[ অ র্থ নী তি ]
জাতীয় পুঁজি গঠনে আসন্ন বাজেট
প্রকাশ : ৩১ মার্চ ২০১৪, ২১:৪৪
সবকিছু ঠিক থাকলে ৫ জুন জাতীয় সংসদে বাজেট উপস্থাপিত হবে। তবে কেমন হতে যাচ্ছে আসন্ন বাজেট বা কী ধরনের বাজেট দেখতে চাই—এসব প্রসঙ্গ নিয়ে কথা বলার আগে অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিতকে অভিবাদন জানানো দরকার। কারণ, এটি তার হাত ধরে আসা অষ্টম বাজেট। ১৯৮০’র দশকে দুটি বাজেট উত্থাপন করেন তিনি। এর সঙ্গে বিগত শাসনামলে (২০১৩-১৪ অর্থবছর ধরে) পাঁচটি ও আগামীটিসহ (২০১৪-২০১৫) মোট আটটি। তবে, অধিবেশন শুরুর দুই মাস আগে বাজেটে নিজেদের প্রত্যাশা-হতাশার প্রতিফলন ঘটানোর আবেদন করা যে আসলে কেমন, তা নীতি নির্ধারণের সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিদের অজানা নয়। কেননা, বাজেটে খাতওয়ারী অগ্রাধিকার এবং সে ভিত্তিতে বরাদ্দের পরিমাণও মোটামুটি ঠিক হয়ে যায় প্রতি বছর মার্চেই। আরেকটি বিষয় হলো, কোনো যুগে, কোনো দেশে শুধু এক অর্থবছরের বাজেটের সাহায্যে ‘অর্থনৈতিক বিপ্লব’ সংঘটিত হয়নি। বাজেটে সৃজনশীলতা ও স্বাতন্ত্র্য দেখানোর সুযোগ ইদানীং আরো কম। এখনকার বাজেটের ৮০ শতাংশই হলো নিয়মিত অনুশীলন; যেগুলো বলা যায় অন্ধভাবেই অনুসরণ করতে হয় সব উন্নয়নশীল বা স্বল্পোন্নত দেশকে। আর বাজেটে উন্নয়ন অংশীদারদের ভূমিকা কেমন থাকবে চলতি অর্থবছরে- বাংলাদেশের মতো দেশগুলোর বাজেট বক্তৃতা পড়ুন, অনেক সাদৃশ্য খুঁজে পাবেন।
বিশ্বায়নের এই যুগে নিজেদের বাজেটের ওপর আলোকপাত করার আগে বহির্বিশ্বের পরিস্থিতি একটু দেখে নেয়া ভালো যাতে পারিপার্শ্বিক পরিস্থিতি মাথায় থাকে। দেখা যাচ্ছে, আন্তর্জাতিক বাজারে পণ্য সামগ্রীর দাম নিম্নমুখী। যদিও অর্থনৈতিক সংকট থেকে পুরোপুরি বেরিয়ে আসতে আরো কিছুদিন লাগবে যুক্তরাষ্ট্রেরও, তবুও তাঁদের শাপ মোচনের চিহ্ন স্পষ্ট। এদিকে ইউরোপ কমবেশি এখনো সমস্যায় নিমজ্জিত। আমাদের বাণিজ্য পরিস্থিতি অবশ্য তুলনামূলক ইতিবাচক বার্তা দেয়। এখানে অর্থবছরের ফেব্রুয়ারী পর্যন্ত রফতানি বেড়েছে ১৪ শতাংশ পর্যন্ত। রেমিট্যান্সের ঊর্ধ্বগতির ধারায় কিছুটা মন্দা আসলেও রেমিট্যান্স স্থিতিশীল। তবে আন্তর্জাতিক বাজারে পণ্যমূল্য হ্রাস সত্ত্বেও স্থানীয় বাজারে মূল্যস্ফীতি কিছুটা ঊর্ধ্বমুখী রয়েছে। এর অর্থ হচ্ছে, অভ্যন্তরীণ বাজার তেমন সুশৃঙ্খলভাবে কার্যকর নয়। রাজস্ব আহরণে গত অর্থবছরেও গতিশীলতা ছিল। এবার সেটি হোঁচট খেয়েছে। রিজার্ভ পরিস্থিতি বেশ ভাল। তবে আমদানি লক্ষণীয়ভাবে হ্রাস পেয়েছে। তার সঙ্গে কমেছে কিছু পণ্যের দামও। তবে এতে আনন্দিত হওয়ার কিছু নেই- বিশেষত মূলধনি যন্ত্রপাতি ও শিল্প-কারখানায় ব্যবহূত জরুরি কাঁচামাল আমদানি হ্রাসের ঘটনায়। সহজে আমদানি-রফতানির চিত্র পেতে আমি এলসি (ঋণপত্র) খোলার ওপর নজর রাখি। এবারে এলসি খোলার যে হাল দেখছি, তাতে খুব একটা ভরসা পাচ্ছি না। বেসরকারি খাতে ঋণের প্রবৃদ্ধিও দীর্ঘদিন ধরে সর্বনিম্ন পর্যায়ে রয়েছে। উদ্বৃত্ত শ্রমের একটি দেশে বিনিয়োগ প্রবৃদ্ধি যেমনটা হওয়ার