[ অ র্থ নী তি ]

শনির বলয়ে বাংলাদেশের পুঁজিবাজার

বহু প্রত্যাশিত ডি-মিউচ্যুয়ালাইজেশন বাস্তবায়ন হওয়ার পর আশা করা গিয়েছিল যে, এ পদ্ধতির আওতায় বিশেষ করে দেশের দুই স্টক এক্সচেঞ্জের নতুন পরিচালনা পর্ষদ গঠিত হওয়ার পর পুঁজিবাজার সকল ধরনের প্রতিকূল অবস্থার প্রভাব থেকে মুক্ত হয়ে বিনিয়োগকারীদের আশা-আকাঙ্ক্ষার প্রতিফলন ঘটাতে সক্ষম হবে। ডি-মিউচ্যুয়ালাইজেশন পদ্ধতির মূল উদ্দেশ্য ছিল দুই স্টক এক্সচেঞ্জের মালিকানা ও ব্যবস্থাপনা পৃথক করে দিয়ে সম্পূর্ণ পেশাদারিত্বের ভিত্তিতে বাজারকে পরিচালনা করবে এই দুই স্টক এক্সচেঞ্জের ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষ। সেই লক্ষ্য সামনে রেখে দুটি বোর্ড ও গঠন করে সরকার। ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের চেয়ারম্যান পদে নির্বাচিত হন অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি সিদ্দিকুর রহমান মিয়া এবং চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জের চেয়ারম্যান পদে নির্বাচিত হন রাজস্ব বোর্ডের প্রাক্তন চেয়ারম্যান ড. মোহাম্মদ আব্দুল মজিদ। দুই স্টক এক্সচেঞ্জের পরিচালনা পর্ষদের অন্যান্য সদস্যরা ও সমাজের বিভিন্ন পেশার নন্দিত ও অভিজ্ঞতাসম্পন্ন গুণী ব্যক্তিবর্গ থেকে বাছাই করে নিয়োগ দেয়া হয়। স্বীকার করতেই হবে যে, দুই স্টক এক্সচেঞ্জের ডি-মিউচ্যুয়ালাইজেশনের সফল ও সার্থক বাস্তবায়নের পেছনে মাননীয় অর্থমন্ত্রী ও তাঁর মন্ত্রণালয়, বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ এন্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন এবং প্রধান দুই স্টক এক্সচেঞ্জ অত্যন্ত নিষ্ঠা ও একাগ্রতার সাথে একযোগে কাজ করার ফলে সকল ধরনের বাধা-বিপত্তি অতিক্রম করে মাত্র এক বছরের মধ্যে এই জটিল ও কঠিন কাজটি সম্পন্ন করতে সক্ষম হন। এ প্রসঙ্গে একটি কথা আমার ক্ষুদ্র জ্ঞানের আলোকে বলতে চাই যে, ডি-মিউচ্যুয়ালাইজেশন হয়ে গেলেই বাজারে নতুন প্রাণ সঞ্চারিত হবে, বাজার উজ্জীবিত হয়ে যাবে এমনটি মনে করার কোন সঙ্গত কারণ নেই। বাজারের আলো-আঁধারের খেলা, এর উত্থান-পতন এবং ছন্দ বিন্যাসের সাথে এ পদ্ধতির সরাসরি সম্পৃক্ততা খুবই কম। তবে নিঃসন্দেহে এটি বলা যায় যে, দুই স্টক এক্সচেঞ্জের কার্যপদ্ধতি, এদের কাজের সচ্ছতা ও জবাবদিহিতা এবং এই পদ্ধতির সুষ্ঠু বাস্তবায়নের মাধ্যমে বহু কথিত কনফ্লিক্ট অব ইন্টারেস্টের ব্যুহভেদ করে স্টক এক্সচেঞ্জ দুটি অনেক বেশি স্বাধীনভাবে কাজ করতে