হেমিংওয়ের সঙ্গে

সৈয়দ হকের পাশে একটা সবুজ গাড়ি, পুরনো। গাড়িতে সে হেলান দিয়ে সিগারেট জ্বালাবার জন্য লাইটার বার করেছে। তাকে দেখাচ্ছে ঠিক সিনেমার হিরোর মতো। আনোয়ারা কলেজের গেটের বাইরে এসে অবাক হয়ে বলল, গাড়ি? কার?

সৈয়দ হক হেসে বলল, আমার। আবার কার? বলতে বলতে সে গাড়িতে হেলান দেওয়া ভঙ্গি থেকে উঠে সোজা হয়ে দাঁড়াল। তাকে এখন দেখে মনে হচ্ছে ছয় ফুট লম্বা। তার গায়ে পাটভাঙা শার্ট, গ্যাবাডিনের মসৃণ ট্রাউজার। পায়ে চকচকে জুতো। দুই চোখে তারার দীপ্তি জ্বলজ্বল করছে।

তোমার মানে? কিনলে?

হ্যাঁ।

টাকা? এত টাকা কোথায় পেলে? আনোয়ারা অবাক হয়ে প্রশ্ন করে?

চিত্রনাট্য লিখে। ‘মাটির পাহাড়’ বলে একটা সিনেমার চিত্রনাট্য লিখে হঠাত্ বেশকিছু টাকা পেয়ে গেলাম। কিনে ফেললাম গাড়িটা। তোমাকে নিয়ে ঘুরব। তারপর গাড়ির দরজা খুলে বলল, এসো ভেতরে বসো। আজ আমরা মিরান্ডার রেস্তোরাঁয় যাব।

আনোয়ারা সবুজ রঙের প্রিফেক্ট গাড়িতে উঠতে উঠতে বলল, তুমি সত্যিই পাগল। যা মনে আসে তা-ই কর।

সৈয়দ হক আসনে বসে স্টিয়ারিং হাতে নিয়ে বলল, স্বাধীনতার মানে তো তা-ই। অন্যের ক্ষতি না করে যা খুশি তা-ই করা। নয় কি?

রবিবারের সকালের নবাবপুর রোড বেশ ঢিলেঢালা, অলস ভঙ্গিতে শুয়ে আছে। লোকজন হাঁটছে ধীরেসুস্থে। রিকশা যাচ্ছে মন্থর গতিতে। দোকানের ঝাঁপ খুলে দোকানিরা ঝাড়মুছ করছে। মিরান্ডার রেস্তোরাঁ সবে খুলেছে। তারা দুজনেই প্রথম খরিদ্দার। যা হয়, ভেতরে ঢুকে প্রথমে কিছু পরিষ্কার দেখা যায় না। তারপর অস্পষ্ট আলোয় দেখা যায় টেবিল-চেয়ার আর কয়েকজন ওয়েটার।

সৈয়দ হক আনোয়ারাকে নিয়ে বসল এক টেবিলে। তার দিকে তাকিয়ে বলল, মিরান্ডার রেস্তোরাঁর কথা তোমাকে বলেছি মাঝে-মাঝে। এটা আমাদের প্রিয় আড্ডার স্থান ছিল পঞ্চাশের দশকে। এখানে বসেই আমি লিখেছি ‘তিন পয়সার জ্যোছনা, ‘রক্ত গোলাপ’ আর ‘কবি’ নামের গল্পটি। রক্ত গোলাপ লিখেছিলাম তিন দিনে আর কবি একদিনে। রক্ত গোলাপে ছিল কল্পনা আর বাস্তব মেশানো। ময়মনসিংহ গীতিকা থেকে নিয়েছিলাম লোককাহিনি। বোধকরি আমাদের লোককথা নিয়ে সেটাই প্রথম আধুনিক সাহিত্যচর্চা এবং তা আমিই করেছিলাম, বিদেশি অনেক বই পড়া সত্ত্বেও।

