বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে নিয়োগ ও পদোন্নতি

বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থার ৯০%-এর বেশি বেসরকারি ব্যবস্থাপনায় পরিচালিত। শিক্ষক-কর্মচারীবৃন্দের মূল বেতনের ১০০% বহন ও প্রতিষ্ঠানের অবকাঠামো নির্মাণ রাষ্ট্রীয়ভাবে করা হয়। অথচ নিয়োগ-পদোন্নতিতে রাষ্ট্রীয় তদারকি প্রায় নেই। সেটা স্থানীয় কমিটির মাধ্যমে সম্পন্ন করা হয়। তাই শিক্ষার মান নিয়ে আলোচনায় নিয়োগ-পদোন্নতির বিষয়টিও স্থান পায়। মানসম্মত শিক্ষক পাবার জন্য ‘শিক্ষক নিবন্ধন সনদে’র মেয়াদ স্থায়ীকরণের ফলে শিক্ষক নিয়োগে প্রতিযোগিতা, প্রতিদ্বন্দ্বীতার বিস্তার ঘটেছে অতিমাত্রায়— যার সমাধান রাষ্ট্রীয় তদারকিতে নিয়োগ-পদোন্নতি। প্রাতিষ্ঠানিক পর্যায়ের নিয়োগ প্রক্রিয়ায় জাতীয় ও স্থানীয় অন্তত দুটি দৈনিক পত্রিকায় বিজ্ঞপ্তি দেওয়া বাধ্যতামূলক। ভাববার বিষয় এতে কী পরিমাণ অর্থ অপচয় হয়? এ অতিরিক্ত ব্যয়ের দায় গিয়ে বর্তায় চাকরিপ্রার্থীর ঘাড়ে, গুনতে হয় ব্যাংক ড্রাফটের ৫০০ বা ১০০০ টাকা! যথাযথ প্রচার বা অন্য বহু কারণেই এমন নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি অনেক প্রতিষ্ঠানকে দিতে হয় চার-পাঁচ বার। আবার মাদ্রাসার ক্ষেত্রে সারাদেশ তাকিয়ে থাকে সুদূরের ইসলামি বিশ্ববিদ্যালয়ের দিকে। বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের নিয়োগের জন্য ডিজি, বোর্ড, ইসলামি বিশ্ববিদ্যালয়, জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের বিশেষজ্ঞ প্রতিনিধির সমন্বয়ে প্রতিষ্ঠানপ্রধান কর্তৃক গঠিত হয় নিয়োগ কমিটি। এখানে বিশেষজ্ঞ প্রতিনিধির জন্য দৌড়াতে নষ্ট হয় শ্রম, সময় ও অর্থ। আবার কলেজ অধ্যক্ষ নিয়োগের বেলায় সব প্রক্রিয়ার পরও বাকি থাকে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃক ঐ নিয়োগ অনুমোদনের আনুষ্ঠানিকতার অপেক্ষা। ফলে বিলম্বিত নিয়োগ প্রক্রিয়ার এসব দৃশ্য-অদৃশ্য কারণে ক্ষতিগ্রস্ত হয় বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষক ও শিক্ষার্থীবৃন্দ। আবার একটি নিয়োগের তারিখ করতেই ক্ষেত্রভেদে বছর গড়ালেও অবাক হবার কিচ্ছু নেই। স্থানীয়ভাবে নিয়োগ প্রক্রিয়ায় আরো সমস্যা হলো—স্বজনপ্রীতি এবং সঙ্গে থাকে রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক বিষয়ের অনৈতিক অনুষঙ্গ। তাই রাষ্ট্রীয়ভাবে নিয়োগ-পদোন্নতির ব্যবস্থা করা গেলে যোগ্যতম প্রার্থীর নিয়োগ পাওয়া হবে সুনিশ্চিত এবং বহুলাংশে স্বচ্ছ। বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পদোন্নতি যেন এক সোনার হরিণ— যা ধরবার সৌভাগ্য ও সাহস সবার থাকে না বা হয় না। বিশেষত অধ্যক্ষ, উপাধ্যক্ষ, প্রধানশিক্ষক, সহকারী প্রধানশিক্ষক হতে চাইলে প্রার্থীকে নতুন করে চাকরি খুঁজতে হয় বছরের পর বছর পত্রিকার পাতায় পাতায়। তার জন্যও একই রকম ঝামেলার নিয়োগ প্রক্রিয়ার মুখোমুখি