জন্মবদল

কত দ্বিধা এসে জড়ো হয়, কত অনিশ্চয়তা ঘূর্ণি তোলে আর কত ভয়ও খেলা করে—তারপরও কবির আদনান চেয়েছিলেন, শেষ জীবনটা গ্রামে কাটাবেন। একেবারে নির্জলা, নির্জন নিজের গ্রামে। শুধু চাওয়া নয়—নিরীহ ধর্মপ্রাণ মানুষ তিনি, প্রার্থনাও করেছিলেন হূদয়ের অন্তঃস্থল থেকে বহুবার। কিন্তু বয়স বাড়ছে এখন, তাঁর চাওয়া-চাওয়ির উচ্চারণ প্রতিদিন ক্ষীণ থেকে ক্ষীণতর হচ্ছে। যদিও প্রার্থনার পালে হাওয়া লাগছে সকাল-বিকাল। একটু ফুরসত পেলেই প্রার্থনা করেন তিনি, আল্লাহ, আমাকে গ্রামে গিয়ে মরার তৌফিক দিও আল্লাহ।

আগে এরকম হতো না। আগে কবির আদনান মনে মনে নিজের হূিপণ্ডটাকেই টুকরো টুকরো করে যেনবা ইটের পাঁজা বানাতেন। তারপর সেইসব হূত্টুকরোগুলো দিয়ে আবার ঘরদোর তুলতেন। আশ্চর্য, তাতে একটুও শ্বাসকষ্ট হতো না তাঁর। কিন্তু ইদানীং প্রায়ই এই শহরে দম আটকে আসে তাঁর। আরো অদ্ভুত ব্যাপার, প্রায়ই এলোমেলা সব গাছ-গুল্মের নাম মনে পড়ে—যেগুলোর অস্তিত্ব তাঁর জীবনে ছিল বলেও মনে হয় না। প্রায়ই মনে হয়, ভোরের নেওরে তাঁর পায়ের গোড়ালি ভিজে উঠেছে আর তাতে কদম ফুলের পাপড়ির মতো ধূলি জমেছে। প্রায়ই তিনি দেখতে পান, কার্তিকের চাঁদ এসে তাঁর দিকে একদৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে। একটা ভারী পাথর তখন তার বুকের ওপর চেপে বসে। দম আরো আটকে আসে। তিনি তখন তাঁর অপাপবিদ্ধ মেয়েদের মুখ মনে করার চেষ্টা করেন। তাতে হয় কি, আবারও নিঃশ্বাস নেওয়ার শক্তি ফিরে পান একটু একটু করে।

মেয়েদের হাতপা অবশ্য বড়ই হয়েছে কবির আদনানের। লেখাপড়া আর বিয়েও হয়ে গেছে দুজনের। বাকি আছে একজন। লেখাপড়া এখনো তার শেষ হয়নি। সবকিছু ঠিকঠাক থাকলে, ভার্সিটিতে সেশন জ্যাম না লাগলে আর দু বছরের মধ্যেই ভার্সিটি পেরুবে তাঁর এ মেয়ে। তারপর তার বিয়ে হলেই তিনি একেবারে গ্রামে চলে যাবেন। থাকবেন না আর এই মরার শহরটাতে। না, কোনো জোরাজুরি নেই—মিতার ইচ্ছে হলে ঢাকাতেই থাকবে, কিন্তু তিনি চলে যাবেন। দরকার হলে একা একাই যাবেন। কল্পনা না করলেও একটা দৃশ্যপট আপনাআপনিই ভেসে ওঠে তাঁর সামনে—প্রতিদিন সকালে ঘুম ভাঙবে আজান শুনে। বুঝতে পারবেন জানালা দিয়ে কেমন হালকা ঠাণ্ডা হাওয়া আসছে। জীবনের গাঢ় রং দানা বাধছে দু চোখ জুড়ে। তিনি উঠে পড়বেন বিছানা থেকে। ফজরের নামাজ পড়ে সূর্য ওঠা দেখবেন সড়ক কিংবা খেতের আলপথ দিয়ে হেঁটে যেতে যেতে। খুবই ইচ্ছা আছে তাঁর একটা ছোটখাটো সবজির বাগান করার। এই ইচ্ছাটা একেবারে মনের ভেতর খুব গোপনে পুষে রেখেছেন তিনি, এমনকি মিতাকেও বলেননি কোনো সময়। 