আনোয়ারা বলল, দেখা যাচ্ছে তোমার মধ্যে শেকড়ের টান বেশ রয়েছে, অবচেতনে হলেও।

শুনে সৈয়দ হক একটু ভাবল। তারপর বলল, পূর্বপুরুষের রক্ত বইছে আমাদের ধমনীতে। আমরা কী করে অস্বীকার করি? শিকড়ের দিকে গমন, প্রত্যাগমন করতেই হবে, আগে আর পরে।

কফি আর খাবারের অর্ডার দিয়ে সৈয়দ হক বলল, আইএ পরীক্ষার শেষ দিনে গভীর রাতে বাবা মৃতুশয্যায়—এই টেলিগ্রাম পেয়ে পরের দিনই কুড়িগ্রাম গিয়েছিলাম। শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগের আগের দিন তিনি আমাকে ডেকে বললেন, তোমার নিচে সাত সাতটি ভাইবোন রেখে যাচ্ছি। সামান্য সম্পদ যা রেখে যাচ্ছি তুমি তাদের দিয়ে দিও। নিজে কিছু নিও না। তোমার অনেক হবে। তারপর বললেন, তুমি আমার কাছে কিছু চাও। তোমাকে দিয়ে যাই। আমি বললাম, না, আমার কিছু চাই না। বাবা ছাড়বেন না। বললেন, বল তোমার কী ইচ্ছা?

এর আগেও এমন হয়েছে। তিনি আমাকে গরম কোট বানিয়ে দিতে চেয়েছেন। আমি নিচ্ছি না। তিনি আমাকে বলছেন, চলো রেস্টুরেন্টে গিয়ে মোরগ-পোলাও খাই’। আমি খাই না। শেষের দিকে আমাকে খুশি করার জন্য তাঁর কী যে প্রবল ইচ্ছে! আমি অভিভূত হই। মৃতুশয্যায় তাঁর শেষ কথা ফেরাতে পারলাম না। বললাম, কয়েকটা গল্প লেখা হয়েছে, একটা বই বার করার ইচ্ছে। বাবা সাগ্রহে বললেন, ক পৃষ্ঠার বই? বললাম, সোয়াশো পৃষ্ঠা হয়তো হবে। তিনি তাঁর হোমিওপ্যাথির বই ছাপিয়ে অভিজ্ঞ, তাই মনে মনে হিসেব করে বালিশের তলা থেকে চাবির গোছা বার করে আমাকে দিয়েই তাঁর সিন্দুকটা খোলালেন। সেখান থেকে সাতশো টাকা নিতে বললেন। টাকাটা তাঁর হাতে দিলাম। তিনি টাকাগুলো আমার হাতে দিয়ে বললেন, ভালো একটা প্রেসে ছাপতে দিও। বইটা যেন সুন্দর হয়।

সৈয়দ হকের কথা শুনে আনোয়ারা অবাক হয়ে বলল, বাহ্! তোমার বাবা তো দারুণ ছিলেন। এমন বাবা হতে পারে ভাবা যায় না।

সৈয়দ হক বলল, হ্যাঁ, এই ছিলেন আমার বাবা। যিনি প্রথমে এতটা বাধা দিয়েছিলেন আমার লেখক হবার ইচ্ছা শুনে।

আনোয়ারা বলল, সেই টাকা দিয়ে বই-ই বার করলে? গল্পের বই? অন্যভাবে খরচ করলে না?

