অবসর ভাতা পেতে শিক্ষকদের ভোগান্তি
প্রকাশ : ৩০ মার্চ ২০১৪, ২২:৫৮
প্রায় তিন দশকের বেশি সময় ধরে টানা শিক্ষকতা করার পর বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষকরা অবসরে গিয়ে ‘অবসর সুবিধার’ অর্থ পেতে ভোগান্তি ও হয়রানির শিকার হচ্ছেন। জেলা-উপজেলা থেকে শুরু করে প্রত্যন্ত গ্রাম থেকে আসা এসব শিক্ষকের চোখের জলে প্রতিদিন ভারি হয়ে ওঠে রাজধানীর নীলক্ষেতের বাংলাদেশ শিক্ষা পরিসংখ্যান ব্যুরো (ব্যানবেইজ) কার্যালয়ের অবসর সুবিধা বোর্ডের কার্যালয়।
চাকরি করে প্রতি মাসে বেতন পেয়েছেন। দীর্ঘ বছর ধরেই এই ধারাবাহিতকায় চলছিল জীবন। কিন্তু চাকরি শেষে এখন অবসরে। নেই সরকারি বেতন, নেই স্কুল থেকে কোন সম্মানী। ফলে সংসার আর চলে না। ভরসার স্থল বেতন থেকে ৬ শতাংশ হারে কেটে রাখা টাকার সুবিধা। কিন্তু নানা ভোগান্তির পরও এ টাকা পেতে হলে অপেক্ষা করতে হয় তিন বছরের বেশি সময়। শিক্ষকরা বলছেন, অবসর গ্রহণ করেছি, এখন অবসর সুবিধা চাই। ভোগান্তি চাই না।
ময়মনসিংহের বেগুনবাড়ি উচ্চ বিদ্যালয়ের করণিক প্রহলাদ চন্দ্র বর্মন। চাকরি শেষে গতকাল রবিবার বিদ্যালয়ের প্রাক্তন এক শিক্ষককে নিয়ে অবসর সুবিধার প্রয়োজনীয় কাগজপত্র জমা দিতে এসেছেন। কিন্তু এমপিও সিটে নামটি অস্পষ্ট থাকায় অবসর সুবিধা বোর্ডের সংশ্লিষ্টরা তার কাগজপত্র জমা নিতে চাইছেন না। বোর্ডের সংশ্লিষ্টদের বক্তব্য, আবার ময়মনসিংহে গিয়ে ফটোকপি করে নিয়ে আসতে হবে। অনেক অনুরোধ করলেন, হাতে-পায়েও ধরলেন, কোন কাজ হলো না। দরিদ্র এই কর্মচারী কান্নায় ভেঙে পড়ে বললেন, আবার বাড়িতে গিয়ে ফটোকপি আনার জন্য যে টাকা খরচ হবে তাও তার কাছে নেই। চোখে জল নিয়ে তাকে ফিরে যেতে হলো। তিনি এই প্রতিবেদককে জানান, অবসর সুবিধার টাকা দিয়ে মেয়ের বিয়ে দেব। তাই এই টাকার অপেক্ষায় আছি। এ বিষয়ে আবেদন জমা দিতে আসা অন্য শিক্ষকরা বললেন, নাম যাচাই করার জন্য অনেক কাগজপত্র থাকে। সেখান থেকেও যাচাই করা যায়। কিন্তু বোর্ডের সংশ্লিষ্টরা এই কষ্ট করতে চান না। তবে দুই-তিনশ’ টাকা ঘুষ দিলেই সব ঠিক হয়ে যেত। এ বিষয়ে ওই প্রতিষ্ঠানের প্রধান শিক্ষক খালিদ হিল্লোলের সাথে মোবাইলে কথা হলে তিনি জানান, ‘কাগজপত্র সবই ঠিক আছে। গ্রামের ফটোকপি বেশিরভাগই এমন। কি আর করা আবার কাগজপত্র গিয়ে জমা দিতে হবে।’