কথা ছিল, তেমনটা এখানে নেই। এখানে বিনিয়োগ প্রবৃদ্ধি যেন থেমে গেছে জিডিপির ২৫ শতাংশের চক্করে; যার মধ্যে রয়েছে ১৯ শতাংশ বেসরকারি ও ৬ শতাংশ সরকারি খাতের অবদান। বাংলাদেশে দেশি-বিদেশি বিনিয়োগ সম্ভাবনা বিকাশের অন্যতম অন্তরায় রাজনৈতিক সংঘাত-সহিংসতা। তাই রিজার্ভ বৃদ্ধি পেলেও বিনিয়োগে মন্দা, কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে ধীরগতি, আমদানি হ্রাস (মূল্যস্ফীতি কমাতে এর সাফল্যের কথা মাথায় রেখেই বলছি) ইত্যাদি সমস্যার প্রেক্ষিতে আসন্ন বাজেট নিয়ে উচ্চাভিলাষী হওয়ার সুযোগ কম। এক্ষেত্রে কিছু বিষয় ইতিবাচক; সন্দেহ নেই। কিন্তু উন্নতির ধারা গতিময় রাখতে হলে দুর্বল দিকগুলোর দিকেও নজর দেয়া উচিত।
মূল্যস্ফীতি বাড়লে নিম্ন ও সীমিত আয়ের মানুষের উপর চাপ পড়ে। ফলে নিকট অতীতে যখন মূল্যস্ফীতি বাড়া শুরু করলো, সঠিকভাবেই সকলের প্রত্যাশা ছিল বাংলাদেশ ব্যাংক বিষয়টিকে গুরুত্বের সঙ্গে আমলে নিয়ে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের জন্য সব অস্ত্র প্রয়োগ করুক। এ আবেদনে যথাযথভাবেই সাড়া দিয়েছে তারা। সমস্যা হলো, প্রয়োগবিধিতে অতিসতর্কতার জন্যই হয়তো কিছু অস্ত্র ফিরে এসেছে বুমেরাং হয়ে। এতে বেড়ে গেছে সুদের হার, ভুল বার্তা পেয়েছে পুঁজিবাজার। নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে ঐসব সত্ ব্যবসায়ীর ওপর, যারা এমনিতেই বৈশ্বিক প্রতিযোগিতার সঙ্গে তাল মেলাতে গিয়ে হিমশিম খাচ্ছেন। স্নাতক পর্যায়ের প্রথম বছরেই সামষ্টিক অর্থনীতি পড়তে গিয়ে জেনেছি, পুঁজিবাজারে তারল্যের যোগানদাতা হিসেবে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের বড় ভূমিকা রয়েছে। ওই বইগুলোর লেখকরা পশ্চিমা বলেই হয়তো বাংলাদেশের অভিজ্ঞতা তাঁদের জানা ছিল না। থাকলে আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে এটি বলতে পারতেন না, দু’বার ভাবতে হতো। এরই মধ্যে অবশ্য ব্যাংকিং খাতে তারল্য পরিস্থিতির প্রভূত উন্নতি হয়েছে। তবে এই খাতটি যে হলমার্ক ও বিসমিল্লাহ কেলেঙ্কারি দ্বারা আর্থিক ও অনার্থিক উভয়ভাবেই কিছুটা হলেও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে তা বলার অপেক্ষা রাখে না। এদের অপকর্মের খেসারত এখন দিতে হচ্ছে অন্যান্য ব্যবসায়ীকে। তারা ব্যাংকে গেলেই ব্যাংকাররা কেমন যেন সন্দেহের দৃষ্টিতে তাকান; ঋণ দিলেও কিছু ক্ষেত্রে আগের উষ্ণ সম্পর্ক নেই। তাদের আরো বিপদ হলো, এরই মধ্যে ব্যবসায় পরিচালন ব্যয় বেড়েছে। পুঁজিবাজারের সাধারণ বিনিয়োগকারীরাও রয়েছেন এক ধরনের বিভ্রান্তির মধ্যে। ফলে এ বাজারে পুঁজির প্রবাহ কমে গিয়েছে।
