সংকটের মুখে আবাসন খাত

দু’-তিন দশক আগেও শহুরে মধ্যবিত্তের বিশেষ করে নির্দিষ্ট আয়ের মানুষের সারা জীবনের স্বপ্ন কেন্দ্রীভূত হতো একটি বাড়ি করার মধ্যে। কিন্তু সময় ও বাস্তবতার প্রেক্ষাপটে তা বদল হয়েছে। এখন তাদের স্বপ্ন একটি ফ্ল্যাট বা সামান্য এক টুকরো জমি। মাথা গোঁজার ঠাঁই বলে কথা। আগে দীর্ঘদিনের বিরতির পর পরিচিত কারও সঙ্গে দেখা হলে কুশলাদির সঙ্গে জিজ্ঞেস করা হতো, বাড়ি কোথায় করেছেন? এখন তা এসে ঠেকেছে ফ্ল্যাটে, কয়েকজন মিলে এক টুকরো জমি কেনার মধ্যে। জনসংখ্যা বৃদ্ধির সঙ্গে সামাজিক, অর্থনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন হওয়াটা স্বাভাবিক। স্বাধীনতা উত্তরকালে বাংলাদেশে এমন পরিবর্তন দ্রুতই হয়েছে ও হচ্ছে। ব্যাপক চাহিদা সৃষ্টি হওয়ায় আবাসন ব্যবসায় অনেকে এগিয়ে আসেন। ব্যবসা হচ্ছিল ভালোই। সচল পুঁজি বাজার খুঁজবে—এটাই পুঁজির ধর্ম। বাংলাদেশে বিনিয়োগের নতুন ক্ষেত্র তৈরি হলো আবাসনশিল্পে। শুধু বেসরকারি উদ্যোগে পরিচালিত গৃহায়ণশিল্প বাংলাদেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিতে প্রায় ১৫ শতাংশ অবদান রাখছে। বিদেশি বিনিয়োগকারীদের আকৃষ্ট ও রেমিট্যান্স প্রবাহ বৃদ্ধিতেও কার্যকর ভূমিকা রাখছে এ খাত। তাছাড়া ২০০টিরও বেশি ব্যাকওয়ার্ড লিঙ্কেজ শিল্প বিকাশেও এ শিল্পের গুরুত্বপূর্ণ অবদান রয়েছে। লিঙ্কেজ শিল্পসহ আবাসনখাতে প্রায় ৫০ লাখ দক্ষ শ্রমিক জড়িত। কিন্তু নানামুখী সমস্যায় পড়ে এ শিল্পে স্থবিরতা নেমে আসার আশঙ্কায় রয়েছেন সংশ্লিষ্টরা। বিগত তিন বছরের চেয়ে বর্তমানে ২৫ শতাংশ কম দামে ফ্ল্যাট বিক্রি করা হচ্ছে। ক্রেতাচাহিদাও দিন দিন কমে আসছে। সত্তর হাজার কোটি টাকার বিনিয়োগ সংবলিত দেশের আবাসনখাত এখনো গভীর সংকটের মুখে। এ খাতের বিকাশে উদ্যোক্তারা সরকারের নীতি সহায়তার ওপর গুরুত্বারোপ করেছেন। আবাসনখাতে গ্যাস বিদ্যুত্ সংযোগের পাশাপাশি অপ্রদর্শিত অর্থ বিনিয়োগের সুযোগ অব্যাহত রাখারও দাবি জানিয়েছেন তারা। আবাসনখাত এ মুহূর্তে দেশের একটি শীর্ষ খাত। প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ ভাবে লাখ লাখ মানুষের ভাগ্য জড়িত হয়ে পড়েছে এ খাতের সঙ্গে। শহরাঞ্চলে ক্রমবর্ধমান জনগোষ্ঠীর আবাসন চাহিদা পূরণে আবাসনখাতের অবদানও অনস্বীকার্য। একদিকে রাজনৈতিক অস্থিরতা ও অন্যদিকে বিদ্যুত্ এবং গ্যাস সংযোগ বন্ধ থাকায় জাতীয় অর্থনীতির এই গুরুত্বপূর্ণ খাতটি মন্দার সম্মুখীন হয়েছিল। রাজনৈতিক অস্থিরতার অবসান হওয়ায় এবং গ্যাস ও বিদ্যুত্ সরবরাহে সরকার ইতিবাচক পদক্ষেপ নেওয়ায় সে সংকট কাটতে শুরু করেছে। আবাসন মালিকদের বিপুলসংখ্যক ফ্ল্যাট অবিক্রীত থাকায় ক্রেতারাও এ সময় মোটামুটিভাবে স্বল্পমূল্যে ফ্ল্যাট কেনার সুযোগ পাচ্ছেন। তবে এ খাতের বিকাশে ক্রেতারা যাতে সহজে ফ্ল্যাট কিনতে পারেন সে সুযোগেরও ব্যবস্থা করা দরকার। বাংলাদেশ ব্যাংকের মুদ্রানীতিতে আবাসনখাতকে উত্পাদনশীল খাতের মর্যাদা দিয়ে ঋণ বিতরণের বাধা দূর করা এবং ক্রেতাদের জন্য বাংলাদেশ ব্যাংকের ব্যবস্থাপনায় আলাদা পুনঃঅর্থায়ন তহবিল গঠনের প্রস্তাব এসেছে আবাসন খাতে উদ্যোক্তাদের পক্ষ থেকে। একটি সম্ভাবনাময় এবং বিকাশমান শিল্পের স্বার্থেই শুধু নয়, অর্থনীতিতে বড় অবদান রাখায় দেশের স্বার্থেই এই শিল্পকে সমস্যামুক্ত করা জরুরি। এই শিল্পে ব্যাপক কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হওয়ার এ বিষয়টিকেও গুরুত্বসহকারে বিবেচনায় রাখতে হবে। আবাসনখাতের বিভিন্ন সমস্যার কথা উল্লেখ করে এর সমাধানের উদ্যোগ নিতে বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নরের কাছে চিঠি লিখেছেন অর্থমন্ত্রী। তিনি রাজনৈতিক পরিস্থিতি ও অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তাকে এ খাতের সংকটের জন্য বিশেষভাবে দায়ী করেছেন। আবাসনখাতে ঋণপ্রবাহ ও ফ্ল্যাট বা প্লট বিক্রিতে সহযোগিতার প্রাসঙ্গিকতাও স্বীকার করা হয়েছে ওই চিঠিতে। আবাসনখাতের সমস্যা সমাধানে সরকার যে সত্যিকারভাবেই আন্তরিক তারও প্রমাণ মিলেছে অর্থমন্ত্রীর ভাষ্যে বাসস্থান মানুষের একটি মৌলিক চাহিদা। নাগরিকদের মৌলিক অধিকার পূরণ তথা মাথা গোঁজার ঠাঁই নিশ্চিত করতে সহজে প্লট বা ফ্ল্যাট কেনার সুযোগ সৃষ্টির কথা ভাবতে হবে। কম সুদে ফ্ল্যাট কেনার সুবিধা নিশ্চিত করতে আবাসনশিল্পের উদ্যোক্তারা বাংলাদেশ ব্যাংকের ব্যবস্থাপনায় পুনঃঅর্থায়ন তহবিল প্রতিষ্ঠার যে প্রস্তাব করেছেন, তা তাত্পর্যের দাবিদার। এ ধরনের উদ্যোগ আবাসন সমস্যার সমাধানে যেমন ভূমিকা রাখবে তেমন নাগরিকদের মৌলিক চাহিদা পূরণের ক্ষেত্রে অবদান রাখবে বলে আশা করা যায়। ঢাকা