কৃষক দিশাহারা বিদ্যুত্ সঙ্কটে
প্রকাশ : ৩১ মার্চ ২০১৪, ২৩:০২
টাঙ্গাইল জেলার পাঁচটি উপজেলা ও রাজশাহীর তানোর এবং দিনাজপুর জেলার ঘোড়াঘাট উপজেলায় বিদ্যুত্ সঙ্কটে দিশেহারা হয়ে পড়েছে কৃষক। সাধারণ জনজীবন অতিষ্ঠ হয়ে উঠেছে। এইচএসসি পরীক্ষার্থী ও সাধারণভাবে সকল শিক্ষার্থী চরম বিপাকে পড়েছে। বিদ্যুত্ অফিস ঘেরাও ও ভাংচুর হচ্ছে।
রাজশাহী অফিস জানায়, তানোরে ঘন ঘন লোডশেডিংয়ের কারণে জনজীবন অতিষ্ঠ হয়ে উঠেছে। গত দুই সপ্তাহ ধরে কোন প্রাকৃতিক সমস্যার সৃষ্টি না হলেও বিদ্যুত্ উন্নয়ন বোর্ডের (পিডিবি) আওতাধীন এলাকায় ২৪ ঘন্টায় গড়ে ৩ ঘন্টার বেশি বিদ্যুত্ মিলছে না। যেটুকু পাওয়া যাচ্ছে, লো-ভোল্টেজের কারণে কৃষকের সেচযন্ত্র পুড়ে যাচ্ছে। কৃষক জমিতে সেচ দিতে না পেরে দিশেহারা হয়ে পড়েছে।
ব্যবসা প্রতিষ্ঠান ও বাসা-বাড়ির বাসিন্দা ও এইচএসসি পরীক্ষার্থী এবং শিক্ষার্থীরা পড়েছেন মহাবিপদে। বিদ্যুত্ ভোগান্তির কারণে স্বাভাবিক নিয়মে কোন কাজ করতে পারছেন না গ্রাহকরা। চরম দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে পিডিবি এলাকাধীন গ্রাকদের। বিদ্যুত্চালিত সেচপাম্প ও মেশিন-যন্ত্রপাতিতে কাজ করা সম্ভব হচ্ছে না। শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান আবাসিক ও বাণিজ্যিক এলাকায় স্বাভাবিক কাজকর্ম ব্যাহত হচ্ছে। ফটোস্ট্যাট, কম্পিউটার সেন্টারগুলো বিদ্যুত্ না থাকার কারণে লোকজন তাদের প্রয়োজনীয় কাজ করতে পারছে না। রাইসমিল, সমিল, ডাউল মিল, কোল্ড স্টোরেজ, ক্ষুদ্রশিল্প কারখানায় উত্পাদন ব্যাহত হচ্ছে। সকাল ৮টা থেকে রাত ১২টা পর্যন্ত ১০ থেকে ১২ বার বিদ্যুত্ সরবরাহ আসা-যাওয়া করায় বিদ্যুত্ চালিত সেচপাম্প বন্ধ থাকছে। সেচের অভাবে কৃষকের বোরো ক্ষেত ফেটে চৌচির হয়েছে। বিদ্যুত্ চলে গেলেই দেড় থেকে ২ ঘন্টা বিদ্যুিবহীন অবস্থায় দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে। তানোর পৌরসভার গভীর নলকূপ অপারেটর মাসুম পারভেজ জানান, কৃষকের রোপিত বোরো ক্ষেত উঠা পর্যন্ত পিডিবি এলাকাধীন ২৪ ঘন্টার বিদ্যুত্ ২ ঘন্টা লোডশেডিং থাকার নিয়ম থাকলেও দিনে প্রায় ১৬ ঘন্টা ধরে বিদ্যুত্ বন্ধ থাকছে। এরমধ্যেও ভয়াবহ লো-ভোল্টেজ থাকায় গভীর-অগভীর নলকূপে সেচ দিতে পারছে না। তানোর আব্দুল করিম সরকার বিশ্ববিদ্যালয় কলেজের অধ্যক্ষ হাবিবুর রহমান বলেন, বিদ্যুতের অভাবে প্রতিবছর পরীক্ষার্থীদের বিড়ম্বনায় পড়তে হয়। এ কারণে অনেকের ফলাফল খারাপ হয়।