আরেকটি উদ্বেগের বিষয় হল জিডিপির প্রবৃদ্ধি। আমাদের প্রাক্কলিত জিডিপি’র প্রবৃদ্ধি হ্রাস পেয়েছে ১.২০ শতাংশের মত। বাংলাদেশ ব্যাংকসহ অনেকেই বলছেন—চলতি অর্থবছরের প্রবৃদ্ধি হতে পারে ৬ শতাংশের কাছাকাছি। কারো কারো ধারণা, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ নিয়ে এক ধরনের সন্তুষ্টি রয়েছে সরকারের মাঝে। তবে রাষ্ট্রের আর্থিক ব্যবস্থাপনার অন্যান্য দিক চিন্তা করলে এ অর্জন নিয়ে উল্লসিত হওয়ার কিছু নেই। আমি বলব, বিদ্যুত্ উত্পাদন পরিস্থিতি মোটামুটি সামলাতে পেরেছে বর্তমান সরকার; অবশ্য সাময়িকভাবে। খতিয়ে দেখা দরকার, ক্ষুদ্র ও মাঝারি পর্যায়ে অতিরিক্ত বিদ্যুত্ উত্পাদন জাতীয় ব্যালেন্স শিটে কী পরিমাণ বাড়তি চাপ সৃষ্টি করছে। সাম্প্রতিক বছরগুলোয় অভূতপূর্ব সাফল্য অর্জন করেছে আমাদের কৃষি খাত। তবে এখানে দেখতে হবে কৃষিখাতের প্রবৃদ্ধি কিভাবে ঘটছে, শস্যের বৈচিত্র্য হচ্ছে কতখানি। এক্ষেত্রে গুণগত ও ভারসাম্যপূর্ণ অর্জন আসলে কতটুকু? কৃষিপণ্যের মূল্য পরিস্থিতি কেমন এখানে? ভোক্তারা কততে কিনছেন? কৃষক কেমন দাম পাচ্ছেন? রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানের কী হাল? এর অধিকাংশই ঋণভারে জর্জরিত অথবা দেউলিয়া হওয়ার পথে।
দেশের আর্থ-সামাজিক উন্নয়নের জন্য পদ্মা সেতু নির্মাণ জরুরি। সেজন্য আসন্ন অর্থবছরের বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচিতে (এডিপি) এর জন্য অতিরিক্ত বরাদ্দ থাকবে স্বভাবতই। প্রশ্ন হলো, এ বাড়তি বরাদ্দ দেয়া হবে কোত্থেকে? এটি কী অন্য কর্মসূচি ছেঁটে দেয়া হবে, নাকি দেয়া হবে নতুন বরাদ্দ থেকে? আরো কিছু জিজ্ঞাসা আছে। পদ্মা সেতুর জন্য বিদ্যুত্ খাত থেকে বরাদ্দ কমাবেন? সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় কী তা সহ্য করবে? যদি কৃষি খাত থেকে চাওয়া হয়? কৃষিমন্ত্রী এ ছাড় দিতে রাজি হবেন বলে মনে হয় না। শিক্ষামন্ত্রী ভদ্রলোক; তাই মুখ ফুটে হয়তো কিছু বলবেন না উনি। কিন্তু তারও তো বাড়তি বরাদ্দ প্রয়োজন। শিক্ষার্থীদের বিজ্ঞান শিক্ষায় উত্সাহিতকরণ, মাদ্রাসা ব্যবস্থাকে মূলধারায় ফেরানো প্রভৃতি কর্ম সম্পন্নের জন্যও তো বরাদ্দ বৃদ্ধি দরকার তার। আছে জেলা বাজেট ইস্যুও। এত বছরে একটি মাত্র জেলায় হয়েছে জেলা বাজেট। অথচ স্থানীয় পর্যায়ে আর্থিক ব্যবস্থাপনা মজবুত ও অন্তর্ভুক্তিমূলক উন্নয়নের জন্য এটি প্রয়োজন বৈকি।
বাংলাদেশের অর্থনীতিতে বেসরকারি খাত চালকের ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়েছে। অন্যদিকে সরকারি উদ্যোগে বাড়ছে ক্ষয়-ক্ষতির পরিমাণ, বাড়ছে রাজনীতিতে মধ্যস্বত্বভোগীর সংখ্যা। এসব দেখে বুঝতে অসুবিধা হয় না, বাংলাদেশে রাষ্ট্রীয় পুঁজি গঠনের ওপর থেকে দৃষ্টি অনেকখানি সরে গেছে বাংলাদেশের। ফলে সিদ্ধান্ত গ্রহণে আর কোনো দ্বন্দ্ব নয়। আমাদের এমন পদক্ষেপ নেয়া উচিত, যাতে সরকারি বিনিয়োগে অনুপ্রেরণা পেয়ে আরো বিকশিত হয় বেসরকারি খাত; সৃষ্টি করে কর্মসংস্থান। সরকারি খাত আরো শক্তিশালীকরণের দুর্ভাবনা মাথা থেকে ঝেড়ে ফেলতে হবে নীতিনির্ধারকদের। বরং এখন ভাবা উচিত, বেসরকারি খাতকে কীভাবে টেকসই ও লাভজনক করে তোলা যায়; কীভাবে বেসরকারি খাতের উন্নয়নে অধিকসংখ্যক মানুষকে যোগ করা যায়। এমন পরিস্থিতিতে সরকারি খাতকে অধিক দৃষ্টি দিতে হবে দক্ষতা বৃদ্ধির দিকে; নিজের আকার বৃদ্ধির প্রতি নয়।
লেখক :ব্যাংকার ও অর্থনীতি বিশ্লেষক