মাতৃসেবার অনন্য দৃষ্টান্ত হযরত বায়েজীদ বোস্তামী (রহ.)
প্রকাশ : ০৩ এপ্রিল ২০১৪, ২১:২১
বারো আউলিয়ার পুন্য ভূমি চট্টগ্রামে আগত পীর ফকির, দরবেশ, বুজুর্গ ব্যক্তিদের মধ্যে হযরত বায়েজিদ বোস্তামী (রহ.) অন্যতম একজন। হযরত বায়েজিদ বোস্তামী (রহ.) সম্পর্কে বিভিন্ন গ্রন্থ এবং তথ্য সূত্র থেকে জানা যায় তিনি পারস্য দেশের বোস্তাম নগরীর বাসিন্দা ছিলেন। বোস্তাম নগরীতে তাঁর জন্ম হয়। তাঁর পিতামহ একজন মূর্তি এবং অগ্নি উপাসক ছিলেন বলে জানা যায়। কিন্তু তাঁর পিতা ইসলাম ধর্ম গ্রহন করে আল্লাহর নেক বান্দা হিসেবে পরিগণিত হয়েছিলেন। তাঁর বাবা প্রকৃত ঈমানদার, ন্যায়পরায়ন, শান্ত এবং সত্চরিত্রের মুসলমান ছিলেন। হযরত বায়েজিদ বোস্তামী (রহ.) এর জন্ম লাভের পর তাঁর মা-বাবার পরিবারে কিছু সুলক্ষণ দেখা দেয়। তাঁর মা-বাবা এই সন্তানকে আল্লাহর বিশেষ আশীর্বাদ হিসেবে মনে করেন। ছোট বেলা থেকেই তাঁর মা-বাবা তাঁকে বিশেষ আদর যত্নের সাথে লালন-পালন করতে থাকেন। তাঁর বিদ্যা শিক্ষার জন্য তারা বিশেষ উদ্যোগ নিয়েছিলেন। তাঁর জন্য তাঁর মা-বাবা কয়েকজন শিক্ষক নিয়োগ করেছিলেন। তাঁর পিতাও তাঁকে নিজে শিক্ষাদান করতেন। তাঁর বয়স বাড়ার সাথে সাথে শুধু গৃহ শিক্ষকের ওপর নির্ভর না করে তাঁকে তাঁর মা-বাবা মাদ্রাসায় ভর্তি করিয়ে দেন। এরই মধ্যে তাঁর বাবা ইন্তেকাল করেন। তাঁর মাতা ছিলেন যেমনি সত্চরিত্রের তেমনি বিদূষী ও ও বুদ্ধিমতি। তাছাড়া পুণ্যবতী মহিলা হিসেবে তাঁর খ্যাতি ছিল পুরো বোস্তাম নগরীতে। স্বামীর অকাল মৃত্যু হলেও তিনি বিচলিত হননি। তাঁদের পরিবারের আর্থিক অবস্থা মোটামুঠি স্বচ্ছলই ছিল। তাই হযরত বায়েজিদ বোস্তামী (রহ.) এর জীবন ধারা এবং শিক্ষা জীবনে কোন বিরূপ প্রভাব পড়তে পারেনি। তিনি তীক্ষ্ন মেধাবী ছাত্র ছিলেন। তাই মাদ্রাসায় তাঁর সহপাঠীদের মধ্যে অচিরেই তিনি বিশিষ্ট শিক্ষার্থীরূপে পরিচিতি লাভ করেন এবং শিক্ষক মণ্ডলীর সুনজরে পড়ে যান। তাঁর শিক্ষা গ্রহনের ধারা ছিল অনন্য সাধারণ। শিক্ষকগণ তাঁকে যখন যে সবক দান করতেন তা শুধু তিনি বাহ্যিকভাবে আয়ত্ব করে ক্ষ্যান্ত হতেন না তার অন্তর্নিহিত তাত্পর্য উদঘাটন করে সে অনুযায়ী আমল করতেন। তাঁর এই অবস্থা দেখে তাঁর শিক্ষকগন তাঁর সম্পর্কে ভবিষ্যদ্বানী করেছিলেন “বায়েজীদ তাঁদের একজন সাধারণ ছাত্র নন। তাঁর মধ্যে একটি বিরাট প্রতিভা লুকায়িত আছে। অনাগত ভবিষ্যতে তা নিশ্চয়ই আত্ম প্রকাশ করবে।” পরবর্তীকালে তাঁদের এই ভবিষ্যতবানী অক্ষরে অক্ষরে সত্য হয়ে দেখা দিয়েছিল। হযরত বায়েজীদ বোস্তামী (রহ.) বাল্যকালে মক্তবে পড়ার সময় পবিত্র কুরআনের সূরা লোকমানের