অপরিকল্পিত নগরায়ণ অর্থনৈতিক বোঝা

জলাশয় ভরাট, নগরায়ন এবং সুশাসন বিষয়ে আয়োজিত এক সেমিনারে বক্তারা বলেছেন, রাজধানী এবং এর আশপাশের জলাশয়গুলো রক্ষায় পর্যাপ্ত আইন থাকলেও প্রভাবশালীরা এই আইন মানেন না। অনেকে অর্থনৈতিক উন্নয়নের কথা বলে পরিবেশ ধ্বংস করছেন। অপরিকল্পিত নগরী দেশের জন্য দীর্ঘমেয়াদে অর্থনৈতিক বোঝা তৈরি করছে। বক্তারা বলেন, জলাশয় রক্ষা করা কোন সৌখিন বিষয় নয়, বরং এর অর্থনৈতিক উপযোগিতা ব্যাপক। তবে আমাদের জীবনমানের উন্নতি না হলে পরিবেশ দূষণ এবং জলাশয় ভরাট বন্ধ করা যাবে না। গতকাল শনিবার রাজধানীর সিরডাপ মিলনায়তনে বাংলাদেশ পরিবেশ আইনবিদ সমিতি (বেলা), বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলন (বাপা), বাংলাদেশ ইন্সটিটিউট অব প্লানার্স (বিআইপি), ইন্সটিটিউট অব আর্কিটেক্টস, বাংলাদেশ (আইএবি), ইন্সটিটিউট অব ইঞ্জিনিয়ার্স বাংলাদেশ (আইইবি), এসোসিয়েশন অব বুয়েট এলামনাই (এবুয়েটা) যৌথভাবে এ সেমিনারের আয়োজন করে। এবুয়েটা সভাপতি অধ্যাপক জামিলুর রেজা চৌধুরীর সঞ্চালনায় এতে প্রধান অতিথি ছিলেন গৃহায়ণ ও গণপূর্ত মন্ত্রী ইঞ্জিনিয়ার মোশাররফ হোসেন, সম্মানিত অতিথি ছিলেন পরিবেশ ও বন মন্ত্রী আনোয়ার হোসেন মঞ্জু। এতে পরিবেশ বিশেষজ্ঞরা বক্তব্য রাখেন। আনোয়ার হোসেন মঞ্জু বলেন, আমরা অনেক সময় হতাশ হয়ে পড়ি। কিন্তু স্বাধীনতার আগে বাংলাদেশ কেমন ছিলো আর এখন কেমন হয়েছে তা বিশ্লেষণ করলে আমরা বুঝতে পারবো আমোদের হতাশ হবার কিছু নেই। তিনি বলেন, আমাদের স্বপ্ন আছে, আত্মবিশ্বাস আছে। শুধু আমাদের সমস্যাগুলো চিহ্নিত করে অগ্রাধিকারভাবে সেগুলোর সমাধান করতে হবে। তিনি বলেন, পরিবেশ ও বন মন্ত্রণালয় বিভিন্ন মন্ত্রণালয়কে অর্থ দেয়। কিন্তু এ অর্থে যেসব প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হয় সেগুলো মনিটরিং-এর কোন ব্যবস্থা নেই। তিনি বলেন, বাংলাদেশ একটি অপার সম্ভাবনার দেশ। এখানকার মানুষ যথেষ্ট পরিশ্রম করে। বিদেশে যারা কাজ করছেন তাদের প্রেরিত অর্থ দিয়ে আমরা রিজার্ভ বাড়িয়েছি। এখন তা ১৮ বিলিয়ন মার্কিন ডলার ছাড়িয়ে গেছে। আমাদের অর্জনকে অবমূল্যায়ন করা ঠিক হবে না। পরিবেশ মন্ত্রী বলেন, স্বৈরাচার সরকারের সময়ে অনেক কঠিন সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন করতে হয়। কিন্তু গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় সকলের কথা শুনতে হয়। আমাদের বাজেট যে হারে বেড়েছে, উন্নয়ন বাজেট সে হারে বাড়েনি। বাজেটের সিংহভাগ চলে যায় রাজস্ব খাতে। পরিবেশ মন্ত্রী বলেন, আমরা যদি আমাদের জীবনমানের উন্নতি করতে না পারি তাহলে পরিবেশ কেন, কোন দূষণই বন্ধ হবে না। প্রধান অতিথির বক্তব্যে গৃহায়ণ ও গণপূর্ত মন্ত্রী ইঞ্জিনিয়ার মোশাররফ হোসেন বলেন, জলাশয় ভরাট করে আবাসন প্রকল্প বাস্তবায়ন করতে দেয়া হবে না। বর্তমান সরকার