আমাশো গ্রামের সেচপাম্প মালিক আব্দুল মান্নান জানান, পিডিবি এরিয়ার মধ্যে তার প্রায় চারটি সেচপাম্প রয়েছে। গত প্রায় তিন সপ্তাহ ধরে পিডিবি’র লো-ভোল্টেজ সরবরাহে বিদ্যুত্ চালিত তার দুটি সেচপাম্পসহ পিডিবি এলাকাধীন প্রায় ১৫০টি গভীর-অগভীর নলকূপ অচল হয়ে পড়েছে। গতকাল রবিবার তারা কৃষকদের নিয়ে তানোর পিডিবি অফিসে নিজেদের সমস্যার কথা জানিয়েছেন।
গোপালপুর (টাঙ্গাইল) সংবাদদাতা জানান, বিদ্যুত্ বিপর্যয়ে নিদারুণ ভোগান্তি পোহাচ্ছেন টাঙ্গাইলের পাঁচ উপজেলার লক্ষাধিক বিদ্যুত্ গ্রাহক। সেচের অভাবে মাঠের বোরো ফসল পুড়ছে। খরায় বিনষ্ট হচ্ছে থোড় ধান। উত্তর টাঙ্গাইলের গোপালপুর, মধুপুর, ধনবাড়ী, ভূঞাপুর ও ঘাটাইল উপজেলার লক্ষাধিক গ্রাহকে বিদ্যুত্ সরবরাহ করে ময়মনসিংহ পল্লীবিদ্যুত্ সমিতি-১। পিডিবির জামালপুর ন্যাশনাল গ্রিড থেকে পিডিবি বিদ্যুত্ সরবরাহ করে। পাঁচ উপজেলায় পৌনে দুই লক্ষ একরে বোরো চাষ হয়েছে। সাড়ে ৬ হাজার গভীর ও অগভীর সেচপাম্পে চলে সেচ কাজ। পল্লী বিদ্যুতের চাহিদা পিকআওয়ারে ৩২ মেগাওয়াট, ননপিক আওয়ারে ২৮ মেগাওয়াট। সরবরাহ হয় পিক আওয়ারে ১২ মেগাওয়াট, নন-পিক আওয়ারে ১০ মেগাওয়াট। ঘাটতি ১৮ থেকে ২০ মেগাওয়াট। পল্লী বিদ্যুত্ মধুপুর জোনাল অফিস জানায়, জামালপুর-হাজরাবাড়ী ৩৩ কেভি ফিডারে চাহিদা মোতাবেক বিদ্যুত্ না পাওয়ায় এ সমস্যা। পিডিবির জামালপুর গ্রিডের সাথে সংযুক্ত ৩৩ কেভি লাইনের একটি অংশ জীর্ণ থাকায় প্রায়ই বিদ্যুত্ সরবরাহ বন্ধ থাকে। এভাবে লোডশেডিংয়ের পাশাপাশি যান্ত্রিক ত্রুটির দরুন প্রায়ই বিদ্যুত্ সরবরাহ বন্ধ থাকে। এ ব্যাপারে পিডিবির জামালপুর গ্রিডের দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তার সঙ্গে মোবাইলে যোগাযোগ করলে তিনি মন্তব্য করতে অস্বীকার করেন।
