ওষুধের স্থানীয় বাজার দশ হাজার কোটি টাকারও বেশি
প্রকাশ : ০২ এপ্রিল ২০১৪, ২৩:২০
নানা প্রতিকূলতা সত্ত্বেও দেশের ওষুধের স্থানীয় বাজার গত ৫ বছরে ৫ হাজার কোটি টাকা থেকে বৃদ্ধি পেয়ে ১০ হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়ে গেছে। অথচ এই বিশাল বিকাশমান ওষুধ শিল্পে ওষুধের যথাযথ মান নিয়ন্ত্রণের ব্যবস্থা নেই। সেই মান্দাতা আমলের যন্ত্রপাতি ও জনবল দিয়ে খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে চলছে দেশের ওষুধের মান নিয়ন্ত্রণের জন্য প্রতিষ্ঠিত ঢাকা ও চট্টগ্রামের দু’টি ড্রাগ টেস্টিং ল্যাবরেটরি। স্বাস্থ্য মন্ত্রী মোহাম্মদ নাসিম ওষুধের মান নিয়ন্ত্রণে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়ে মহাখালীস্থ ড্রাগ ও ভ্যাকসিন টেস্টিং ল্যাবরেটরিতে জনবল নিয়োগের উদ্যোগ নিলেও কার্যত এখনও পর্যন্ত কোন অগ্রগতি হয়নি।
প্রাপ্ততথ্য অনুসারে দেশে বর্তমানে প্রায় ২৩০টিরও বেশি ওষুধ কোম্পানি রয়েছে। ওষুধ কোম্পানিগুলো দেশের ওষুধের ৯৮ ভাগ চাহিদা মিটিয়ে ২০১৩ সালে নানা প্রতিকূলতার মধ্যও ইউরোপ, ইউকে, আফ্রিকা, সিঙ্গাপুরসহ বিশ্বের অন্তত: ৮৭ দেশে ওষুধ রপ্তানি করেছে প্রায় ৭০০ কোটি টাকার। অথচ ২০০৯ সালে বিদেশে ওষুধ রপ্তানির পরিমাণ ছিল বছরে মাত্র ১০০ কোটি টাকা। এছাড়া গত ৫ বছরে ওষুধের বাজারও সম্প্রসারিত হয়েছে। ২০০৯ সালে ওষুধের বাজার ছিল ৫ হাজার ৪ শ কোটি টাকা, ২০১০ সালে ৬ হাজার ৮ শ কোটি টাকা, ২০১১ সালে ৮ হাজার কোটি টাকা, ২০১২ সালে ৯ হাজার ৪শ কোটি টাকা এবং ২০১৩ সালে স্থানীয় ওষুধের বাজার ছিল ১০ হাজার কোটি টাকার বেশি। আর এই বিশাল ওষুধ সেক্টর থেকে সরকারকে রাজস্ব দেয়া হয় প্রায় দেড় হাজার কোটি টাকা। অথচ অতীতে কোন সরকারই ওষুধের মাননিয়ন্ত্রণের যথাযথ উদ্যোগ নেয়নি। ফলে দেশের ওষুধ শিল্প কাঙ্ক্ষিত পর্যায়ে অগ্রগতি অর্জনে ব্যর্থ হচ্ছে। ওষুধ শিল্প সমিতির মহাসচিব আব্দুল মুকতাদির অতিদ্রুত দেশের ড্রাগ ও ভ্যাকসিন টেস্টিং ল্যাবরেটরিতে জনবল নিয়োগের দাবি জানিয়েছেন। অন্যথায় দেশের বিকাশমান এই শিল্প হুমকির সম্মুখীন হবে বলে তিনি মনে করেন।
দেশে বর্তমানে সাড়ে ৪ হাজারের বেশি জেনেরিক ওষুধ উত্পাদিত হচ্ছে। পাশাপাশি বিশ্বমানের ভ্যাকসিন, ইনসুলিন, ক্যান্সার ড্রাগসহ নানা ধরনের জীবন রক্ষাকারী ওষুধ ও বিভিন্ন উন্নত প্রযুক্তির বায়োটেক প্রডাক্টও তৈরি হচ্ছে দেশে। অথচ এধরনের হাইটেক হেপাটাইটিস বি, টাইফয়েড, টিটেনাস, র্যাবিস ইত্যাদি প্রডাক্টের পরীক্ষা ও মাননিয়ন্ত্রণের কোন ব্যবস্থা দেশে নেই। বর্তমান সরকারের আমলে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ও অন্যান্য আন্তর্জাতিক সংস্থার উদ্যোগে ঢাকার মহাখালীতে ২৫ কোটি টাকা ব্যয়ে একটি আধুনিক ভ্যাকসিন ল্যাব প্রতিষ্ঠা করা হলেও প্রয়োজনীয় লোকবলের অভাবে ল্যাবরেটরিটি চালু করা যাচ্ছে না। এজন্য বিশেষজ্ঞসহ ২৩৬ জন লোকবল নিয়োগের একটি প্রস্তাব এখনও ফাইলবন্দি। স্বাস্থ্য মন্ত্রী মোহাম্মদ নাসিম দায়িত্ব নেয়ার পর ভ্যাকসিন ল্যাবে লোকবল নিয়োগের চেষ্টা চলছে।
