বিশ্বনাট্য দিবস
এই দুনিয়ার রঙ্গশালায়
প্রকাশ : ০৩ এপ্রিল ২০১৪, ১৯:৪০
বিশ্বখ্যাত নাট্যকার উইলিয়াম শেক্সপিয়র তাঁর ‘অ্যাজ ইউ লাইক ইট’ নাটকে বলেছিলেন—
All the world’s a stage,
And all the men and women merely players;
They have their exits and their entrances,
And one man in his time plays many parts…
এই বহুল ব্যবহূত উদ্ধৃতিতে শেক্সপিয়র দুনিয়াটাকে যেমন রঙ্গমঞ্চ বলেছেন, তেমনি এই পৃথিবীর সব মানুষকেই অভিনেতা বলেছেন। মঞ্চের মতোই নানা ভঙ্গি আর ধরনে আমাদের এই পৃথিবীতে আগমন ও প্রস্থান হয় এবং মঞ্চে থাকাকালে আমরা সবাই নানা ভূমিকায় অভিনয় করে যাই, কেউ কেউ একাধিক ভূমিকায়ও অভিনয় করি। বিশ শতকের কিংবদন্তি অভিনেতা মার্লোন ব্রান্ডো এক বইয়ের ভূমিকায় বলেছিলেন, মানুষ জন্মমাত্রই অভিনেতা। অভিনয় আমরা জ্ঞানত বা অজ্ঞানত নানা সময়ই করতে থাকি। ছোট্ট শিশুটিও জানে, কী করে মায়ের আহ্লাদ আদায় করতে হবে, প্রিয় বান্ধবীটি জানে, কী করে প্রেমিক পুরুষকে মুগ্ধতায় ভরিয়ে দিতে হয়। আমরা অফিসে একটা মানুষ, বাড়িতে আরেকটা, বন্ধুর আড্ডায় আরেকটা মানুষ হয়ে যাই, এই যে হয়ে যাওয়া, এই চরিত্রায়ণ প্রাতিষ্ঠানিক রূপ পাওয়ার আগেই জীবনের অঙ্গ হয়ে যায়।
নাটক, থিয়েটার, অভিনয়—এই সবকিছুর সবচেয়ে বড় কথা এসব জীবনের অংশ হয়ে যায়। নাট্যবিশেষজ্ঞ ও ঐতিহাসিকরা প্রাচীনতম গুহাচিত্রগুলো ব্যাখ্যা করে দেখিয়েছেন অভিনয়, নাট্যাংশ শিকারযুগ থেকেই মানুষের জীবনের অংশ হয়ে উঠেছিল। হয়তো কেমন করে একটি প্রাণীকে শিকার করা হয়েছে, গুহায় থেকে যাওয়া নারীদের তা দেখানোর জন্য সেটিকে পুনরায় অভিনয় করা হতো কিংবা এটি ছিল কোনো কৃত্য বা আচারের অংশ। কারণ যা-ই থাক, শিল্পকলার পুরাতাত্ত্বিক ইতিহাস অনুসন্ধানে জানা যায়, বিশ্বে বহু প্রান্তেই নাটক ছিল মানুষ ও মানবসভ্যতার অবিচ্ছেদ্য অংশ। গ্রিক, মিশর, ভারত যেখানেই সভ্যতার বিকাশ ঘটেছে, সেখানেই নাটকের বিকাশ তরান্বিত হয়েছে।
আজ বিশ্বব্যাপী নাটক প্রাতিষ্ঠানিক রূপ পেয়েছে। একে সবচেয়ে যৌগিক শিল্পকর্ম বলা হচ্ছে। গান, অভিনয়, চিত্রকলা, নাচ, সাহিত্য—শিল্পের সবগুলো মাধ্যমই এতে ব্যবহূত হচ্ছে। মানুষের আবেগ, ভাবনা ও স্বপ্নপূরণের কথা তো সবচেয়ে বেশি করে থিয়েটারেই ফুটে ওঠে। ইডিপাস কিংবা ইলেকট্রার বেদনা যুগ যুগ ধরে বয়ে যায় মানুষের অন্তর্গত রক্তের ভেতরে, বোধের গহিনে। হ্যামলেটের মনের দ্বিধা, ওথেলোর হঠকারিতা, ম্যাকবেথের ক্ষমতালিপ্সা থয়েটারেই প্রকাশিত হয়।
