হাজীপুর, পাটনা। বিহারের পরিচিত শহর। ভাগ্যের খোঁজে, একটি পরিবার বিহারের দারিদ্র্যপীড়িত অঞ্চল ছেড়ে চলে এল পশ্চিম বাংলায়। পশ্চিম বাংলার বর্ধমান ছিল বিহারের নিকটবর্তী। সেখানে এসে আবাসভূমি গড়ে তুললেন তাঁরা। নিজ দক্ষতাগুণে মোগলদের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছিলেন। চুরুলিয়া গ্রামে পেলেন ‘কাজী’ উপাধি। তারপর থেকে তাঁরা কাজী। বাংলা প্রবাদে যে বলা হয় ‘সকল কাজের কাজী’। ‘কাজের কাজী’ তো বটেই, গ্রাম্য ঝগড়াবিবাদ দেখা দিল, মীমাংসা চাই। দায়িত্ব পড়ল এ পরিবারের ওপর। নিশ্চয়ই এতক্ষণে বুঝে গেছ কাঁদের কথা বলছি? হ্যাঁ, এসব আমাদের বাংলা সাহিত্যের একজন বড় কবি, বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলামের পরিবারের কথা। তাঁর বাড়ির পূর্বদিকে ছিল রাজা নরোত্তমের গড়। দক্ষিণে পীরপুকুর। পীরপুকুরের প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন, একজন সাধক হাজী পাহেলায়ান। তাঁর একটি মাজার ছিল। সঙ্গে ছোট্ট মসজিদ। নজরুলের বাবা-দাদা ছিলেন এর খাদেম। তাতেই চলত পরিবারের ভরণ-পোষণ। তাঁরা ছিলেন অসাম্প্রদায়িক মানুষ। অসাম্প্রদায়িক মানে অন্যধর্মের প্রতি হিংসা-বিদ্বেষ না রেখে নিজের জীবনধর্ম চর্চা করা। আর তা ছিল কবির সারাজীবনের সাধনা। এ সাধনাই তাঁকে মহত্ কবি হতে সাহায্য করেছে। তাই তো তিনি বলতে পেরেছিলেন খুব সরল উচ্চারণে—‘আমি এই দেশে, এই সমাজে জন্মেছি বলেই শুধু এই দেশেরই, এই সমাজের নই। আমি সকল দেশের সকল মানুষের। সুন্দরতার স্তবগানই আমার উপাসনা, আমার ধর্ম।’ খুবই সাদামাটা, সহজ-সরল জীবন তাঁর। গ্রামে-গঞ্জে যেখানেই মানুষের ভিড়, যেখানেই আনন্দ-বিনোদন সেখানেই লেগে থাকতেন তিনি। কীর্তন, যাত্রাপালা, কোরানপাঠ—এমন বিচিত্র জীবন খুব বেশি মানুষের মেলে না। তাঁর আদুরে নাম ‘নজর আলি’। ‘নজর আলি’ গ্রাম্য ডাকনাম। তিনি কিভাবে কবি কাজী নজরুল হলেন, সে অনেক কথা। কিন্তু, কিছু কথাতেও তাঁর কৃতিত্ব আমরা দেখতে পারি। অল্পবয়সে বাবার মৃত্যুর পর যে মক্তবে তিনি পড়তেন সেই মক্তবেই শিক্ষকতা শুরু করেছেন। তারপর অর্থের জন্য কখনো মোল্লাগিরি, মাজারের খাদেম, মসজিদে ইমামতি থেকে লেফট-রাইট করে সোজা সৈনিক। তারপর পত্রিকা সম্পাদক, রাজনীতিক, কবি, লেখক, গীতিকার, সুরকার একই অঙ্গে কতরূপ তাঁর? তাঁর প্রথম কবিতা ‘রাজার গড়’। বাড়ির পাশের রাজ নরোত্তমের গড়টি নিয়ে লেখা। কৈশোরেই চাচার কাছে ফারসি শিখে কবিতা লিখে ফেলেছিলেন—‘মরি কী যে বদনের শোভা/ মাতোয়ারা প্রাণ/ বুলবুল করতে এসেছে/ তাই মধু পান।’
