বিমান উদ্ধারে মহা কর্মযজ্ঞ
প্রকাশ : ৩০ মার্চ ২০১৪, ২২:১৪
পলিথিনে মোড়ানো বস্তুগুলো পেয়ে তাদের যেন চক্ষুচড়ক গাছ। শুরু হলো পরীক্ষা-নিরীক্ষা, পর্যবেক্ষণ। ওদিকে, বস্তু পাওয়ার খবর আগেই ছড়িয়ে পড়ে নিখোঁজ যাত্রীদের স্বজন আর প্রিয়জনদের মাঝে। তারাও ভাবছে, অধীর অপেক্ষার পালা এইবার বোধ হয় শেষ হবে। কিন্তু আমসা তাদের পেজে জানালো সবই পণ্ডশ্রম। বস্তুগুলো কেবলই আবর্জনা, নিতান্তই সামুদ্রিক। এর কয়েকটি আকারে খুবই ছোট। শুধুমাত্র একটিকেই পাওয়া গেলো, যা মাছ ধরার সরঞ্জাম হতে পারে
দক্ষিণ ভারত মহাসাগর। যেখানে কিছুক্ষণ পরপরই বায়ু তার গতিপথ পাল্টায়। তৈরি করে ঘূর্ণাবর্ত আর ঘনঘন মেঘমালা। এরই ফাঁক গলে নিরাপদ দূরত্বে থেকে শকুনচোখে সাগরে ভাসমান কিছু খুঁজে পেতে মরিয়া বেশ কয়েকটি অনুসন্ধানী বিমান। এ নিয়ে চীন, ফ্রান্স, অস্ট্রেলিয়া, নিউজিল্যান্ড, আর মার্কিন উড়োজাহাজের মধ্যে ছিলো এক ধরনের প্রতিযোগিতাও। অবশেষে হ্যাঁ, দেখা মিলেছে। এবার স্যাটেলাইটে নয়, সরাসরি বিমানের চোখে। অনেকগুলো বস্তু ভাসছে। বিভিন্ন আকারের, বিভিন্ন রংয়ের। হয়তো এখানেই আছড়ে পড়েছিলো মালয়েশিয়ার ফ্লাইট এমএইচ থ্রি সেভেন জিরো। মুহূর্তেই ইথারে সেই খবর ছড়িয়ে গেলো সারা বিশ্বে। কিন্তু ঠিক তখনই ধাওয়া দিলো দক্ষিণ ভারত মহাসাগরের স্বভাবসুলভ বৈরি ঝড়। বিমানগুলো নিজেরা নিখোঁজ হওয়ার ভয়ে ফিরে এলো পার্থে।
পার্থ। অস্ট্রেলিয়ার দক্ষিণ-পশ্চিম নগরী। এখান থেকেই পরিচালিত হচ্ছে নিখোঁজ বিমানের অনুসন্ধান কাজ। সেখানেই মোতায়েন জাপান ও দক্ষিণ কোরিয়ার অত্যাধুনিক ‘পি-৩ ওরিয়ন’, যুক্তরাষ্ট্রের ‘পি-৮ পোসেডন’সহ বিভিন্ন দেশের বিশালাকার উদ্ধারকারী জাহাজ আর বিমান। এর সাথে এ কাজে নতুন যোগ দিয়েছে চীনের টহল জাহাজ ‘হাইশুন-০১’ এবং বিমান অত্যাধুনিক ‘আইএল-৭৬’। বহুজাতিক এই অনুসন্ধান কাজের সমন্বয়ক অস্ট্রেলিয়া। এ দেশটিও ভারত মহাসাগরে নামিয়েছে ‘এইচমাস সাকসেস’ জাহাজ ও রয়াল বিমান বাহিনীর দু’টি উড়োজাহাজ। তাদের অনুসন্ধান কাজের আপডেট প্রতিনিয়তই বিশ্ববাসীকে জানিয়ে দিচ্ছে অস্ট্রেলিয়ার সমুদ্র নিরাপত্তা কর্তৃপক্ষ- আমসা। সে সবে ভরে গেছে সংস্থাটির ফেসবুক ও টুইটার পেজ। শনিবারও গগনবিদারি আওয়াজ তুলে পার্থ থেকে আটটি বিমানের সাথে পাল্লা দিয়ে উড়াল দেয় চীনের আইএল-৭৬। সোজা আঠারোশ’ কিলোমিটার উত্তর-পশ্চিমে। অথৈ পানিতে যতদূর চোখ যায়, শকুন