বদরগঞ্জ মডেল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়

ড. ফাল্গুনী রানী চক্রবর্তী,সহযোগি অধ্যাপক আমার জীবনের প্রথম স্কুলের নাম ‘ বদরগঞ্জ মডেল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়’। এখনকার বাবা-মায়ের মতো আমাদের সময়ের বাবা-মা উত্কণ্ঠায় থাকতেন না বরং বাবা-মা সন্তানের স্কুল-ভর্তি বিষয়টি নিয়ে খানিকটা উদাসীন থাকতেন, অন্যদিকে স্কুলের শিক্ষকগণই নিজের গরজে পাড়া পড়শীর সন্তানদের হাত ধরে নিয়ে যেতেন স্কুলে। আনুষ্ঠানিকভাবে স্কুল-জীবনের সূচনা কবে, কত তারিখে তা আমার জানা নেই। আমার কাকা (বাবার ছোট ভাই) ছিলেন ঠাকুরগাঁও জেলার রুহিয়া ডিগ্রি কলেজের অধ্যাপক। তিনিই একদিন আমাকে এবং আমার কাকাতো বোন মিলিকে স্কুলে ভর্তি করেছিলেন। প্রাথমিক বিদ্যালয়ের দিনগুলো ছিল মনে রাখার মতো মজার। পড়ার চাপ নেই, পড়া না পারলে মাফও নেই। মনে আছে— গণিতের ক্লাশে আমাদের স্যার সুর করে নাম্তা বলতেন, আমরা তাঁর সাথে গলা মিলিয়ে চিত্কার করে নাম্তা বলতাম। এভাবেই প্রতিটি ক্লাশ হয়ে উঠতো উপভোগ্য। দাগ টানা খাতায় নিয়ম করে প্রতিদিন বাংলা ও ইংরেজি হাতের লেখা স্যারকে দেখাতে হতো। হাতের লেখা দাগের বাইরে গেলেই হাতের তালুতে বেতের আঘাত। প্রথম প্রথম বেত্রাঘাত খায়নি, এমন শিক্ষার্থী পাওয়া অসম্ভব। তবে ক্লাশের বাইরে শিক্ষকগণ ছিলেন এতটাই আন্তরিক যে, শিক্ষার্থীদের সকল বিষয়ে দৃষ্টি রাখতেন। যদি কেউ পরপর তিন/চারদিন ক্লাশে না আসতো, তাহলে তার বাসায় গিয়ে কিংবা অভািভাবকের নিকট থেকে স্কুলে না আসার কারণ সম্পর্কে তথ্য নিতেন। কোন শিক্ষার্থী অসুস্থ হলে শিক্ষকগণ অভিভাবকের মতোই খোঁজ নিতেন, এমনকি অসুস্থ শিক্ষার্থীর পাশে যেয়ে তার গায়ে মাথায় হাত দিয়ে অভয় দিতেন। এককথায়, শিক্ষক- শিক্ষার্থী- অভিভাবক যেন একটি পরিবার। কোন কৃত্রিমতা ছিল না। কারো সন্তানকে কোথাও কোন অন্যায় করতে দেখলে শিক্ষক তখনি তাকে শাসন করতেন এবং তার অভিভাবকও বিষয়টি জানাতেন। রাগে-অনুরাগে আমাদের শিক্ষকগণ ছিলেন আমাদের অকৃত্রিম হিতাকাঙ্ক্ষী। শৈশবেই আমরা শিখেছি আমাদের আজকের যা কিছু ভালো। মন্দগুলোকে বর্জনও শিখেছি একইসাথে। আমাদের স্কুলটি রংপুর জেলার বদরগঞ্জ থানার মধ্যে একটিমাত্র সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়। তেমন কোন দৃষ্টিনন্দন ভবন ছিল না। এল প্যার্টানের টিনশেড স্কুলঘর। দেয়ালে ছিল ইটের গাঁথুনি। মেঝে যতদূর মনে পড়ে মাটির ছিল। শিক্ষার্থীর তুলনায় ক্লাশরুম ও বেঞ্চ অপর্যাপ্ত ছিল। ঠাসাঠাসি করে বসতাম। প্রথম বেঞ্চে বসার জন্য চলতো রীতিমত প্রতিযোগিতা। শিক্ষকের কথা অবজ্ঞা করার মতো সাহস আমাদের ছিল না। শিক্ষকদের আমরা ভয় পেতাম আবার ভীষণভাবে শ্রদ্ধাও করতাম। আমার জীবনের প্রথম স্কুল আমাকে প্রকৃত শিক্ষার কথা মনে করিয়ে দেয়। আমাদের স্কুল, স্কুলঘর, ক্লাশের উপকরণ সবমিলিয়ে আমরা দরিদ্র ছিলাম বটে, কিন্তু আমাদের যা ছিল , তা এখন দুর্লভ। বড় বড় ডিগ্রিধারী শিক্ষক পাইনি, কিন্তু যাঁদের শিক্ষক হিসেবে পেয়েছিলাম, তাঁরা প্রত্যেকে ছিলেন যথার্থ প্রাজ্ঞ। তাঁদের শিক্ষায় ও শেখানোতে কোন ফাঁকি ছিল না। তাঁরা কেউ ব্যবসায়িক মনোভাব নিয়ে শিক্ষকতা করতেন না।