীতিকে তথা চীন-যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্ককে এ সফর অনেক বেশি সাবলীল করে তুলেছে। রাজনীতিবিদ অথবা রাষ্ট্রনায়করা সফরে গিয়ে শুধু ভারী ভারী বৈঠকের মধ্য দিয়েই মতৈক্য, বন্ধুত্ব প্রতিষ্ঠা করতে হবে এমন কোনো কথা নেই। অতি হালকা মেজাজে কোনো মতপার্থক্য নিয়ে আলোচনার টেবিলে না বসেও যে সম্পর্কের উষ্ণতা শতগুণ বাড়িয়ে দেওয়া যায়, মিশেল ওবামার সফর ছিল তারই উদাহরণ। এর জন্য প্রয়োজন পরস্পর মিলিত হওয়া দুটি জাতির নেতৃবৃন্দের পরিণত উপলব্ধি এবং সুশীল মানসিকতা। এমন পরিণত বোধ থাকলে নগদ কী পেলাম সে সম্পর্কে দুশ্চিন্তা না থাকলেও চলে। তিব্বতের ভিন্ন মতাবলম্বী নেতা দালাইলামা বলেছিলেন, Today different ethnic groups and different nations come together due to common sense. এই কমন সেন্স একটি জাতির নেতৃত্বপ্রদানকারীদের জন্য বিশেষ প্রয়োজন। ধরা যাক তৃতীয় বিশ্বের কোনো দেশের একজন নেতা গেলেন ব্রিটেনে। উদ্দেশ্য বাণিজ্য আদায়। ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী ভাবলেন, অতিথিকে একটু টেমস নদীতে ঘুরিয়ে আনা যাক। ঠিক সেই সময় তৃতীয় বিশ্বের নেতা হয়তো মনে মনে ভাবলেন, টেমস নদীতে ঘুরে আমার লাভ কী। বরং এখন এই বিকেলে বাণিজ্য চুক্তিটা নিয়ে আলোচনা করলে হতো না! এ ধরনের সফর না করাই ভাল। তাতে কাগজপত্রে কিছু এলেও প্রকৃত বন্ধুত্ব এবং আন্তরিক সহযোগিতার সম্পর্ক তৈরি হয় বলে মনে হয় না। বরং পশ্চাত্পদ মানসিকতাই প্রকট হয়ে ওঠে। এ ব্যাপারে তৃতীয় বিশ্বের নেতাদের এখন আরো খোলামেলা হওয়ার প্রয়োজন আছে। লেখক: সাংবাদিক ও কথাসাহিত্যিক mohshinhabib@yahoo.com