সৈয়দ হক বলল, হ্যাঁ বই বার করলাম। বাবাকে যেমন বলেছি। গল্পের বই, আমার প্রথম গল্প সংকলন ‘তাস’। তারপর একটু থেমে বলল, কবিতার বই বের করতে পারতাম, কিন্তু মনে হলো কবিতায় এখনো আমি তৈরি হয়ে উঠতে পারিনি।  অতএব গল্পের বই। বইয়ের পাণ্ডুলিপি নিয়ে গেলাম হাসান হাফিজুর রহমানের কাছে সওগাত প্রেসে। ইতিমধ্যে তাঁর একুশে সংকলনে আমার প্রথম কবিতা ছাপা হয়েছে সেই ১৯৫৩ সালের মার্চ মাসে। এক বছর পর তাঁর সামনে হাজির হলাম গল্প সংকলনের পাণ্ডুলিপি নিয়ে। আঠারো বছর বয়স আমার পুরো হয়নি। ঐ বয়সে বই! আমার একটু কুণ্ঠাই ছিল। হাসান একটুও চমকালেন না। বরং একেবারে হুমড়ি খেয়ে পড়লেন আমার পাণ্ডুলিপির ওপর। বললেন, বাহ্! এই তো, একটা বই হয়ে যাবে। সেদিন ঐ সওগাত আপিসে বসেই হাসান পুরো ছক কেটে দিলেন বইয়ের। সাজিয়ে দিলেন কোন গল্পের পর কোন গল্প যাবে। তারই পরামর্শে দৌড়ে গেলাম শেখ সাহেব বাজারে স্টার প্রেসে। মনোটাইপে কম্পোজ করার একমাত্র প্রেস ছিল ওটাই। বাবা মৃতুশয্যায় বলেছিলেন, বইটা যেন ভালো হয়। সে কথা মনে ছিল। প্রেস থেকে কয়েকদিন পর প্রুফ নিয়ে ছুটলাম কাপ্তানবাজারে বামাচরণ চক্রবর্তী রোডে। সেখানে আনিসুজ্জামান থাকেন। তাঁকে দিয়ে দেখাই বইটার মেকআপ আর প্রুফ কাটার কাজ। তখন ওটাই ছিল আমাদের সবার পক্ষে স্বাভাবিক, পরস্পরের কাজে এগিয়ে আসা আর এ নিয়ে আনিসুজ্জামানকে কিছু বলতে হতো না। জগন্নাথ কলেজে আনিসুজ্জামান যখন ছাত্র, আমিও পড়ি। অচিরে আমরা বন্ধু হয়ে যাই। কতটা নিবিড় ছিল সেই বন্ধুত্ব তার একটা ছায়া পড়েছিল আমার অসমাপ্ত উপন্যাস ‘অন্যজন’-এ। সে যা-ই হোক আনিসের বামাচরণ লেনের বাড়িতে আমাদের অনেক জমজমাট আড্ডা হয়েছে। সেখানে সকাল-সন্ধ্যা তাসের প্রুফ দেখা চলছে। বামপন্থার রাজনীতি নিয়েও আলোচনা হচ্ছে। আত্মগোপনকারী তরুণ তুর্কিদের জন্য টাকাও তুলছে আনিস। আমি যখন যতটা পারি দিচ্ছি। আনিস লিখলেন আমার গল্প সংকলনের পেছনের মলাটে পরিচিতিমূলক ছোট একটা বাক্য, যার প্রথমটা ছিল হাসানেরই ততক্ষণাত্ মুখে মুখে বলে দেওয়া—‘পলক পড়ছে তো জন্ম হচ্ছে নতুন কথার’।

আনোয়ারা বলল, ক টা গল্প ছিল ঐ সংকলনে?

সৈয়দ হক বলল, সাতটি। তারপর বলল, এখন আমি বেশ অবাকই হই ভেবে যে, ষোলো থেকে সতেরো বছর বয়সে লেখা ঐ সাতটি গল্পের একটিও নয় প্রেমের। সবই ছিল রাজনীতি, উদ্বাস্তু মধ্যবিত্ত আর কন্যাদায় বিষয়ে। গাফফার চৌধুরী পড়ে বলেছিলেন...

পুরো উপন্যাস ইত্তেফাক ঈদসংখ্যায়