আর নাটক, নাট্য কিংবা থিয়েটার আজ শুধু একটি প্রকাশভঙ্গিই নয়; এই বৈশ্বিক পরিবেশনা রীতি মানুষকে ভাবায়, সচেতন করে, শিক্ষিত করে। তাই তো ইবসেনের নোরা যখন শেষ দৃশ্যে দরজা বন্ধ করে নারীস্বাধীনতার অঙ্গীকার নিয়ে বেরিয়ে আসে, তখন ইউরোপের হাজার হাজার ঘরে তার প্রভাব পড়ে, নারীরা আর পুতুলের সংসারে আটকে থাকায় বিশ্বাসী নয়। নারীসচেতনতায় ইবসেনের ‘ডলস হাউস’ সারা বিশ্বকে সচেতন করে তোলে। ব্রেখটের প্রতিটি নাটক মানুষকে শেখায়, সচেতন করে। শ্রেণিসংগ্রাম আর অর্থনৈতিক মুক্তি নিয়ে হাজার প্রবন্ধ লিখে যা করা সম্ভব নয়, ব্রেখটের ‘লোক সমান লোক’ কিংবা ‘বিধি ও ব্যতিক্রম’ তা করে দেয়। এরিস্টফানিসের ‘লিসিট্রাট্রা’ কিংবা ব্রেখটেরই ‘মাদার কারেজ’ মানুষকে যুদ্ধবিরোধী করে তোলে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ভয়াবহতা মানবসভ্যতার মুখে যে কালি মেখে দেয়, তার অর্থহীনতা নিয়ে হাসাহাসি করেন বেকেট, আয়ানেস্কো, এদামভ-এর মতো নাট্যকারেরা। বেকেটের ‘ওয়েটিং ফর গডো’ আমাদের শিখিয়ে দেয় জীবনের প্রতিটি পদে, প্রতিটি পলে আমরা শুধু অপেক্ষাই করে যাচ্ছি। উদ্দেশ্যহীন সেই অপেক্ষা কখনো হাস্যকর, ক্লান্তিকর, বিরক্তিকর পরিণতিতে ঠেলে দেয়। তবু ভ্লাদিমির, এস্ট্রাগনের মতো আমরা ‘চলো যাই’ বলেও কোথাও যাই না, ঠাঁয় দাঁড়িয়ে থাকি। দীনবন্ধু মিত্রের ‘নীল দর্পণ’ শুধু নীলকরদের অত্যচারের দলিল হয়ে থাকে না, বিশ্ব নাটকের মানচিত্রে প্রতিবাদের একটি মূল্যবান স্বাক্ষর হয়ে থাকে। একই কথা বলা যায় মীর মোশাররফ হোসেনের ‘জমিদার দর্পণ’ নাটকের ক্ষেত্রেও। মাইকেল মধুসূদন দত্তের ‘একেই কি বলে সভ্যতা’ তত্কালীন তরুণ যুবসমাজের অবক্ষয়, বাবু সংস্কৃতির প্রামাণ্য চিত্র তুলে ধরে। রবীন্দ্রনাথ তাঁর ‘বিসর্জন’ নাটকে পুরোহিত ও দেবতাদের প্রশ্নবিদ্ধ করেন মানবিকতার দায় নিয়ে। সমকালের বাংলা ও বিশ্ব নাটকে আমরা সমাজ, রাষ্ট্র, রাজনীতি ইত্যাদি নানা বিষয়ের দায়বদ্ধতা নিয়ে প্রশ্ন তুলতে থিয়েটার ভূমিকা রাখছে সর্বাগ্রে।
মানবজীবনের সত্যগুলোকে, নিগূঢ় তত্ত্বগুলোকে থিয়েটারের মতো করে আর কোনো মাধ্যমই কি তুলে ধরতে পারে? পপকর্ন খেতে খেতে সিনেমাহলের ঠান্ডা রুমে বান্ধবী নিয়ে আমরা চলচ্চিত্র দেখি, আমোদিত হই, সে চলচ্চিত্র কতটুকু ভাবাল, তা নিয়ে না-ভাবলেও চলে। কত টাকা খরচ করে, কত টাকা উশুল হলো সিনেমায়, সেটাই মূল কথা। আর টেলিভিশন তো ‘ঘরকা মুরগি ডাল বরাবর’। মোবাইলে গল্প করতে করতে, ল্যাপটপ চালাতে চালাতে হাজারো বিজ্ঞাপনের ভিড়ে আমরা টেলিভিশন দেখি। কিন্তু থিয়েটার তেমন আয়েশসাধ্য নয়। মাসের পর মাস মহড়া দিয়ে যে নাটকটি তৈরি হয়, তা দেখতে দর্শকদেরও তৈরি থাকতে হয়। থিয়েটারে চিপসের শব্দ চলে না, হাতে হাতে রেখে গল্প বলা চলে না। এ যে একমাত্র মুখোমুখি মিলন। অভিনেতা আর দর্শক একেবারে সামনাসামনি, যা ঘটছে তা এখনই ঘটছে, সবকিছু চোখের সামনে, পলক ফেলার অবকাশ নেই। থিয়েটার জীবন্ত, তাই স্বভাবগতভাবে পুরোটা মনোযোগ কেড়ে নেয়। জীবন্ত এই শিল্পমাধ্যম মানুষের সাথে মানুষের বন্ধন সৃষ্টি করে দেয় সরাসরি। একটা কথাই তো চালু আছে, Theatre is life. Cinema is art. Television is furniture.
