চট্টগ্রাম প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়
কাজ শেখার দিনগুলো
প্রকাশ : ০১ এপ্রিল ২০১৪, ১৮:২৩
প্রকৌশলবিদ্যা আর পরীক্ষামূলক ব্যবহারিক কাজ একটি আরেকটির সাথে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। সেই ব্যবহারিক কাজ যদি শেখা যায় উত্পাদনরত কোন কোম্পানিতে ট্রেনিং-এর মাধ্যমে তাহলে শিক্ষার শতভাগ পূর্ণতা পায়। পুস্তকার্জিত জ্ঞানকে বাস্তবে রূপদান করার জন্য চট্টগ্রাম প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (চুয়েট) যন্ত্রকৌশল বিভাগ প্রতিবারের ন্যায় এবারও চতুর্থ বর্ষের শিক্ষার্থীদের জন্য গত ৯ মার্চ থেকে ২৯ মার্চ আয়োজন করে ইন্ডাস্ট্রিয়াল ট্রেনিং।
পরীক্ষা না থাকলে সাধারণত ঘুম থেকে উঠে ক্লাস করতে যাওয়াই বিশ্ববিদ্যালয়ের বেশিরভাগ শিক্ষার্থীর প্রতিদিনকার রুটিন। যন্ত্রকৌশল বিভাগের শেষ বর্ষের শিক্ষার্থী হওয়ায় ট্রেনিংয়ের খবর শুনে এই রুটিনের ব্যত্যয় ঘটাতে হলো আমাদের। স্যারদের নির্দেশনা অনুযায়ী আট অথবা দশ জনের গ্রুপ জমা দিতে হবে। আমাদের গ্রুপটা হল মোট আট জনের। আমাদের গ্রুপকে ট্রেনিং করতে হবে ‘গাজী ওয়ার লিমিটেড’-এ। এটি চুয়েট থেকে প্রায় ২০কিমি দূরে সি.এম.বি নামক জায়গায় অবস্থিত।
নয় তারিখে খুব সকালেই পৌঁছে গেলাম ইন্ডাস্ট্রির সামনে। এর ভিতরের পরিবেশটা কেমন হবে বা এখানে কি কি কাজ হয় তা দেখার জন্যও সবার ভিতরে একধরনের উত্তেজনা কাজ করছিল। সাড়ে নয়টায় আমরা ঢুকতে পারলাম ভিতরে। পরিচয়পর্ব শেষে আমাদের নিয়ে যাওয়া হল ফ্যাক্টরী রুমের ভিতরে। মেকানিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং -এ পড়ার সুবাদে অনেক যন্ত্রপাতির সাথেই পরিচয় ছিল তবে উত্পাদনে থাকা কোন ইন্ডাস্ট্রি এত ভালভাবে দেখার অভিজ্ঞতা এই প্রথম। আমাদের ট্রেনিং এর দায়িত্বে থাকা উপ-সহকারী প্রকৌশলী মাইনুদ্দিন আহমেদ আমাদের প্রতিটি যন্ত্র সম্পর্কে বর্ণনা করলেন অত্যন্ত সুন্দরভাবে। প্রথমদিন ট্রেনারের সাথে প্রতিটি যন্ত্র ঘুরে ঘুরে দেখে কিছু কিছু ধারণা নিলাম আমরা। এরপর আমাদের প্রতিদিনের কাজ ছিল প্রতিটি মেশিন গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করা।
এখন ‘গাজী ওয়ার লিমিটেড’ সম্পর্কে কিছু বলা যাক। এটি মূলত সরকারের একটা করপোরেশন। এটি বাংলাদেশে একমাত্র ‘সুপার এনামেল’ তার প্রস্তুতকারক প্রতিষ্ঠান। বিদেশ থেকে ৮ মিলিমিটারের বিশুদ্ধ তামার তার আমদানি করা হয়। এই মোটা তারগুলো ডাই নামক যন্ত্রের মাধ্যমে ধাপে ধাপে চিকন করা হয়। কিন্তু চিকন করার ফলে তার গুলো বেশ শক্ত হয়ে যায়। তখন এদেরকে এনেলিং নামক পদ্ধতির মাধ্যমে আবারও মোলায়েম করা হয়। তারপর এই তারগুলোর উপর পি.ভি.এফ (ক্রিসল ও জায়লিন) এর আবরণ দেয়া হয়। এই পদ্ধতির নামই সুপার এনামেলিং। উত্পাদনের প্রতিটি স্তরে মান নিয়ন্ত্রণ করা হয় দক্ষ হাতে। এই তারগুলো মূলত ইলেকট্রিক মোটর, ফ্যান, ট্রান্সফরমার ইত্যাদির কয়েল তৈরিতে ব্যবহার হয়।
ট্রেনিং এর শেষদিকে একদিন হঠাত্ যন্ত্রকৌশল বিভাগের অধ্যাপক ড. বদিউস সালাম ও সহযোগী অধ্যাপক ড. সজল চন্দ্র বণিক স্যার আসেন আমাদের ট্রেনিং দেখতে। এরমাঝে একদিন ইন্ডাস্ট্রির এম. ডি. প্রকৌশলী মোঃ শাহজাহান স্যার-এর সাথে আমরা দেখা করি। স্যার-এর কাছেই জানতে পারি সরকারের যে কয়েকটি লাভজনক কোম্পানী রয়েছে এর মাঝে গাজী ওয়ার অন্যতম। এসময় স্যার আমাদের ভবিষ্যত্ কর্মজীবন সম্পর্কে বেশকিছু গুরুত্বপূর্ণ উপদেশ দেন। আমাদের গ্রুপে মোট চারজন ছেলে আর চারজন মেয়ে। এদের মাঝে সবচেয়ে মনোযোগী তামান্না বিল্লাহ। প্রতিটি যন্ত্র সম্বন্ধেই তার ছিল অনেক প্রশ্ন। এজন্য অবশ্য বন্ধুদের অনেক মজাও সহ্য করতে হয়েছে ওকে। সবাইকে সঠিক সময়ে উপস্থিত করার গুরুদায়িতট্বা পালন করে সজল কুমার বালা। আমাদের গ্রুপের অন্য সদস্যরা হল উম্মে কাওছার আলম, আব্দুর রাজ্জাক, সাদিয়া শারমীন, রিয়াদুজ্জামান ও শায়লা হক। শিক্ষা জীবনের শেষপ্রান্তে বন্ধুদের সাথে এই ট্রেনিংয়ের সময়টা স্মৃতিময় হয়ে থাকবে সারা জীবন।