পারবে। ফলে এদের কাজের দক্ষতা, নেতৃত্বের বিকাশ ঘটিয়ে অপচয় রোধ ও সৃজনশীলতা সৃষ্টির পথ সুগম হবে। শুধু তাই-ই নয় পেশাদারিত্বের দিক থেকে আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক মানে দুই স্টক এক্সচেঞ্জকে গড়ে তোলাও অনেক সহজ হবে, যার সুফল পাবে পুরো পুঁজিবাজার ও সংস্থা দুটির শেয়ার হোল্ডার এবং বিনিয়োগকারীগণ। বলতে দ্বিধা নেই যে, এ কঠিন কাজটি সফলভাবে বাস্তবায়ন পুরোপুরিভাবে নির্ভর করবে সংস্থা দুটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও প্রধান নির্বাহীদের নেতৃত্বের উপর। এখানে বলে নেয়া ভালো যে, ডি-মিউচ্যুয়ালাইজেশন বাস্তবায়নের পর থেকেই দুটি স্টক এক্সচেঞ্জ, দুটি পৃথক কোম্পানিতে আত্মপ্রকাশ করেছে এবং ইতিপূর্বের অলাভজনক (মিউচ্যুয়ালাইজড)প্রতিষ্ঠান থেকে সম্পূর্ণ রূপে লাভ-লোকসানধারী ব্যবসায়ী প্রতিষ্ঠান হিসাবে শেয়ার হোল্ডারদের কাছে চিহ্নিত হবে। স্টক এক্সচেঞ্জ দুটির উপরোল্লিখিত মৌলিক পরিবর্তনের নিরীখে পুঁজিবাজারের সাথে সংশ্লিষ্ট রেগুলেটরি প্রতিষ্ঠান যেমন সিকিউরিটিজ এ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন, বাংলাদেশ ব্যাংক, অর্থমন্ত্রণালয় এবং জাতীয় রাজস্ব বোর্ড এই চারটি প্রতিষ্ঠানের মধ্যে যথাযথ সংযোগ ও সমন্বয় এই মুহূর্তে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। বিশেষ করে বাজারকে সুস্থ ধারায় পরিচালনা করার নিমিত্তে। আমার কাছে মনে হচ্ছে নিয়ন্ত্রক সংস্থা সিকিউরিটিজ এ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন এবং বাংলাদেশ ব্যাংকের মধ্যে পুঁজিবাজার সংশ্লিষ্ট বিষয়ে নীতি নির্ধারণের ক্ষেত্রে প্রয়োজনে একটি এম.ও.ইউ স্বাক্ষর হতে পারে এই মর্মে যে, যেহেতু পুঁজিবাজার ও অর্থবাজার খুবই স্পর্শ কাতর ও সংবেদনশীল খাত এবং যেহেতু অর্থনীতির বিভিন্ন ক্ষেত্রে এরা একে ওপরের পরিপূরক তাই বিশেষ করে পুঁজিবাজারের ক্ষেত্রে বাংলাদেশ ব্যাংকের কোন নীতিগত সিদ্ধান্তের অবশ্যই যেন বি.এস.ই.সি এর সাথে যৌথভাবে আলোচনা সাপেক্ষে করা হয়। আমার যতটুকু মনে পড়ে, বাংলাদেশ ব্যাংক ও পুঁজিবাজার নিয়ন্ত্রক সংস্থা বি.এস.ই.সি-এর মধ্যে এ ধরনের একটি প্রটোকল ইতিপূর্বে প্রচলিত ছিল। উদ্দেশ্য একটাই, যাতে বাংলাদেশ ব্যাংক ও বি.এস.ই.