এইবার একটু ব্যক্তিগত প্রসঙ্গে কথা বলি। বাংলাদেশের থিয়েটার নিয়ে কথা বলতে গেলে ব্যক্তিগত কিছু বিষয় পাঠকের সাথে সবিনয়ে ভাগাভাগি করতে চাই। ১৯৯০ সালে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হই নাটক ও নাট্যতত্ত্ব বিভাগে। আজ থেকে ২৪ বছর আগে থিয়েটার নিয়ে প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা নেয়ার ভাবনাটি খুব সুখকর ছিল না। তুমি কিসে পড়ো? ‘নাটক ও নাট্যতত্ত্ব বিভাগে।’ এইটুকু উত্তরে কেউ সন্তুষ্ট হতো না। এ বিভাগে পড়লে কী হবে, আমার ভবিষ্যত্ কী, আমার মাথা কি ঠিক আছে, আমি কি জীবনটাকে ধ্বংস করছি কি না—এমনি সব প্রশ্নের মুখোমুখি হতে হতো নিয়তই। তখন সব কিছুর উত্তর ভালো করে দিতে পারতাম না। যৌবনে-কৈশোরে এটুকু জানতাম, এটুকু জেদ ছিল, যা ভালো লাগে, তা-ই করব। থিয়েটার ভালো লাগে। ১৯৮৮ সালে প্রথম যোগ দিয়েছিলাম ‘ঢাকা লিটল থিয়েটার’-এ, সেখান থেকে ভালো লাগার শুরু। ভালো লাগা, ভালোবাসার প্রথম কালটা পার হলে আস্তে আস্তে ভেতরের রহস্যগুলো ধরা পড়তে শুরু করে, কারণগুলো বেরিয়ে আসে। ক্রমাগত চর্চা, পাঠ আর ভাবনার ভেতরে থিয়েটার ঢুকে পড়ায় আজ কেউ প্রশ্ন করলে পাল্টা প্রশ্ন করার সাহস রাখি, ‘কেন থিয়েটার করব না’। নেশা করব, মেয়েদের উত্যক্ত করব, ঘুষ খাব, মারামারি করব, ছিনতাই করব, না কি থিয়েটার করব? অবশ্যই এবং অতি অবশ্যই শিশু, কিশোর, যুবক, প্রবীণ, বৃদ্ধ সবার জন্য সবচেয়ে নির্দোষ, সুস্থ, লাগসই বিনোদন আর শিল্পমাধ্যম তো একমাত্র থিয়েটারই।
মানুষের সাথে মানুষের মহামিলন ঘটে থিয়েটারেই। কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে প্রতিটি থিয়েটারকর্মী কাজ করে, সে কাজের অংশীদার প্রতিটি দর্শকও। এ যেন গণতন্ত্রের সহজপাঠ। মত বিনিময়, আলোচনার এমন সুবর্ণ পাটাতন আর কোথায়ই বা আছে! হয়তো সে কারণেই সমাজ গঠনেও থিয়েটার সরাসরি ভূমিকা রাখে। দীনবন্ধু মিত্রের ‘নীল দর্পণ’, মীর মোশারফ হোসেনের ‘জমিদার দর্পণ’, মাইকেল মধুসূদনদত্তের ‘বুড়ো শালিকের ঘাড়ে রোঁ’, মামুনুর রশীদের ‘ওরা কদম আলী’, মমতাজ উদ্দিনের ‘সাত ঘাটের কানাকড়ি’ কিংবা আব্দুল্লাহ আল মামুনের ‘মেরাজ ফকিরের মা’ শুধু বাংলা থিয়েটারের সম্পদ নয়, বাঙালি ও বাংলাদেশের সমাজ বদলের একটি ধারাবাহিক পাঠ হিসাবেও বিবেচ্য। সমাজ গঠনে এই সব নাটক অগ্রজের ভূমিকা পালন করে। এই প্রসঙ্গে স্টেলা এডলারের একটি উদ্ধৃতি উল্লেখযোগ্য মনে করছি—
`The word theatre comes from the Greeks. It means the seeing place. It is the place people come to see the truth about life and the social situation. The theatre is a spiritual and social X-ray of its time. The theatre was created to tell people the truth about life and the social situation.’
সমাজ, দেশ, রাষ্ট্র যা-ই বলি না কেন, সে তো মানুষকে নিয়েই সৃষ্টি। তাই থিয়েটারের কেন্দ্রবিন্দুও মানুষ। থিয়েটার ব্যক্তি মানুষের বিকাশেও সর্বোচ্চ ভূমিকা রাখে। ব্যক্তি মানুষের সৃষ্টিশীলতা, আত্মবিশ্বাস, শৃঙ্খলাবোধ বাড়াতে আর কোনো শিল্পমাধ্যম এতটা অগ্রগণ্য নয়। সবচেয়ে লাজুক মানুষটি গলা ছেড়ে সংলাপ দিতে পারে থিয়েটারে এসেই। সবচেয়ে গুটিয়ে থাকা মানুষটিও প্রাণ ফিরে পায় থিয়েটারের মাধ্যমেই।
আর এত কিছুর পরও কেন থিয়েটার করি প্রশ্নটি উঠলে বলতেই হয়, থিয়েটারের চেয়ে ভালো কোনো বিকল্প মাধ্যম আর জানা নেই। থিয়েটারের আছে নিজস্ব এক শক্তি, যে শক্তি সে প্রাণে প্রাণে বিলিয়ে দেয়। প্রাণের আনন্দেই আমরা থিয়েটার করি।