শৈশবে খাদেমগিরি করলেও লেটোর গানে গোদা-সর্দার হতেও পিছপা হননি। তাঁর গোদাগিরি দেখে অন্যরা তো বলল, ‘এ ব্যাঙাচি একদিন সাপ হবে।’ হয়েছিলেনও তা-ই। দুরন্ত এ সাপ বিষের ফণা তুলে ব্রিটিশ সরকারকে ছোবল মারতে উদ্ধতও হয়েছিল। ফলে জেলও খাটতে হয়েছিল। তোমরা যারা তাঁর ‘ভোর হলো দোর খোল’ কিংবা ‘কাঠবিড়ালী’ কবিতা পড়ে বড় হচ্ছ, তারা একদিন সব বুঝবে। ভালো করে চিনতে পারবে তোমাদের প্রিয় কবিকে। কবি নজরুল খুব আমুদে লোক ছিলেন। রসেভরা ছিল তাঁর হূদয়। তার প্রমাণ মেলে একটি লেখায়, যেমন :‘আই এম ক্যালকাটা গোয়িং/ ...আহা মরি কী লাইটেনিং/ .../ ড্রিংকিং হয় কৌতূহলে/ খেয়েছে সব জাতিকূলে/ নজরুল ইসলাম ইজ টেলিং।’ ১৯১৪ সাল। ময়মনসিংহের ত্রিশালে ক্লাস সেভেনে ভর্তি হয়ে কিছুদিন পড়াশোনা করেছিলেন কবি। তারপর অন্যত্র। দশম শ্রেণি পর্যন্ত পড়েছিলেন। ১৯২০ সালে তিনি যোগ দিলেন ৪৯ পল্টনে। আমরা বলি না ‘মেজাজটা ফোর্টি নাইন’ সেই ‘ফোর্টি নাইনে’ যোগ দেওয়ার সময় নিয়ে কবি বন্দে আলী মিয়া লিখেছেন—‘এমন সময় আকাশে বাতাসে প্রথম মহাযুদ্ধের দামামা বেজে উঠলো...। ... চুরুলিয়ার দুখু কাঁধে নিল রাইফেল, কড়া পোশাক শক্তবুক। ... এমনি করে দু বছর কেটে গেল। প্রথম মহাযুদ্ধের সমাপ্তি হল। রেজিমেন্টও ভেঙ্গে গেল।’ কিন্তু ৪৯ রেজিমেন্ট ভাঙলেও কবির সৈনিক মন সবসময় জাগ্রত ছিল। ছিল বলেই একেক জ্বালাময়ী কবিতা-গানে বাংলা সাহিত্যকে সমৃদ্ধ করে তুলতে পেরেছিলেন। বড় হয়ে তোমরা বুঝবে তাঁর বড় বড় ভাবের বিপ্লবী কবিতার বিচিত্র সব রস। সাহিত্যে বলা হয়, প্রতিভা যদি স্পর্শ করে; তবে পিতলের পৃথিবীও সোনা হয়। কবি নজরুলের তেমনই ছিল প্রতিভা। তা তাঁর শৈশব-কৈশোরেই অনুভব করা গেছে। তবে দুঃখের বিষয়, তিনি যৌবনে বাক্রুদ্ধ হয়ে যান। ফলে বাংলা সাহিত্য তাঁর পরিণত সাহিত্যের স্বাদ থেকে বঞ্চিত থেকে গেছে। সত্যিকার অর্থে তিনি এসেছিলেন ধূমকেতুর মতো। হঠাত্ এসে হঠাত্ কাঁপিয়ে দিয়ে গেছেন। আর এ সত্যটি উপলব্ধি করে কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর তাঁকে আশীর্বাণী দিয়ে বলেছিলেন—‘আয় চলে আয়রে ধূমকেতু/ আঁধারে বাঁধ অগ্নিসেতু/ দুর্দিনের এই দুর্গশিরে/ উড়িয়ে দে তোর বিজয় কেতন।’ ঠিকই তিনি এসেছিলেন সাম্য-মৈত্রী-ভালোবাসার ধনকে বুকে নিয়ে, বিজয় কেতন উড়াতে। দৃঢ় চলার অঙ্গীকার নিয়ে তিনি গাইলেন—‘উষার দুয়ারে হানি আঘাত/ আমরা আনিব রাঙাপ্রভাত/ আমরা দানিব নতুন প্রাণ/ বাহুতে নবীন বল/ চলরে চলরে চল।’ এ বাণী আমাদের স্বাধীনতা সংগ্রামকে উদ্দীপ্ত করেছে। স্বাধীন বাংলাদেশের রণসংগীতের মর্যাদা পেয়েছে। তাই পরম ভালোবাসায় বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান স্বাধীন বাংলাদেশে তাঁকে এবং তাঁর পরিবারকে একটি ঠিকানা করে দিয়েছিলেন। তিনি আমাদের সকলের কবি। জাতীয় কবি।