এছাড়া মহাখালীতে অবস্থিত ড্রাগ টেস্টিং ল্যাবরেটরিও চলছে কোনভাবে জোড়াতালি দিয়ে। মাইক্রোবায়োলজি, বায়োকেমেস্ট্রি ও অন্যান্য পর্যায়ের সংশ্লি¬ষ্ট বিশেষজ্ঞ থাকার প্রয়োজন থাকলেও বেশিরভাগ ক্ষেত্রে ঢাকায় থাকতে চান এমন সব ডাক্তারদের দিয়ে চালানো হচ্ছে ড্রাগ টেস্টিং ল্যাবরেটরি। এই ল্যাবরেটরি পরিচালনার কোন স্থায়ী পরিচালক নেই। ওষুধ প্রশাসন অধিদপ্তরের একজন পরিচালককে অতিরিক্ত দায়িত্ব দেয়া হয়েছে ড্রাগ টেস্টিং ল্যাবরেটরির। অথচ এই পরিচালক ওষুধ প্রশাসন অধিদপ্তরের ১২ থেকে ১৫টি গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে রয়েছেন। ১০ হাজার কোটি টাকায় ওষুধের মান নিয়ন্ত্রণের ল্যাবরেটরিতে একজন দক্ষ সার্বক্ষণিক পরিচালক দেয়া প্রয়োজন এমন দাবি দীর্ঘদিনের।
প্রাপ্ততথ্য অনুসারে বর্তমানে শুধু সরকারি পর্যায়েই বিদেশ থেকে আমদানি করা হচ্ছে ১ হাজার কোটি টাকার বিভিন্ন ধরনের ইপিআই ও অন্যান্য ভ্যাকসিন। অথচ দেশের ভ্যাকসিন ল্যাবরেটরিটি চালু হলে পর্যায়ক্রমে দেশের ওষুধ শিল্প থেকেই সংগ্রহ করা যেতো বিপুল পরিমাণ ভ্যাকসিন এবং এতে সাশ্রয় হতো হাজার কোটি টাকা। এছাড়া দেশে বর্তমানে তৈরি হচ্ছে জন্মনিয়ন্ত্রণ পিল ও শিশুদের অন্ধত্ব থেকে রক্ষার উচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন ভিটামিন এ ক্যাপসুলও। আমলাতান্ত্রিক জটিলতা ও অর্থলোভী একশ্রেণীর কর্মকর্তার কারণে বছরে প্রায় হাজার কোটি টাকার জন্মনিয়ন্ত্রণ পিল ও ভ্যাকসিন এর বাজারও চলে যাচ্ছে বন্ধু প্রতিম দেশে। দেশের বিকাশমান ওষুধ শিল্পের দিকে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় নজর দিলে ওষুধ বাজার ১৫ থেকে ২০ হাজার কোটি টাকায় উন্নীত করা সম্ভব বলে মত দিয়েছেন দেশের একাধিক ওষুধ বিশেষজ্ঞ।
এ ব্যাপারে ওষুধ প্রশাসন অধিদপ্তরের পরিচালক ও মহাখালীস্থ ড্রাগ ও ভ্যাকসিন ল্যাবরেটরির ভারপ্রাপ্ত পরিচালক সেলিম বারামী ইত্তেফাককে বলেন, এখনও পর্যন্ত ভ্যাকসিন ও ড্রাগ টেস্টিং ল্যাবের জন্য কোন লোকবল পাওয়া যায়নি। তবে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় থেকে লোকবল নিয়োগের ফাইলটি জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ে রয়েছে। জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের অনুমোদনের পর এটা যাবে ফাইন্যান্সে। কবে নাগাদ অতি গুরুত্বপূর্ণ দুটি ল্যাবরেটরির প্রয়োজনীয় লোকবল নিয়োগ করা সম্ভব হবে তা বলা যাচ্ছে না।