এখানে ভোগান্তির শেষ নয়। কাগজপত্র জমা দেয়ার পরও নানা ভোগান্তির শিকার হতে হয়। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক শিক্ষক জানালেন, প্রথমবার আবেদন জমা দেয়া হলেও দীর্ঘদিনে কোন খোঁজ-খবর নেই। এ কারণে অবসর সুবিধা বোর্ডের অফিসে এসে জানা গেল, তার আবেদনটি পড়ে আছে। কারণ হিসাবে বলা হয়েছে, তিনি নাকি সব কাগজ জমা দেননি বা হারিয়ে গেছে। অথচ এই শিক্ষক জানান, আমি সব কাগজ জমা দিয়েছিলাম। কি আর করা, আবার নতুন করে কাগজপত্র নিয়ে আসতে হবে। নতুবা বোর্ডের সংশ্লিষ্ট কর্মচারীদের হাতে কিছু টাকা ধরিয়ে দিলেই সব ঠিক। শিক্ষকদের অভিযোগ, ঘুষ না দিলে কাজ এগোয় না। ঘুষ আদায় করতে দুর্নীতিপরায়ণ কোনো কোনো কর্মচারী শিক্ষকদের আবেদনের নথি থেকে কিছু কাগজপত্র সরিয়ে ফেলেন—এমন অভিযোগ শিক্ষকদের। পুনরায় সেসব কাগজ আনার তাগিদ দেন। টাকা দিলে আর আনতে হয় না। আবার সবকিছু ঠিকঠাক থাকলেও টাকা পেতে অপেক্ষা করতে হয় ৩ থেকে সাড়ে ৩ বছর।
গতকাল সরেজমিন অবসর সুবিধা বোর্ডের কার্যালয়ে গিয়ে দেখা যায়, ষাটোর্ধ্বদের ভিড়। তাদের চোখেমুখে হয়রানি ও কষ্টের ছাপ। একজন শিক্ষক বললেন, দুই বছর পূর্বে কাগজ জমা দিয়েছি। কোন খবর নেই। আজ এসেছি। কর্তৃপক্ষ বলেছে, আরো অপেক্ষা করতে হবে। এই শিক্ষক বলেন, আর কত অপেক্ষা করবো। টাকার অভাবে দিন আর চলছে না। বোর্ডের কিছু কর্মচারি শিক্ষকদের সাথে অসদাচরণ করছে এমন দৃশ্যও দেখা গেলো।
২০১২ সালের মার্চ মাসে অনলাইনে আবেদন করা যাবে এমন ঘোষণা দিয়েছিলেন প্রধানমন্ত্রী। কিন্তু প্রধানমন্ত্রীর ওই ঘোষণা কার্যত বাস্তবায়নই হয়নি। ওই অনুষ্ঠানে বলা হয়েছিল, এখন থেকে অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক-কর্মচারীরা অনলাইনে দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চল থেকে, এমনকি ইউনিয়ন তথ্য ও সেবাকেন্দ্র থেকে আবেদন করতে পারবেন। তারপর অল্প সময়ের মধ্যে নিজ বাড়িতে বসেই তাদের প্রাপ্য টাকা পেয়ে যাবেন। এই ঘোষণা শুধু নামেই। শিক্ষকদের সরাসরি এসেই আবেদন জমা দিতে হচ্ছে। শিক্ষকরা বলছেন, ডাকযোগে আবেদন পাঠালে কোন কাজই হয় না।
২০০২ সালে বেসরকারি শিক্ষকদের অবসর সুবিধা দেয়ার জন্য বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান শিক্ষক ও কর্মচারী অবসর সুবিধা বোর্ড প্রতিষ্ঠিত হয়। ২০০৫ সাল থেকে অবসরগ্রহণকারী শিক্ষক-কর্মচারীদের অবসর সুবিধা প্রদানের জন্য শিক্ষক- কর্মচারীদের বেতন থেকে মাসিক ৪ শতাংশ হারে অর্থ কেটে রাখা হয়। অবসর শেষে একজন শিক্ষককে এক বছরের জন্য মূল বেতনের তিন গুণ করে অবসর সুবিধা দেয়া হয়। সেই হিসাবে পূর্ণ মেয়াদ চাকরি শেষে একজন প্রধান সহকারী অধ্যাপক ১৬ লাখ টাকা, প্রধান শিক্ষক ১২ লাখ এবং সহকারী শিক্ষক কম বেশি ৬ লাখ টাকা অবসর সুবিধা পান। কিন্তু এই টাকার সংস্থান করতে পারছে না বোর্ড। ফলে ভোগান্তি পোহাতে হচ্ছে শিক্ষকদের। উল্লেখ্য, কল্যাণ তহবিলের জন্য আরো দুই শতাংশ করে কাটা হয়।
বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের আওতায় বর্তমানে দেশে সাড়ে ৫ লাখ শিক্ষক-কর্মচারী রয়েছেন। অবসর সুবিধা দেয়ার জন্য তাদের কাছ থেকে প্রতি মাসে যে ৪ শতাংশ অর্থ কাটা হয়, তাতে আদায় হয় ১৭ কোটি টাকা। কিন্তু শিক্ষক ও কর্মচারীদের অবসর সুবিধার টাকা দিতে প্রতি মাসে প্রয়োজন হয় ৫৬ কোটি টাকা। সে হিসাবে প্রতি মাসে ঘাটতি হচ্ছে প্রায় ৪০ কোটি টাকা।
প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, এ প্রতিষ্ঠানে প্রতি মাসে আবেদন জমা হচ্ছে প্রায় এক হাজার। পূর্বের আবেদন জমা আছে ৩০ হাজারের বেশি। ১৭ কোটি টাকা দিয়ে প্রতিমাসে সর্বোচ্চ ৫শ’ শিক্ষকের ভাতা দেয়া সম্ভব। এভাবে প্রতিমাসে পড়ে থাকছে ৪শ’ আবেদন। প্রতিষ্ঠানটির কর্মকর্তারা বলছেন, ২০১১ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে আবেদন করা শিক্ষকদের টাকা এখনও দেয়া হয়নি। আবেদনের পর কমপক্ষে তিন বছর অপেক্ষা করতে হবে।
কল্যাণ সুবিধা: এই বোর্ডের চিত্র প্রায় একই। বোর্ডের সদস্য সচিব শাহজাহান আলম সাজু বলেন, শিক্ষকদের কল্যাণ সুবিধার টাকা পেতে শিক্ষকদের আবেদনের পর দুই বছর অপেক্ষা করতে হয়। এর কারণ হিসাবে তিনি বলেন, শিক্ষকদের কাছ থেকে ২ শতাংশ হারে কেটে নেয়ার ফলে আদায় হচ্ছে ৮ কোটি টাকা। কিন্তু চাহিদা রয়েছে ১৮ কোটি টাকা। এখনও ২০ হাজার আবেদন জমা পড়ে আছে। শিক্ষকদের ঠিকমতো টাকা দিতে হলে ৪শ’ কোটি টাকা সরকারকে বাড়তি দিতে হবে।
সংশ্লিষ্টদের বক্তব্য, শিক্ষকদের এই বোর্ডের চেয়ারম্যান শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সচিব। এছাড়া মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক এই বোর্ডের ভাইস চেয়ারম্যান। কিন্তু শিক্ষকদের এই ভোগান্তি দূর করা বা অর্থের সংস্থান করে যথাসময়ে অবসর প্রাপ্ত শিক্ষকদের এককালীন আর্থিক সুবিধা দেয়ার বিষয় এরা কিছুই ভাবছে না। শিক্ষামন্ত্রীকে প্রধান অতিথি করে মাঝে মধ্যে হজ্বযাত্রী ও মুক্তিযোদ্ধা শিক্ষকদের অবসর সুবিধা ও কল্যাণ ট্রাস্টের সুবিধা দেয়া হয়। এর বাইরে লাখ লাখ শিক্ষকের ভোগান্তির চিত্র যেন সবার অজানাই থাকে।