চট্টগ্রামে মারাত্মক পানি সংকট

গরম বাড়ার সাথে সাথে চট্টগ্রামে ওয়াসার পানি সরবরাহে রেশনিং বেড়েছে। সপ্তাহে মাত্র ১২ ঘণ্টা ও ৪ দিন পানি সরবরাহ দেয়া হচ্ছে বিভিন্ন এলাকায়। রেশনিং নিয়ন্ত্রণ করতে সরবরাহ লাইনে বহু গেট ভাল্ব বসানো হয়েছে। সংকটের মধ্যে পানি চুরি ও অপচয় রোধ করা যাচ্ছে না। নগরীতে চাহিদার মাত্র ৩৩ শতাংশ পানি সরবরাহ করতে পারে ওয়াসা। ভাউজারে পানি কেনার হিড়িক পড়েছে। প্রভাবশালী ব্যক্তি ও সরকারি প্রতিষ্ঠানে ভাউজারে পানি সরবরাহ অগ্রাধিকার দিতে গিয়ে সিরিয়াল রক্ষা করা যাচ্ছে না। প্রতিবছর গরমের মৌসুমে পানির চাহিদা স্বাভাবিকের চেয়ে বেড়ে যায়। পানি নিয়ে চলে ভোগান্তি। বিশেষ করে নগরীতে উঁচু এলাকার বাসিন্দাদের পানি নিয়ে বেশি সংকটে পড়তে হচ্ছে। এসব এলাকার মধ্যে রয়েছে- হালিশহর, আগ্রাবাদ, কাট্টলী, ডবলমুরিং, মাদারবাড়ী, নাসিরাবাদ, চকবাজার, ঘাটফরহাট বেগ, এনায়েত বাজারসহ কয়েকটি এলাকা। চট্টগ্রাম ওয়াসার ব্যবস্থাপনা পরিচালক প্রকৌশলী একেএম ফজলুল্লাহ ইত্তেফাককে বলেন, ‘আগামী এক বছরের মধ্যে কর্ণফুলী শোধনাগার থেকে পানি সরবরাহ করা সম্ভব হবে। আরো কয়েকটি নতুন প্রকল্প নেয়া হয়েছে। অপচয় ঠেকাতে জাইকার অর্থায়নে ৫০০ কিলোমিটার পুরনো সরবরাহ লাইন নতুন করে বসানো হবে।’ পানির চাহিদা ও সরবরাহ ওয়াসার মতে নগরীতে পানির দৈনিক চাহিদা প্রায় ৫৫ কোটি লিটার। সরবরাহ দেয়া হচ্ছে প্রায় ২০ কোটি লিটার। এসব পানি মোহরায় স্থাপিত একমাত্র পানি শোধনাগার ও প্রায় ৯৫টি গভীর নলকূপ থেকে সরবরাহ দেয়া হচ্ছে। রাঙ্গুনিয়া নির্মাণাধীন কর্ণফুলী পানি শোধনাগার প্রকল্প থেকে পানি পেতে আরো প্রায় দুই বছর অপেক্ষা করতে হবে। এটি বাস্তবায়িত হলে দৈনিক ১৩ কোটি লিটার পানি পাওয়া যাবে। গভীর নলকূপ ২৫ বছরে ওয়াসায় বৃহত্ দ্বিতীয় কোন পানি শোধনাগার প্রকল্প বাস্তবায়িত হয়নি। ফলে পানি সংকট সামাল দিতে ৯৫টি গভীর নলকূপ বসানো হয়েছে। তবে নলকূপগুলো বসানোর সময় অনিয়ম ও দুর্নীতির কারণে কম সময়ের মধ্যে বেশিরভাগ নলকূপের উত্পাদন ক্ষমতা কমে গেছে। ফলে পর্যাপ্ত পানি পাওয়া যাচ্ছে না। ওয়াসা সূত্র জানায়, নলকূপগুলো রক্ষণাবেক্ষণে বছরে প্রায় ৪০ লাখ টাকার বেশি খরচ হচ্ছে। যান্ত্রিক ত্রুটি প্রায়ই লেগে থাকে অধিকাংশ নলকূপে। কালুরঘাট এলাকায় স্থাপিত নলকূপগুলোর উত্পাদন ক্ষমতা ভাল থাকলেও আগ্রাবাদ এলাকায় স্থাপিত সবগুলো নলকূপের অবস্থা অত্যন্ত করুণ। ফলে এসব এলাকার মানুষের পানি সংকট তীব্র হয়েছে। পানি চুরি ওয়াসার মতে পানি সিস্টেম লস্ প্রায় ২৫ শতাংশ। চুরির কথা স্বীকার না করে সরবরাহ লাইন ছিদ্র হয়ে সিস্টেম লসের কথা বলা হচ্ছে। ওয়াসার কর্মকর্তারা জানান, সরবরাহ লাইনটি প্রায় ৫০ বছরের পুরনো। লোহার পাইপ লাইন জরাজীর্ণ হয়ে প্রচুর পানি অপচয় হচ্ছে। মেরামত করেও অপচয় রোধ করা যাচ্ছে না। তবে দৈনিক প্রচুর পানি চুরি হচ্ছে। অবৈধ সংযোগের মাধ্যমে পানি চুরি হচ্ছে। ওয়াসার রাজস্ব শাখার কিছু দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তা ও কর্মচারী পানি চুরির সাথে সরাসরি জড়িত থাকার অভিযোগ রয়েছে। এতে তারা ব্যক্তিগতভাবে আর্থিক লাভবান হচ্ছে। এসব অবৈধ সংযোগ রয়েছে বাসা বাড়িতে, শিল্প কারখানায় ও বাণিজ্যিকভাবে ব্যবহূত গণশৌচাগারে। সিটি কর্পোরেশন নগরীতে প্রায় ৩৭টি গণশৌচাগারের ইজারা দিয়েছে। সবগুলো গণশৌচাগারে বৈধ ও অবৈধভাবে ওয়াসার পানির সংযোগ রয়েছে। ওয়াসার রাজস্ব শাখার এক কর্মকর্তা জানান, তাদের তালিকায় প্রায় ১৫টি গণশৌচাগারে বৈধ পানি সংযোগ রয়েছে। এসব গণশৌচাগারে পানি ব্যবহার ছাড়াও ড্রামে করে আশপাশের লোকেরা পানি কিনে নিয়ে যায়। নতুন সংযোগ ওয়াসায় বর্তমানে প্রায় ৫১ হাজার পানির সংযোগ রয়েছে। প্রতিদিন নতুন করে সংযোগ দেয়া অব্যাহত রয়েছে। কিন্তু পানি সরবরাহ বাড়েনি। এতে যাদের পুরনো সংযোগ রয়েছে তাদের নতুন করে পানি সংকটে পড়তে হচ্ছে। একটি সরবরাহ লাইনে ২০টি সংযোগ থাকার কথা থাকলেও সেখানে সংযোগ দ্বিগুণ হয়েছে। সরবরাহ লাইনে পানির প্রেশার কমে গেছে। সংকটের সুযোগে নগরীতে বিভিন্ন ব্রান্ডের নামে জারে করে দেদারসে পানি বিক্রি হচ্ছে। অধিকাংশ জারে বিএসটিআই’র কোন অনুমোদন নেই। পানির সংকটপূর্ণ এলাকায় চড়া দামে এসব ভেজাল পানি বিক্রি হচ্ছে। বিএসটিআই’র নীরবতায় এ ধরনের ভেজাল পানি বিক্রি বৃদ্ধি পাওয়ার অভিযোগ রয়েছে। জনবলের স্বল্পতার অজুহাত দেখিয়ে মোবাইল কোর্টের কার্যক্রম নেই বললেই চলে। এ প্রসঙ্গে বিএসটিআই চট্টগ্রাম কার্যালয়ের সহকারী পরিচালক কেএম হানিফ ইত্তেফাককে বলেন, ‘চট্টগ্রামে ৩০টি লাইসেন্সপ্রাপ্ত পানি সরবরাহ কোম্পানী রয়েছে। লাইসেন্সবিহীন এ ধরনের কোম্পানীর সংখ্যা অনেক। এদের বিরুদ্ধে মোবাইল কোর্ট পরিচালনা অব্যাহত রয়েছে।’ ভাইজারে পানি বিক্রি বিক্রিত পানি সরবরাহের জন্য ওয়াসা কর্তৃপক্ষের ১০টি ভাউজার রয়েছে। এগুলোতে সর্বোচ্চ ১০ হাজার লিটার থেকে ৬ হাজার লিটার পানি পরিবহন করা যায়। বড় ভাউজারের পানির মূল্য এক হাজার টাকা ও ছোট ভাউজারের পানির মূূল্য ৮০০ টাকা। কর্তৃপক্ষ জানান, প্রতিদিন প্রায় শতাধিক গাড়ি পানি বিক্রি হচ্ছে। তবে ভাউজার স্বল্পতায় প্রতিদিন প্রায় ৫০ গাড়ি পানি সরবরাহ দেয়া সম্ভব হয়। প্রভাবশালী ব্যক্তি ও সরকারি প্রতিষ্ঠানে ভাউজারে পানি বিক্রি অগ্রাধিকার দিতে গিয়ে অনেক ক্ষেত্রে সিরিয়াল রক্ষা করা যায় না। এতে অন্যদের কাছে সঠিক সময়ে পানি পৌঁছানো যায় না।