বিশেষ করে একটা বেগুনের টাল তো তাঁকে করতেই হবে; প্রায়ই ভাবেন কবির আদনান—দেশি জাতের কাঁটাওয়ালা এই ছোট আকারের বেগুন তিনি খুবই ভালোবাসেন। অথচ ঢাকা শহরে এ বেগুন এখন আর পাওয়া যায় না। কতদিন যে তিনি ওই বেগুন খান না, তাও আর মনে পড়ে না। এইখানে, এই মরার শহরের সবগুলো মার্কেটই গফরগাঁওয়ের ওই গোবদা গোবদা বেগুনে ভরা। এখন আবার সেগুলোর আসল স্বাদও পাওয়া যায় না সার, কীটনাশক আর কলের মেশিনের বীজের তোড়ে। তাঁর ইচ্ছা আছে মনের এককোণে পড়ে থাকা সেই ছোট জাতের দেশি বেগুনের বাগান করার। যাতে পোকা ধরে, আবার ভালোও থাকে। সেই বেগুনের টালের দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে, সুন্দর বেগুনিরঙা ফুল দেখতে দেখতে তাঁর মায়ের কথা মনে পড়বে। মা তাঁকে বলতেন, এমন এক দিন আসবে যেসময় বেগুন গাছের নিচে মানুষের হাট বসবে, সূর্য তখন আরো নিচে নেমে আসবে, মানুষ গরমে টিকতে পারবে না এবং এই সময়েই পৃথিবীতে কিয়ামত আসবে। এক হাতে বেহেশত আর আরেক হাতে দোজখ নিয়ে আসবে ইয়াজুজ আর মাজুদ। ইয়াজুজ আর মাজুদ কে জানো? প্রৌঢ় কবির আদনান তাঁর তরুণী মায়ের মিষ্টি কণ্ঠস্বর স্পষ্ট শুনতে পান—ইয়াজুজ হলো পুরুষ আর মাজুদ হলো নারী। আমাদের মতো মানুষ হলেও ওরা পাকা শয়তান। জুলফিকার নায়েক আলাইহিস সাল্লামের সময় এদেরকে একটা গর্তের মধ্যে ঢুকিয়ে সিসা ঢেলে প্রাচীর তৈরি করে আটকে রাখা হয়েছে। ইয়াজুজ আর মাজুদের বড় বড় জিভ—ওরা সারারাত ধরে দেয়াল চাটতে চাটতে একেবারে পাতলা করে ফেলে। তারপর যখন আর একটু চাটলেই দেয়াল ভেঙে গর্ত বেরুবে, তখন তাদের মনে হয়, এহ্, অনেক রাত হয়ে গেছে। আজ থাকুক। কাল সকালে উঠে বাকিটুকু চাটব। কিন্তু পরদিন সকালে উঠে দেখে দেয়ালটা আবারও আগের মতো হয়ে গেছে। এই ইয়াজুজ আর মাজুদ একদিন ওই দেয়াল ভেঙে বেরিয়ে পড়বে। মানুষকে বেহেশতের লোভ দেখিয়ে আসলে নরকেরই ঠেলে দেবে। এবং পৃথিবী তখন ধ্বংস হয়ে যাবে। কবির আদনানের মনে পড়ে, কোনোদিন রাতে স্কুলের পড়া অসম্পূর্ণ রেখে ঘুমাতে যেতে চাইলেই মা বলে উঠতেন, সকালে উঠে কিন্তু ইয়াজুজ মাজুদের মতো দেখবে, সব ভুলে বসে আছো! শুনে তিনি আবারও সুড়সুড় করে ফিরে এসে পড়তে বসতেন।

মেয়েদের দিকে তাকিয়ে, বিশেষ করে ছোট মেয়ের দিকে তাকিয়ে কবির আদনান স্বস্তি পান। মনে মনে মা’র উদ্দেশে বলেন, ‘মা, বেগুন গাছের নিচে মানুষের হাট বসার এখনো অনেক দেরি। দুনিয়ায় তোমার বংশধর আরো অনেক অনেকদিন বেঁচে থাকবে।’ গ্রামে তাঁর শেষবয়সের প্রথম শীত কাটবে এই বেগুনের টাল তৈরি করার কাজে। ইচ্ছা আছে, যেতে না চাইলেও ছোট মেয়েকে তিনি সেবছর গ্রামে নিয়ে যাবেন। বেগুনের ফুল দেখাতে দেখাতে এক সকালে তাকে তিনি মায়ের বলা ওই কথাগুলো জানিয়ে যাবেন। শুনে মেয়ে নিশ্চয়ই হেসে উঠবে, তবু তিনি শোনাবেন। পরদিন খুব সকালে ডেকে তুলবেন ওকে। এত ভোরে ঘুম ভাঙানোয় নিশ্চয়ই বিরক্ত হবে সে। কিন্তু তিনি সেই বিরক্তিকে একদম পাত্তা না দিয়ে বলবেন, ট্রেনের সময় হয়ে গেছে, তুই তাড়াতাড়ি ওঠ। নইলে আজ সারাদিনে আর শহরে যেতেই পারবি না। এখনই রওনা হ। আমি যাব না। আমি আর ফিরব না শহরে।