এ ব্যাপারে সচেতন। তবে গুলশান এবং বনানী লেকের অধিকাংশ দখল হয়ে গেছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, এখানে অনেককে প্লট দেয়া হয়েছে। আমরা ক্ষমতায় এসে এ দখলবাজি বন্ধ করেছি। তিনি বলেন, ঢাকা শহর ইতিমধ্যে নষ্ট হয়ে গেছে। স্যাটেলাইট টাউন করতে পারলে রাজধানীর আবাসনের ওপর চাপ অনেক কমবে। এক্ষেত্রে তিনি ওয়াশিংটনের পাশে ভার্জিনিয়া শহরের কথা উল্লেখ করেন। গণপূর্ত মন্ত্রী বলেন, ভূমিদস্যুদের হাত থেকে সাধারণ মানুষকে বাঁচাতে রাজউক বড় ভূমিকা রাখতে পারে। জলাশয় ভরাট বন্ধের জন্য তিনি আইনের শাসন নিশ্চিত করার ওপর জোর দেন। এবুয়েটার সভাপতি অধ্যাপক জামিলুর রেজা চৌধুরী বলেন, আমরা সবাই ঢাকা শহরকে বাঁচানোর কথা বলছি। ঢাকাকে পরিকল্পিত নগরী হিসেবে গড়ে তুলতে হলে জলাশয় ভরাট এখনি বন্ধ করেত হবে। তিনি বলেন, বন্যাপ্রবাহ এলাকায় কোন আবাসন পকল্পের অনুমতি দেয়া যাবে না। আর তত্ত্বাবধানকারী প্রতিষ্ঠান হিসেবে রাজউক প্লট ব্যবসায় নামতে পারে না। এর জন্য আলাদা অথরিটি গড়ে তুলতে হবে। পিপিআরসির নির্বাহী সভাপতি ড. হোসেন জিল্লুর রহমান বলেন, অনেকে অর্থনৈতিক উন্নয়ন এবং পরিবেশকে মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দিচ্ছেন। এটি মোটেই বিপরীত ধারণা নয় আবাসনের জন্য জলাশয় ভরাট বন্ধ করার কথা বলা হলেও কেউ আইন মানছে না। স্থপতি মোবাশ্বর হোসেন বলেন, জলাশয় ভলাট করে তৈরি করা বিজিএমইএ ভবনের সামনে সাবেক এবং বর্তমান প্রধানমন্ত্রীর নামফলক ঝুলছে। প্রধানমন্ত্রীকে মিথ্যা তথ্য দিয়ে যারা বিভ্রান্ত করেছে তাদের বিচার হওয়া উচিত। চোখের সামনে ধানমন্ডি মাঠ দখল হয়ে যাচ্ছে। এ দখল উত্সব বন্ধ করতে হবে। সুজনের বদিউল আলম মজুমদার বলেন, যারা জলাশয় ভরাট করছে তাদের বিরুদ্ধে কথা বলা যায় না। আর যারা বলবে তাদের বিরুদ্ধে কাল্পনিক অভিযোগ তোলা হয়। তিনি ডিটেইল এরিয়া প্লান রিভিউ’র নামে যাতে আইনের শাসন ভুলণ্ঠিত না হয় সেদিকে খেয়াল রাখার আহবান জানান। স্বাগত বক্তব্যে বেলার প্রধান নির্বাহী সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান বলেন, জলাশয় ভরাট করে আবাসন প্রকল্প যাতে করা না যায় সে লক্ষ্যে বেশ কয়েকটি আইন রয়েছে। এছাড়া আমাদের সংবিধানেও জলাশয় রক্ষার কথা বলা আছে। অন্যকিছু আইনও জলাশয় রক্ষার ক্ষেত্রে কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে। এ প্রসংগে তিনি দুর্নীতি দমন কমিশন আইন এবং তথ্য অধিকার আইনের কথা উল্লেখ করেন। রিজওয়ানা বলেন, ড্যাপ নিয়ে বড় দুর্নীতি আছে। ড্যাপ এর মূদ্রিত কপি আমরা এখনো পাইনি। অনুষ্ঠান অন্যান্যের মধ্যে বিশ্ব সাহিত্য কেন্দে বাপার যুগ্ম সম্পাদক স্থপতি ইকবাল হাবিব, বিআইপির নির্বাহী সদস্য স্থপতি খোন্দকার এম আনসার হোসেন এবং বুয়েটের নগর ও অঞ্চল পরিকল্পনা বিভাগের অধ্যাপক ড. ইশরাত আলম মূল নিবন্ধ উপস্থাপন করেন।