দৃষ্টি। স্যাটেলাইট ছবিতে তো এরকম স্থানেই দেখা গেছে ভাসমান কিছু। এদিকে সাগরের আবহাওয়াও রুক্ষ। এমন সময় বেশকিছু ভাসমান বস্তু নজরে এলো আইএল-৭৬ কর্মকর্তাদের। বার্তা পাঠালো টহল জাহাজ হাইশুনকে। ‘এইচমাস সাকসেস’ও পেলো আরো কিছু। জ্বালানি ফুরিয়ে যাবার আগেই তারা সাগর থেকে কয়েকটি বস্তু উঠিয়ে নিয়ে অভিযান গুটিয়ে রওনা দিলো পার্থে।
তদন্ত কর্মকর্তারা ব্যাপক আশাবাদী। পলিথিনে মোড়ানো বস্তুগুলো পেয়ে তাদের যেন চক্ষুচড়ক গাছ। শুরু হলো পরীক্ষা-নিরীক্ষা, পর্যবেক্ষণ। ওদিকে, বস্তু পাওয়ার খবর আগেই ছড়িয়ে পড়ে নিখোঁজ যাত্রীদের স্বজন আর প্রিয়জনদের মাঝে। তারাও ভাবছে, অধীর অপেক্ষার পালা এইবার বোধ হয় শেষ হবে। কিন্তু আমসা তাদের পেজে জানালো সবই পণ্ডশ্রম। বস্তুগুলো কেবলই আবর্জনা, নিতান্তই সামুদ্রিক। এর কয়েকটি আকারে খুবই ছোট। শুধুমাত্র একটিকেই পাওয়া গেলো, যা মাছ ধরার সরঞ্জাম হতে পারে।
মালয়েশিয়ার রাজধানী কুয়ালালামপুর। হুমড়ি খাওয়া সাংবাদিক আর ক্যামেরাম্যানে ঠাঁসা গোটা হলরুম। কিন্তু পিনপতন নিরবতা। যোগাযোগমন্ত্রী হিশামউদ্দিন হুসেইনের সংবাদ সম্মেলন চলছে। হয়তো ব্রেকিং কোন খবর মিলবে। সবাই অধীর আগ্রহী শ্রোতা। হিশামউদ্দিন জানান, অনুসন্ধান এলাকার কিছুটা পরিবর্তন হয়েছে। কারণ শেষ তথ্য অনুযায়ী নিখোঁজ বিমানটি ধারণার চেয়েও বেশি গতিতে উড়ছিলো। এতে আরো আগেই এর জ্বালানি শেষ হবার কথা। সেই অনুসারে অনুসন্ধান এলাকা আরো এগিয়ে আনা হয়েছে। তিন সপ্তাহ গড়িয়ে গেলেও নিখোঁজ বিমান নিয়ে এখন পর্যন্ত কোন সমাধানে আসা যায়নি। বিমানটি কোথায় গেলো, আদৌ সমুদ্রে পড়েছে কি-না, তা নিয়েও নতুন করে দেখা দিয়েছে সন্দেহ, সংশয়। তা সত্বেও বড্ড আশাবাদী মানুষ যোগাযোগমন্ত্রী হিশামউদ্দিন। নিখোঁজ যাত্রীদের স্বজনদের জন্যও তাঁর দরদ সীমাহীন। অনুসন্ধান তত্পরতা আর স্যাটেলাইট ছবি নিয়ে সর্বশেষ তথ্য দিয়ে হিশামউদ্দিন বলে উঠলেন, ‘সমুদ্র কতটা দুর্গম, সেটা গুরুত্বপূর্ণ নয়। আমি সব সময়ই আশার বিপরীতেও আশা রাখি যে, প্রিয়জনদের কাউকে না কাউকে আমরা জীবিত পাব’।
স্বজনদের ধারণা, আসল তথ্য গোপন করতে চাইছে মালয়েশিয়া। গণমাধ্যম কর্মীদের কাছে তারা জানান তাদের আক্রোশের কথা। বললেন, মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী আর যোগাযোগমন্ত্রীর সামনাসামনি হতে চান তারা। কিছু প্রশ্নের সরাসরি জবাব জানা তাদের খুব প্রয়োজন। কারণ, গত ২৪ মার্চ মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী নাজিব রাজাক জানিয়েছিলেন, ফ্লাইট-৩৭০ দক্ষিণ ভারত মহাসাগরের বুকে বিধ্বস্ত হয়েছে, যাত্রীদের কেউ বেঁচে নেই।