মধ্যে দেখতে পান যে “আল্লাহতায়ালা এরশাদ করছেন “আমার নিকট ও পিতামাতার নিকট কৃতজ্ঞতা স্বীকার কর।” এই আয়াত তিনি ভালভাবে বুঝতে না পারায় তাঁর ওস্তাদের কাছে এর অর্থ জিজ্ঞেস করলে ওস্তাদ তা পরিস্কারভাবে বুঝিয়ে দেন। মক্তব হতে বাড়ী ফিরে তিনি তাঁর মাতাকে কদমবুচি করলেন। তারপর তিনি তাঁর মাকে বললেন পবিত্র কুরআনের আয়াত পড়ে বুঝলাম আল্লাহ বলেছেন “আল্লাহর কাছে এবং মাতা-পিতার কাছে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ কর”। এই আয়াত পড়ে অনুভব করলাম যে, আমার পক্ষে দুই নৌকায় পা রাখা সম্ভব নয়। হয় তোমার খেদমতে সারা জীবন থাকব, না হয় আল্লাহর রাস্তায় চলে যাব। ছেলের কথা শুনে তাঁর মা তাঁকে আল্লাহর রাস্তায় তাঁকে উত্সর্গ করে দিলেন। আল্লাহর এবাদত বন্দেগীর মধ্যেও তিনি অনুভব করতেন সব কিছুর পেছনে তাঁর মায়ের দোয়া রয়েছে। তিনি মায়ের সেবা যত্ন করার জন্য সবসময় উদগ্রীব থাকতেন। তিনি তাঁর মায়ের অসাধারণ খেদমত করে জগত্ বিখ্যাত হয়েছেন। এক রাতে তাঁর মাতা তার কাছে পানি পান করতে চাইলেন। কিন্তু সেদিন তাঁদের ঘরে কোন পানীয় জল ছিলনা। তিনি তাঁর মায়ের জন্য দূরবর্তী নদী থেকে পানি আনতে যান এবং পানি এনে দেখতে পান তাঁর মা গভীর নিদ্রায় বিভোর। তিনি মাকে ঘুম না জাগিয়ে পানির পাত্র হাতে সারা রাত মায়ের বিছানার পাশে দাঁড়িয়ে থাকলেন। শেষ রাত্রিরে দিকে তাঁর মা ঘুম থেকে জেগে দেখেন তাঁর সন্তান পানির পাত্র হাতে দাঁড়িয়ে আছে। ছেলের এই অবস্থা দেখে তাঁর মা পানির পাত্র হাতে নিয়ে পানি পান করলেন এবং মহান আল্লাহর দরবারে সন্তানের জন্য দোয়া চাইলেন। মায়ের দোয়ায় তিনি জগত্ বিখ্যাত অলীতে পরিণত হয়েছিলেন। হযরত বায়েজীদ বোস্তামী (রহ.) একজন প্রথম শ্রেনীর অলী ছিলেন। তিনি দেশে ইসলাম ধর্ম প্রচারের জন্য বের হন। ইসলাম ধর্ম প্রচার করতে করতে তিনি চট্টগ্রামে এসে পৌছান। চট্টগ্রামে এসে তিনি নাসিরাবাদ এলাকায় নির্জন পাহাড়ে আস্তানা করে এবাদত বন্দেগী শুরু করেন এবং সেখান থেকে বিভিন্ন দিকে ইসলাম প্রচার করেন। তিনি যে স্থানে আস্তানা করেছিলেন সেই স্থানটিকে বায়েজীদ বোস্তামী চিল্লা বলে। উক্ত চিল্লা এখন দরগায় পরিণত হয়েছে। এখানে প্রতিদিন হাজার হাজার নারী পুরুষ জেয়ারত করার জন্য আসেন। হযরত বায়েজীদ বোস্তামী (রহ.) এর আস্তানার পূর্বপার্শ্বে যে বিরাট পুকুর রয়েছে তাতে বিরাট মাছ এবং কচ্ছপ রয়েছে। এগুলো গজারী-মাজারী নামে পরিচিত। অত্যাচারী জ্বীন, পরী, দেওদানবদিগকে হযরত বায়েজীদ বোস্তামী (রহ.) তাঁর অলৌকিক শক্তি বলে উক্ত পুকুরে গজারী-মাজারীতে পরিণত করে আবদ্ধ করেন।
লেখক :সাংবাদিক