রাজধানীর অর্ধেক আবর্জনাই থেকে যায় রাস্তায়
প্রকাশ : ০৩ এপ্রিল ২০১৪, ২৩:১১
ময়লা-আবর্জনায় অতিষ্ঠ হয়ে উঠেছে রাজধানীবাসী। কারণ দৈনন্দিন বর্জ্যের প্রায় অর্ধেকটাই থেকে যায় রাস্তায়। ঢাকা যেন আবর্জনার শহরে পরিণত হয়েছে। নগরীর ব্যস্ততম রাস্তার ওপরে ডাস্টবিনসহ খোলা জায়গায় বর্জ্য পড়ে থাকে দীর্ঘ সময় ধরে। বাতাসে ভাসে ময়লার গন্ধ।
নগরবাসীর অভিযোগ, সিটি করপোরেশনের বর্জ্য ব্যবস্থাপনা কার্যক্রম ঢিলেঢালাভাবে চলায় এ পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। তবে করপোরেশন বলছে, এর জন্য দায়ী নগরবাসীর অসচেতনতা। অন্যদিকে বিশেষজ্ঞরা এ নিয়ে কেবল পরিসংখ্যান ও সম্ভাবনার কথা বলেই দায়িত্ব শেষ করছেন। ফলে এ বিষয়ে জনগণের অংশগ্রহণভিত্তিক সামাজিক আন্দোলন গড়ে উঠছে না।
ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের প্রধান বর্জ্য ব্যবস্থাপনা কর্মকর্তা ক্যাপ্টেন শেখ মোহাম্মদ জাভেদ ইকবাল বলেন, নগরবাসীর সচেতনতার অভাবে কিছু এলাকায় বর্জ্য অপসারণ কাজে খানিকটা সমস্যা হতে পারে। কোথাও দিনে বা রাতের নির্দিষ্ট কোন সময়ে ময়লা ফেলা হয় না। মানুষ যার যার সময় সুবিধামতো ময়লা ফেলে। পরিচ্ছন্নকর্মীরা সকালে বা রাতে ময়লা নিয়ে গেলে কিছু সময় পর আবার সেখানে ময়লার স্তূপ দেখা যায়। তবে গুরুত্ব বিবেচনায় নগরীর বেশ কিছু এলাকা থেকে দিনে ২-৩ বার ময়লা অপসারণ করা হয়; কিন্তু সব জায়গা থেকে দিনে একাধিকবার ময়লা অপসারণ সম্ভব হয় না। সেক্ষেত্রে কিছু এলাকায় কখনো ময়লা পড়ে থাকতে দেখা যেতে পারে।
সরেজমিনে গিয়ে পুরনো ঢাকার অলিগলি থেকে শুরু করে অভিজাত এলাকা গুলশান, বনানী, ধানমন্ডিসহ সর্বত্র বর্জ্য ব্যবস্থাপনার বেহাল দশা লক্ষ্য করা গেছে। আবাসিক এলাকার পাশাপাশি বাণিজ্যিক এলাকার রাস্তাগুলোতেও রয়েছে আবর্জনার স্তূপ। দেখা গেছে, রাজধানীর জুরাইন, যাত্রাবাড়ী, আজিমপুর, সদরঘাট, শ্যামবাজার, কাপ্তানবাজার, ধোলাই-খাল, দয়াগঞ্জ, বাসাবো, ফকিরাপুল, বেইলি রোড, রামপুরা, বাংলামটর, নিউমার্কেট, হাতিরপুল, কারওয়ান বাজার, নাখালপাড়া, মহাখালী, মিরপুর, টিকাটুলি, মুগদা, মানিকনগর, ওয়ারী, জুরাইন, পোস্তগোলা, শনির আখড়া, রায়েরবাগ ও মোহাম্মদপুর এলাকায় প্রতিদিনই আবর্জনার স্তূপ জমে থাকছে। চারদিকে ভয়াবহ দুর্গন্ধ ছড়াচ্ছে এসব ময়লা-আবর্জনা।
মোহাম্মদপুর কৃষি মার্কেট এলাকায় কথা হয় রোকেয়া খানম আলো নামের এক পথচারীর সঙ্গে। দুই স্কুল পড়ুয়া মেয়েকে নিয়ে বাসায় ফিরছিলেন। ক্ষোভের সঙ্গে বললেন, ‘এই এলাকায় নাক না চেপে হাঁটা প্রায় অসাধ্য। একদিন বা দুইদিন হলে মানা যায়। এখানে সব সময়ই এমন অবস্থা থাকে। বাচ্চারা বিকালে একটু খেলতে পারে না। রাস্তা দিয়ে হাঁটতে পারে না। এসব দেখার কি কেহ নাই?’