বেইজিংয়ের মালয়েশিয়া দূতাবাসে প্রশ্নোত্তর পর্ব। বহু প্রশ্ন নিয়ে হাজির নিখোঁজ যাত্রীদের প্রায় একশ’ স্বজন। প্রশ্নের উত্তর দিচ্ছেন মালয়েশিয়া এয়ারলাইন্স আর কুয়ালালামপুরের সরকারি কর্মকর্তারা। ব্যাপক তদন্ত যজ্ঞ নিয়ে তারা তৈরি করেছেন নাতিদীর্ঘ পাওয়ার পয়েন্ট প্রেজেন্টেশন। ব্রিটিশ এয়ার অ্যাকসিডেন্টস ইনভেস্টিগেশন্স ব্রাঞ্চের তৈরি ঐ প্রতিবেদন একজন পড়া শুরু করেন। ভেঙে ভেঙে আসা মাত্র কয়েকটি সংকেত থেকে কিভাবে নিশ্চিত হওয়া গেলো যে, বিমানটি দক্ষিণ ভারত মহাসাগরে গিয়ে পড়েছে। এ সময় একজন শ্রোতার আচমকা হুংকারে সবকিছু পণ্ড হবার জোগাড়। চিত্কার করে তিনি উপস্থিত কর্মকর্তার সবাইকে ঘুষি মেরে নাক ফাটিয়ে দেয়ার হুমকি দেন। বেশ সামলেই সব প্রশ্নের উত্তর দেয়ার চেষ্টা করেন কর্মকর্তারা। চীনা স্বজনদের মূল প্রশ্ন ছিলো, কিভাবে তদন্ত কর্মকর্তারা নিশ্চিত হলেন যে, বিমানটি কত গতিতে উড়েছে বা নির্দিষ্ট পথ পাল্টেছে। মালয়েশিয়ান এয়ারলাইন্সের কর্মকর্তাদের জবাব, ‘এই প্রশ্নের জবাব দেয়ার মতো এক্সপার্ট তাদের মধ্যে নেই’।
ফ্লাইট-৩৭০ তে কি ঘটেছিলো, তা নিয়ে রয়েছে নানা মতবাদ। এও বলা হচ্ছে, নিজের বিমান নিজেই ছিনতাই করেছে পাইলট। সব মিলিয়ে বেশ কয়েকটি মৌলিক প্রশ্ন সামনে আসে। এগুলোর জবাব মিললে হয়তো বা তদন্তকাজ সমাপ্তিতে পৌঁছাবে। যেমন- কুয়ালালামপুর থেকে বেইজিং যাবার পথে বিমানটি কেন সোজা বামে টার্ন নেবে? একজন পাইলট নিজেকে যাত্রীদের জীবন ঝুঁকির মধ্যে ফেলবে, এটা কতটুকু যৌক্তিক? সুরক্ষিত ককপিট থাকা সত্বেও বিমান ছিনতাই কি এতই সহজ? দুর্ঘটনার সব সম্ভাব্যতা যাচাই করা হয়েছে কি-না? বিমানের ট্রান্সপোন্ডার সিগনাল বন্ধ হবার সাথে সাথে কেন কোন ব্যবস্থা নেয়া হয়নি? সামরিক কাজে ব্যবহূত স্যাটেলাইট কেন নিখোঁজ বিমান খুঁজে পাবে না? জ্বালানি ফুরিয়ে গেলে কি কোন বিমান সোজা পানিতে ডুব দেয়? বিমানের দুর্ঘটনাকবলিত হবার ব্যাপারে এর যাত্রীরা টের পেয়েছিলো কি-না? নাইন ইলেভেনে ছিনতাই হওয়া বিমানের যাত্রীরা মোবাইলে স্বজনদের সাথে যোগাযোগ করতে পারলেও কেন এই বিমানের যাত্রীরা মোবাইল ফোন ব্যবহার করতে পারেননি?