সংশোধিত এডিপি অনুমোদন ৬০ হাজার কোটি টাকার

৬০ হাজার কোটি টাকার সংশোধিত বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি (আরএডিপি) অনুমোদন করেছে জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদ এনইসি। এ পরিমাণ অর্থ গত অর্থবছরের তুলনায় ৭ হাজার ৬৩৪ কোটি টাকা বেশি। চলতি (২০১৩-১৪) অর্থবছরের শুরুতে এডিপি’র আকার ছিল ৬৫ হাজার ৮৭২ কোটি টাকা। প্রতিবছরের ন্যায় এবারও এটি সংশোধন করা হলো। বরাদ্দ সংশোধন নিয়ে অর্থ ও পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের মাঝে টানাপোড়েনের পর গতকাল প্রধানমন্ত্রীর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত এনইসি বৈঠকে বিষয়টি সুরাহা করা হলো। অর্থ মন্ত্রণালয় এটি সংশোধন করে ৫৫ হাজার কোটি টাকায় নামিয়ে সুপারিশ করলেও বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের চাহিদা অনুযায়ী আরো ৫ হাজার কোটি টাকা বাড়িয়ে আরএডিপি অনুমোদন হলো। গতকাল আগারগাঁওস্থ এনইসি সম্মেলন কক্ষে অনুষ্ঠিত সভা শেষে পরিকল্পনামন্ত্রী আহম মোস্তফা কামাল বৈঠকের বিভিন্ন দিক সাংবাদিকদের সামনে তুলে ধরেন। অর্থমন্ত্রণালয়ের সুপারিশের বাইরে ৫ হাজার কোটি টাকার সংস্থান কী ভাবে হবে এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, বরাদ্দের পুরোটাই সরকারি তহবিল থেকে দেয়া হবে, ফলে বাজেটের ঘাটতির আকার বৃদ্ধি পাবে। কিন্তু এর ফলে বাজেট ঘাটতি কোন ক্রমেই ৫ শতাংশের বেশি হবে না বলে তিনি উল্লেখ করেন। অন্যদিকে এ অর্থবছরে পদ্মা সেতু প্রকল্পে বরাদ্দে কোন কাটছাট হবে না বলে তিনি জানান। এসময় জানানো হয়, সংশোধিত এডিপিতে বরাদ্দসহ অন্তর্ভুক্ত মোট ১২৫৪টি প্রকল্পের মধ্যে ২০২টি নতুন প্রকল্প রয়েছে। সবমিলিয়ে ১০৪৯টি বিনিয়োগ প্রকল্প এবং ১৭৪টি কারিগরি সহায়তা প্রকল্প এবং ৩১টি জেডিসিএফ (জাপানের ঋণ মওকুফ তহবিল) অর্থায়িত প্রকল্প রয়েছে। নতুন অনুমোদিত ২০২টি প্রকল্পের মধ্যে বিনিয়োগ প্রকল্প ১৪৯টি। বাকী ৪৩টি’র মধ্যে ৪২টি কারিগরি সহায়তা প্রকল্প এবং একটি জেডিসিএফ অর্থায়িত প্রকল্প। এ বছরের সংশোধিত এডিপিতে বরাদ্দ বিহীনভাবে নতুন ৫৫৭টি প্রকল্প অনুমোদন দেয়া হয়। এছাড়া, সংশোধিত এডিপিতে বৈদেশিক সাহায্য প্রাপ্তির সুবিধার্থে বরাদ্দ ছাড়াই ৩০৪টি প্রকল্পেরও অনুমোদন দেয়া হয়েছে। সভায় চলতি অর্থ বছরে ২৩৬টি প্রকল্প সমাপ্ত হবে বলেও আশাবাদ ব্যক্ত করা হয়। সভার সিদ্ধান্ত হয় যে, কোন প্রকল্পের অর্থ ব্যয় না হলে কিংবা প্রকল্পের অর্থ সাশ্রয় হলে তা একই মন্ত্রণালয়ের অন্য প্রকল্পে পুনঃবরাদ্দ করতে পারবে পরিকল্পনা কমিশন। অন্যদিকে ধীর গতি সম্পন্ন প্রকল্প হতে বরাদ্দ হ্রাস করে দ্রুত বাস্তবায়নযোগ্য ও গতিসম্পন্ন প্রকল্পে প্রয়োজন অনুসারে বরাদ্দ প্রদান করা হবে। সভায় অর্থমন্ত্রী জানান, পদ্মা সেতুর টাকা অন্য খাতে ব্যবহার করা হবে না। এ খাতের টাকা অপরিবর্তিত থাকবে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা প্রকল্প বাস্তবায়ন যাতে সঠিক ও দ্রুততার সাথে হয় সেজন্য সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়কে নির্দেশ দেন। এ সময় তিনি যেসব প্রকল্প এ বছর শেষ করা সম্ভব তা আগামী বছরের জন্য রেখে না দেয়ার নির্দেশ দেন। বর্ধিত ৫ হাজার কোটি টাকার বরাদ্দ প্রসঙ্গে প্রধানমন্ত্রী বলেন, বাজেট ঘাটতি ৫ শতাংশ রেখেই এই বরাদ্দ দেয়া হচ্ছে। এতে প্রতিফলিত হয় আমাদের অর্থনৈতিক অবস্থা স্থিতিশীল। সংশোধিত এডিপিতে সরকারি-বেসরকারি অংশীদারিত্বের ভিত্তিতে (পিপিপি) ৪৬টি প্রকল্পকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। সভায় পরিকল্পনা কমিশনের কার্যক্রম বিভাগ জানিয়েছে, এবারের সংশোধিত এডিপি বরাদ্দের ক্ষেত্রে দারিদ্র্য বিমোচনের সাথে সরাসরি সংশ্লিষ্ট প্রকল্পগুলোকে অগ্রাধিকার দেয়া হয়েছে। এর অংশ হিসেবে কৃষি, কৃষিভিত্তিক শিল্প, বিদ্যুত্ উত্পাদন এবং ঘূর্ণিঝড় ও জলোচ্ছ্বাসের ক্ষয়ক্ষতি পুনর্বাসন সংক্রান্ত প্রকল্পে বরাদ্দ প্রদানে অগ্রাধিকার দেয়া হয়। প্রকল্প বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে সরকারি-বেসরকারি অংশীদারিত্বকে স্বাগত জানানো হয়। অঞ্চলভিত্তিক সুষম উন্নয়নের লক্ষ্যে এবারের সংশোধিত এডিপিতে বরাদ্দ প্রদান করা হয়। এছাড়াও, সভায় জানানো হয়েছে, এডিপি অর্থবছরের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির বাস্তবায়ন হার ৩৮ শতাংশ। প্রকৃত অর্থে প্রকল্পগুলো শেষ হওয়ার পরেও ঠিকাদারের পাওনা বাকী থাকায় সমাপ্ত হওয়া এই প্রকল্পগুলো বাস্তবায়ন হারের তথ্যে দেখানো হয় না বলে বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির বাস্তবায়ন হার কম মনে হয়। ‘আর কথা বলব না’ বরাদ্দ নিয়ে অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিতের সাথে টানাপোড়েনের বিষয়ে জানতে চাইলে পরিকল্পনামন্ত্রী আহম মোস্তফা কামাল সাংবাদিকদের বলেন ‘যথেষ্ট হয়েছে এবিষয়ে আর কথা বলবো না’। তার সাথে মতের অমিল হতেই পারে। দিনশেষে মিলে যাবে এটাই স্বাভাবিক। সমপ্রতি এডিপি সংশোধনে বরাদ্দ নিয়ে অর্থমন্ত্রীর সমালোচনা করেন পরিকল্পনামন্ত্রী। অর্থমন্ত্রী লিখিতভাবে জানিয়েছিলেন চলতি (২০১৩-১৪) অর্থবছরে রাজস্ব আদায়ের সম্ভাব্য ঘাটতি হবে ১১ হাজার কোটি টাকা। এছাড়া উন্নয়ন কার্যক্রমে প্রথম ৬ মাসের বাস্তবায়ন পূর্ববর্তী বছরের তুলনায় যথেষ্ট নিম্নমানের। বৈদেশিক প্রকল্প সাহায্যের ব্যবহারও তেমন আশানুরূপ নয়। কোন অবস্থায় সংশোধিত এডিপির আকার আর বাড়ানো সম্ভব নয়। এ সব বিবেচনায় চলতি অর্থবছরের সংশোধিত বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির (আরএডিপি) বরাদ্দ বিষয়ে পরিকল্পনামন্ত্রী আহম মোস্তফা কামালকে সহযোগিতা ও বাস্তবতা অনুধাবন করতে বলেছিলেন অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মহিত। এ বিষয়ে অর্থমন্ত্রীর বয়স, দক্ষতা নিয়ে সাংবাদিকদের সামনে অপ্রীতিকর বক্তব্য প্রদান করেন পরিকল্পনামন্ত্রী। সে বিষয়ে দৃষ্টি আকর্ষণ করলে তিনি আরো বলেন, আমাকে কথা বলতে সাবধান হতে হবে। আর কথা বলব না। প্রাইভেট বিষয় প্রাইভেটই থাক। মেহেরবাণী করে ব্যক্তিগত বিষয় বাদ দেবেন।