সি নিজ নিজ অবস্থানের দূরত্বের কারণে বাজার ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে এমন কোন সিদ্ধান্ত কেউ যেন না নিয়ে থাকেন। দুই প্রতিষ্ঠানের মধ্যে ঘনিষ্ঠতর যোগাযোগ রক্ষার জন্য প্রতিমাসে বাংলাদেশ ব্যাংকে সংস্থা দুটির উচ্চ পর্যায়ের কর্মকর্তাদের মধ্যে নিয়মিত একটি আলোচনা সভা হতো। বর্তমানে এই রেওয়াজ কতটুকু প্রচলিত আছে আমার জানা নেই। তবে যেকোন ক্ষেত্রে আলাপ-আলোচনা সমস্যা সমাধানের সবচেয়ে বড় হাতিয়ার বলে আমি মনে করি। এছাড়া এক তরফাভাবে যেকোন কর্তৃপক্ষের একক সিদ্ধান্ত অপর পক্ষকে ক্ষতিগ্রস্ত করতেই পারে। তাই বিভিন্ন ক্ষেত্রে আন্তঃসংস্থা ও আন্তঃমন্ত্রণালয়ের বৈঠক আজকাল একটা প্রচলিত রেওয়াজ হয়ে দাঁড়িয়েছে। কারণ এতে সংশ্লিষ্ট সকলের অংশীদারিত্ব ও অংশগ্রহণ বৃদ্ধি পায় এবং গৃহিত পদক্ষেপের কারণে অন্যের উপর নেতিবাচক প্রভাব পড়ার সম্ভাবনা হ্রাস পায়। ফলে গৃহীত পদক্ষেপসমূহে অনেক ক্ষেত্রে সমালোচনার সম্মুখীন হতে হয় না, যার দরুন কাজটির বাস্তবায়ন সহজতর হয়ে ওঠে। সম্প্রতি বাংলাদেশ ব্যাংক কর্তৃক জারিকৃত এক সার্কুলারে একটি ব্যাংকের সামষ্টিক ঋণ (কনসোলিডেটেড ঋণ) উহার সামষ্টিক ইকুইটি (ব্যাখ্যায়িত) এর ৫০ শতাংশের বেশি হতে পারবে না বলে উল্লেখ করা হয়েছে। স্বীকার করি পুঁজিবাজারে একটি ব্যাংকের সামষ্টিক ঋণ এক্সপোজার উহার ইকুইটির ৫০ শতাংশের অধিক হওয়া সমীচীন নয়। ব্যাংক কোম্পানী আইন ১৯৯১ এর ২৬(খ) ধারা সংশোধিত হয় জুলাই ২০১৩ সালে। বাংলাদেশ ব্যাংকের আলোচ্য সার্কুলার জারি হয় ২৫ ফেব্রুয়ারি ২০১৪ সালে। অর্থাত্ আইনটি পাস হওয়ার দীর্ঘ প্রায় আট মাস পর বিশেষ করে ৫ জানুয়ারি ২০১৪ এর জাতীয় নির্বাচনের পূর্ব থেকেই এবং অব্যবহিত পরে অর্থাত্ ডিসেম্বর ২০১৩ ও ফেব্রুয়ারি ২০১৪-এর মাঝামাঝি পর্যন্ত বাজার যখন ঘুরে দাঁড়াচ্ছিল সেই মুহূর্তে ২৫ ফেব্রুয়ারির সার্কুলার জারি হওয়ার পর থেকেই বাজারের মুখে যেন চুন পড়ে। এর তাত্ক্ষণিক ব্যবস্থা হিসাবে ব্যাংকগুলোর উপর বাংলাদেশ ব্যাংকের ব্যাপক নজরদারি কার্যকর করা হয়। পরিস্থিতি এমনই দাঁড়ায় যে বিভিন্ন ব্যাংক থেকে পুঁজিবাজার সংক্রান্ত যাবতীয় বিনিয়োগের তথ্য সংগ্রহ করে উহা দৈনিক ভিত্তিতে মনিটরিং শুরু করা হয়। এর ফলে ব্যাংকগুলোর মধ্যে এক ধরনের আতঙ্ক ও ব্যাপক নিষ্ক্রিয়তা লক্ষ্য করা যায়। শুধু তাই নয় ব্যাংকের পোর্টফলিও বিনিয়োগ খাতেও ধারণকৃত শেয়ারের মাত্রা হ্রাসকল্পে অনেকটা জোরাজুরি করে কোন কোন কোম্পানীর শেয়ার বিক্রি করতে বাধ্য করা হয় বলে অভিযোগ রয়েছে। এমনকি সংশ্লিষ্ট ব্যাংক পুঁজিবাজারে প্রচলিত নিটিং সুবিধার মাধ্যমে ধাপে ধাপে বিক্রি করে তাদের পোর্টফলিওতে বিনিয়োগ হ্রাস করতে চাইলেও উহা