মেয়েরা অবশ্য কবির আদনানের এই ইচ্ছার ঘোরতর বিরোধী। এমনকি তাঁর স্ত্রী, মানে মিতা, যে গ্রামেই বড় হয়েছে এবং এই শহরে এসেছে বিয়েরও অনেক অনেক পরে। বড় মেয়ের বয়স তখন চার আর মেজো মেয়ের মাত্র বছর দুই। মেয়েরা তার এই ইচ্ছার শুধু বিরোধিতাই করে না, তারা এরকমও মনে করে, তিনি আসলে গ্রামে গিয়ে একদিনও থাকতে পারবেন না, থাকবেনও না। এসবই কথার কথা, কল্পনাবিলাস। কবির আদনান জানেন, এ নিয়ে তারা আড়ালে-আবডালে হাসাহাসিও করে। যেমন, হয়তো বড় মেয়ে বাসায় এসে তাঁর খোঁজ করছে, তিনি তখন বাথরুমে, শুনলেন ছোট মেয়েটি ইয়ার্কির স্বরে উত্তর দিচ্ছে, বাবা তো গ্রামে গেছে! এসব শুনে তিনি রাগ করেন না। কেবল মনে মনে হাসেন এবং ভাবেন, দেখিস, সত্যি সত্যি গ্রামেই যাব রে।

সেদিন বেশ রাতে হঠাত্ই তাঁর ঘুম ভাঙল। আজকাল অবশ্য তাঁর ঘুম অনেক পাতলা হয়ে গেছে, ঘুমও কমে যাচ্ছে, সেরকমই বলেছেন ডাক্তার। তাছাড়া হঠাত্-হঠাত্ প্রস্রাবও পায় বেশ। বেশ কয়েকবার ডায়াবেটিক টেস্ট করিয়েছেন। কিন্তু কোনোকিছুই ধরা পড়েনি। ডাক্তার বলেছেন, ডায়াবেটিক না থাকলেও তাঁর ডায়াবেটিক হওয়ার ভাব চলে এসেছে। আগাম পরামর্শ দিয়েছেন, সাতসকালে হাঁটার। ডাক্তারের কথার বাইরে যাননি তিনি। বিকেলে প্রতিদিন রমনা কিংবা রেসকোর্সে হাঁটেন। সোহরাওয়ার্দী উদ্যানকে এখনো রেসকোর্স ময়দানই বলেন তিনি। মনেই থাকে না ওটার নাম পাল্টে গেছে। যৌবনে দেখা সেই ঘোড়দৌড়ের স্মৃতি, তার সঙ্গে সাতই মার্চের স্মৃতি, দশই জানুয়ারির স্মৃতি—সব মিলিয়ে ওই উদ্যানের কথা বলতে গেলে রেসকোর্সের ময়দান নামটাই মনে আসে তাঁর। হাঁটতে হাঁটতে গাছগাছালি আর লতাগুল্ম দেখার অভ্যাসও পাকিয়ে তুলেছেন এরই মধ্যে। বইমেলায় অনেক খোঁজ করে দ্বিজেন শর্মার বেশকিছু বই কিনেছেন। আরো কিনেছেন ‘চিরঞ্জীব বনৌষধি’। এগুলো পড়েন। কখন কোন গাছে ফুল ফুটেছে সেসব দেখেন। দেখে মুগ্ধ হয়ে যান। এমনকি যখন অনেক আগাছার ভেতর অদ্ভুত সব পোকামাকড় দেখেন তখনো তিনি অবাক হয়ে তাকিয়ে থাকেন। ভাবেন, পৃথিবী এত বিচিত্র, এত সুফলা, এত উদার! হিংস্র, অহিংস্র, সুন্দর, অসুন্দর সবকিছুকে কেমন মিলিয়েমিশিয়ে রেখে দিয়েছে! তিনি সেই অবাক ভুবন দেখে বিচিত্র আনন্দে ডুবে থাকেন। কখনো এমটিভি দেখতে থাকা ছোট মেয়েকে অসাবধানে বলেও বসেন, মাঝেমধ্যে ন্যাশনাল জিওগ্রাফিও দেখিস, তখন বুঝবি, পৃথিবীতে আমরা আসলে কত ক্ষুদ্র। কত কম জেনেও কত হামবড়া ভাব নিয়ে বেঁচে আছি। অথচ পৃথিবীতে কত কিছুআছে, কতভাবে বেঁচে আছে, কতভাবে বেঁচে থাকার সুখদুঃখ অনুভব করছে।

পুরো উপন্যাস ইত্তেফাক ঈদসংখ্যায়