বিভিন্ন সংস্থার হিসাব অনুযায়ী, ঢাকায় প্রতিদিন ৫ থেকে ৬ হাজার মেট্রিক টন বর্জ্য উত্পাদন হয়। এছাড়া মেডিক্যালসহ ব্যবসায়ী প্রতিষ্ঠান থেকে ১ হাজার ৫০ এবং রাস্তাঘাট থেকে ৪শ মেট্রিক টন বর্জ্য উত্পাদন হয়। উত্পাদিত বর্জ্যের মধ্যে আছে প্লাস্টিক, কাগজ, নষ্ট শাক-সবজি ও ফলমূল, কাচ, ধাতু এবং জৈব বর্জ্য।
বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলনের সাধারণ সম্পাদক ডা. আবদুল মতিন বলেন, আমরা এক সময় দেখেছি, খুব ভোরে নগরীর রাস্তাঘাট পরিষ্কার করা হতো। এখন আর তা হয় না। দুপুর বেলা, কখনো কখনো স্কুল শুরু কিংবা ছুটির সময় পরিচ্ছন্নতার কাজ করে থাকে কর্মীরা। অনেক সময় ডাস্টবিনে ময়লা পড়ে থাকে দিনের পর দিন। দুর্গন্ধে কাছ দিয়ে যাওয়া যায় না। আর বৃষ্টির দিনে ময়লা-আবর্জনা পানির সাথে মিশে একাকার হয়ে যায়।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, রাজধানীতে দৈনিক উত্পাদিত কঠিন বর্জ্যের মধ্যে শতকরা ৬০ ভাগ উত্পাদন হয় শাক-সবজি ও ফলমূল থেকে। বাকি ৪০ ভাগ বিভিন্ন শিল্প প্রতিষ্ঠান ও হাসপাতাল-ক্লিনিকসহ বড়-ছোট শিল্প কারখানা থেকে। ঢাকা শহরে প্রায় ৭ হাজার বড় ও ২৪ হাজার ক্ষুদ্র শিল্প রয়েছে। আর সেখান থেকে প্রতিদিন প্রচুর পরিমাণে কঠিন ও তরল বর্জ্য উত্পন্ন হয়।
নগর পরিকল্পনাবিদ অধ্যাপক নজরুল ইসলাম জানান, নানা কারণে ঢাকায় ময়লা উত্পাদন বাড়ছে। বর্জ্যগুলো প্রক্রিয়াজাতকরণের উদ্যোগ নিলে এ বর্জ্যই সম্পদে পরিণত হতে পারত।
জানা গেছে, ঢাকায় সরকারি হাসপাতালগুলো ছাড়াও এক হাজার ২শ ছোট-বড় রেজিস্টার্ড প্রাইভেট হাসপাতাল, ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টার রয়েছে। এর বাইরেও রেজিস্ট্রেশনবিহীন পাঁচ শতাধিক প্রতিষ্ঠান নগরীতে চিকিত্সা সেবা দিচ্ছে। এসব প্রতিষ্ঠানও বর্জ্যের সঠিক ব্যবস্থাপনা মেনে চলছে না। চিকিত্সা বর্জ্য যেখানে সেখানে ফেলা হচ্ছে। এসব বর্জ্যের তালিকায় রয়েছে ব্যবহূত সুচ, সিরিঞ্জ, রক্ত ও পুঁজযুক্ত তুলা, গজ, ব্যান্ডেজ, মানব-প্রত্যঙ্গ, ওষুধের শিশি, ব্যবহূত স্যালাইন, রক্তের ব্যাগ এবং রাসায়নিক দ্রব্যসহ অন্যান্য চিকিত্সাজাত ময়লা-আবর্জনা।
এ বিষয়ে ডা. কামরুন নাহার বলেন, এসব আবর্জনা থেকে প্রাণঘাতী টাইফয়েডের মতো পানিবাহিত রোগ ছাড়াও হেপাটাইটিস বি, হেপাটাইটিস সি, যক্ষ্মা ও ডিপথেরিয়া হতে পারে।
সিটি করপোরেশনের হিসাবে মতে, ঢাকা নগরীতে স্থায়ী লোকসংখ্যা ৭০ লাখ। অস্থায়ী বাসিন্দা ও প্রতিদিন যাতায়াতকারী মানুষসহ নগরীর মোট জনসংখ্যা দেড় কোটির ওপরে। এ বিপুল পরিমাণ জনগণের বিপরীতে দুই সিটি করপোরেশনে পরিচ্ছন্নতা কর্মী আছে মাত্র ৭ হাজার ৫শ। এছাড়া নগরীতে ডাস্টবিন আছে ৬৪৭টি, কনটেইনার আছে প্রায় ৫শটি। ব্যক্তিগত ডাস্টবিন আছে দুই শতাধিক। সিটি করপোরেশনের খোলা ও আবদ্ধ মোট ৩৭০টি ট্রাক রয়েছে।
ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের প্রধান বর্জ্য ব্যবস্থাপনা কর্মকর্তা ক্যাপ্টেন বিপন কুমার সাহা বলেন, বর্জ্য নিয়ে মানুষের সচেতনতা আরো বাড়ানো দরকার। যেখানে-সেখানে ময়লা আবর্জনা ফেললে পরিবেশ নষ্ট হয়। তিনি নির্দিষ্ট ডাষ্টবিনে ময়লা ফেলার জন্য নগরবাসীর প্রতি অনুরোধ জানিয়েছেন।