দেয়া হয়নি। অর্থাত্ বাজারে শুধু বিক্রির চাপ বৃদ্ধি পায়, ফলে বাজারে এর মারাত্মক নেতিবাচক প্রভাব পড়ে। এতে ক্রয়-বিক্রয়ের প্রচলিত ধারা হারিয়ে বাজার হয়ে ওঠে শুধুমাত্র বিক্রয়মুখী। এ প্রসঙ্গে বিশেষ করে উল্লেখ করতে চাই যে, বাংলাদেশ ব্যাংকের উক্ত সার্কুলারে ২১ জুলাই ২০১৬ এর মধ্যে আলোচ্য ঋণ এক্সপোজার নির্ধারিত মাত্রায় কমিয়ে আনার নির্দেশনা রয়েছে। সুতরাং দেখা যাচ্ছে যে, ২৫ ফেব্রুয়ারি ২০১৪ (সার্কুলার জারির তারিখ) থেকে ২১ জুলাই ২০১৬ অর্থাত্ দীর্ঘ দুই বছর চার মাস সময় ব্যাংকগুলোর হাতে আছে, বাড়তি ঋণ (যদি থাকে) সমন্বয়ের জন্য। সময়ের দিক দিয়ে বিবেচনা করলে স্বীকার করতেই হবে যে, ব্যাংক কোম্পানী আইনে নির্ধারিত তিন বছর সময় বা বাংলাদেশ ব্যাংকের সার্কুলার মোতাবেক দুই বছর চার মাস সময় পর্যাপ্ত বলে মনে করা যায়। কিন্তু বাংলাদেশ ব্যাংক যেভাবে ব্যাংকগুলোর উপর এক ধরনের বলপ্রয়োগ ও চাপাচাপি করে ঋণ সীমা কমিয়ে আনতে বাধ্য করছে তার পরিণাম বাজারের জন্য হয়ে গেছে এবরটিভ বা মিসক্যারেজ সমতুল্য। এক্ষেত্রে বিকল্প ব্যবস্থা হিসাবে বাংলাদেশ ব্যাংক, ব্যাংকগুলোর উপর তাদের ঋণের এক্সপোজার ত্রৈমাসিক ভিত্তিতে একটি নির্ধারিত হারে হ্রাস করার সীমা রেখা নির্ধারণ করে দিলে হয়তোবা বাজারের উপর এর নেতিবাচক প্রভাব কখনই এতোবেশি পড়ত না এই সুযোগটি এখনও আছে। দুর্যোগের সময় একজন দক্ষ বিমান পাইলটের পরিচয় পাওয়া যায় তিনি কিভাবে বিমানটিকে যাত্রীসহ ল্যান্ডিং করবেন। তার কাছে প্রধানত দুইটি পথ খোলা থাকে, এক ক্রাশ ল্যান্ডিং যা খুবই ঝুঁকিপূর্ণ। এ ধরনের ল্যান্ডিং এর ফলে বিমানটি মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়াসহ বিমানের সকল ক্রু এবং যাত্রীরা মারাত্মক হতাহতের ঝুঁকিসহ মৃত্যু ঝুঁকির সন্মুখীন হতে পারেন। দুই, সফট ল্যান্ডিং যা যথেষ্ট কম ঝুঁকিপূর্ণ। এ ধরনের ল্যান্ডিং-এর কারণে বিমানটিও কম ক্ষতিগ্রস্ত হয় এবং ক্রুসহ যাত্রীরা আহত হলেও মৃত্যু ঝুঁকি এড়াতে পারেন। আমার মনে হচ্ছে , বাংলাদেশ ব্যাংকের আলোচ্য সার্কুলার পুঁজিবাজারের উপর একটি ক্রাশ ল্যান্ডিং করানো হয়েছে। যে নির্ধারিত সময় এখনো আছে, তাতে সফট ল্যান্ডিং বা সফট এক্সিট এর পথ ব্যাংকগুলোর কাছে এখনও খোলা আছে। বলার অপেক্ষা রাখে না যে, ২০১০ সালের ডিসেম্বর মাসে বাংলাদেশ ব্যাংকের অনুরূপ একটি সার্কুলারের কারণে পুঁজিবাজারে কি ঘটেছিল তা সকলেরই জানা । লেখক : অর্থনীতি বিশ্লেষক E-mail:aquadirchoudhury@gmail.com