ভূঞাপুর (টাঙ্গাইল) সংবাদদাতা জানান, ঘন ঘন লোডশেডিংয়ে অতিষ্ঠ হয়ে ভূঞাপুর বিদ্যুত্ অফিস ঘেরাও করে ভাঙচুর করেছে জনতা। গতকাল সোমবার দুপুরে উপজেলার বাগবাড়ী ও বামনহাটার লোকজন বিদ্যুত্ অফিসে হামলা চালায়। ভূঞাপুরে রাত-দিন মিলে ৩ ঘন্টাও বিদ্যুত্ মিলে না। যে সময়টুকু বিদ্যুত্ থাকে তাতে আবার লোডশেডিং। বিদ্যুত্ আসলে ২-৩ মিনিটের বেশি স্থায়ী হয় না। পৌর এলাকায় বিদ্যুত্ থাকলেও গ্রামাঞ্চলে এর ছিঁটেফোঁটাও লক্ষ্য করা যাচ্ছে না। অতিমাত্রায় লোডশেডিংয়ে অতিষ্ঠ কৃষক, পোল্ট্রি খামারি, পরীক্ষার্থীসহ দুই গ্রামের শতাধিক লোক ভূঞাপুর বিদ্যুত্ অফিস ঘেরাও করে। এসময় তারা অফিসে কোন কর্মকর্তাকে না পেয়ে অফিসের সাইনবোর্ড, প্রকৌশলী রুমে চেয়ার ও দেয়াল ঘড়ি ভাংচুর করে। অফিসের ভিতর ও বাইরে বিক্ষোভ প্রদর্শন করে। পুলিশ পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনেন। ভূঞাপুর থানার ওসি মো. হারেচ আলী মিয়া জানান, বিদ্যুত্ না পেয়ে বাগবাড়ী ও বামনহাটা গ্রামের লোকজন বিদ্যুত্ অফিস ঘেরাও ও ভাঙচুর করে।
ঘোড়াঘাট (দিনাজপুর) সংবাদদাতা জানান, দিনাজপুরের ঘোড়াঘাট উপজেলায় চলতি মৌসুমে কৃষক রেকর্ড পরিমাণ জমিতে বোরো রোপণ করেছে। উপজেলার অধিকাংশ জমি উঁচু। এসব জমিতে ১দিন পর পর সেচ দিতে হয়। পল্লী বিদ্যুত্ ২৪ ঘন্টায় ১১-১২ ঘন্টা বিদ্যুত্ সরবরাহ করছে বলে দাবি করা হচ্ছে। পল্লী বিদ্যুত্ সমিতি-২-এর এলাকা পরিচালক গোলাম রব্বানীর সাথে কথা বলে জানা গেছে, পলাশবাড়ী পিডিপি বিদ্যুেকন্দ থেকে বিদ্যুত্ সরবরাহ করা হচ্ছে মাত্র ৬ মেগাওয়াট। এ উপজেলায় বিদ্যুতের চাহিদা ১১ মেগাওয়াট। সরেজমিনে বিদ্যুত্ সংযুক্ত ডিপ টিউবওয়েল মালিকদের সাথে কথা বলে জানা গেছে, ২৪ ঘন্টায় ৬-৭ ঘণ্টা বিদ্যুত্ সরবরাহ করা হচ্ছে। কম সরবরাহের কারণ সম্পর্কে এলাকা পরিচালক গোলাম রব্বানী জানান, পলাশবাড়ী পিডিপি ট্রান্সফরমার বহুদিনের পুরাতন হওয়ায় এখন আর চাহিদা অনুযায়ী বিদ্যুত্ সরবরাহ করতে পারছে না। প্রায় ৯-১০ দিন থেকে এ অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে। ওই ট্রান্সফরমার মেরামতযোগ্য নয়। যতদিন পর্যন্ত নতুন ট্রান্সফরমার স্থাপন করা না হবে ততদিন এ অবস্থায় বিদ্যুত্ সরবরাহ হবে। এমন অবস্থা বিরাজমান থাকলে কৃষকরা বোরো চাষে বিপর্যয়ের মধ্যে পড়বে। এছাড়াও চৈত্র মাসে দাবদাহ জনজীবন বিপর্যয়ের দিকে। এলাকাবাসী বিদ্যুত্মন্ত্রীর নিকট আকুল আবেদন করেছেন।