হয়ে শেষমেষ কাঙ্ক্ষিত পদটি পেলেও নানান দৃশ্য-অদৃশ্য ঝুঁকি ও বিড়ম্বনার হাতছানিতে থাকতে হয় অস্থির। কারণ অনেক ক্ষেত্রেই বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের প্রধান হয়ে ওঠেন অসহায় ও প্রভাবশালীদের কাছে জিম্মি এবং ক্ষেত্রভেদে অনেকেই তাকে ভাবতে শুরু করেন(?) অথর্ব, অক্ষম ও অযোগ্য! এজন্যই প্রতিষ্ঠানপ্রধানের পদগুলো পদোন্নতির মাধ্যমে পূরণের লক্ষ্যে জ্যেষ্ঠতাক্রমের একটি প্যানেল তৈরি করা প্রয়োজন যাতে স্বয়ংক্রিয়ভাবেই ঐপদগুলো পূরণ করা সম্ভব হয়। আবার প্রভাষক থেকে সহকারী অধ্যাপক পদায়নে অনুপাত নামক কালো আইনের কারণে অধিকাংশের পথচলা দুর্ভাগ্যের কাদায় আটকে আছে! অমানবিক অনুপাত প্রথার গ্যারাকলে আটকে থাকা পনের-বিশ বছর যারা ‘প্রভাষক’ নামের একই পদে থেকে জীবন-যৌবন হারিয়েছেন সঙ্গে চরম আর্থিক ক্ষতির শিকার হয়েছেন তাদেরকে জরুরিভিত্তিতে ‘সম্মানসূচক’ পদোন্নতি দেওয়া একটি মানবিক আবেদন। সঙ্গে এ অনুপাত প্রথাটি প্রাতিষ্ঠানিক না হয়ে জাতীয় পর্যায় ও বিষয়ভিত্তিক হলেও নিরুপায় মানুষগুলো কিছুটা আশার আলো দেখতে পেতেন। অধ্যক্ষ, উপাধ্যক্ষ, প্রধানশিক্ষক, সহকারী প্রধানশিক্ষকের মতো প্রশাসনিক পদের যোগ্যতা, বয়স ও অভিজ্ঞতা রাষ্ট্রীয় বিধিমালায় নির্ধারিত হলেও তা নতুন নিয়োগ প্রক্রিয়ার মাধ্যমে পূরণ করা হয়। অথচ এগুলো সহজেই পদোন্নতির মাধ্যমে পূরণ করা সম্ভব। সে ক্ষেত্রে রাষ্ট্রীয় বিধিবদ্ধ যোগ্যতা-অভিজ্ঞতার সঙ্গে সমন্বয় করে জ্যেষ্ঠতাক্রমের একটি প্যানেল তৈরি করা জরুরি। যেমন চাকরিতে ১৫-২০ বছরের অভিজ্ঞদের প্যানেল থেকে উপাধ্যক্ষ ও সহকারী প্রধানশিক্ষক, ২০-২৫ বছরের অভিজ্ঞদের প্যানেল থেকে অধ্যক্ষ ও প্রধানশিক্ষকের পদে যোগ্যদের ‘গুচ্ছ ভাণ্ডার’ তৈরি করা। এজন্য জাতীয় পোর্টাল, ব্যানবেইস, শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের তথ্য বাতায়ন সহায়ক ভূমিকা রাখতে পারে। এক্ষেত্রে প্রাতিষ্ঠানিক পর্যায় থেকেও তথ্য চাওয়া যেতে পারে। প্রয়োজনে কর্মরত ও সাধারণের জন্য আনুপাতিক বা উন্মুক্ত কোটা ঘোষিত হতে পারে। সঙ্গে প্রার্থীর পছন্দের জেলার অগ্রাধিকারক্রম আগেভাগেই তৈরি করাও সম্ভব। বছরে দু’তিন বার ‘এন. টি. আর. সি. এ’ পত্রিকায় বিজ্ঞপ্তি দিয়ে বিষয়টি সমন্বয় করতে পারে সহজে। বর্তমান তথ্যপ্রযুক্তির যুগে রাষ্ট্রীয়ভাবে নিয়োগ-পদোন্নতির ক্ষেত্রে কর্তৃপক্ষ কোন পদ কখন খালি হচ্ছে তা জানেন, তেমনি কোন প্রতিষ্ঠানের কী চাহিদা বেশিরভাগ ক্ষেত্রে তা কর্তৃপক্ষকে আগাম অবহিত করা সম্ভব। যদি কর্তৃপক্ষ এগুলো বিবেচনায় নিয়ে নিবন্ধনধারী ও বিধিবদ্ধ যোগ্যতা সম্পন্নদের মধ্য থেকে শিক্ষক ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের প্রশাসনিক পদগুলোর নিয়োগ-পদোন্নতির বিষয়টি রাষ্ট্রীয়ভাবে তদারকি করেন তবে শ্রম, সময়, অর্থ ব্যয়ের অভিযোগ, সমন্বয়হীনতা ও শূন্যতা বহুলাংশে কমে আসবে এবং শিক্ষার গুণগত মান বৃদ্ধি পাবে। গাজীপুর