ইলেকট্রিক্যাল ও ইলেকট্রনিক্স শিল্প
অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের অপার সম্ভাবনার খাত
রাবেয়া বেবী ও বারেক কায়সার
প্রকাশ : ০৪ এপ্রিল ২০১৪, ২২:৫৫
উদ্যোক্তাদের দাবি, দেশে ব্যবহূত ইলেকট্রিক্যাল ও ইলেকট্রনিক্স পণ্যের ৯০ ভাগই দেশে তৈরি হচ্ছে
এই শিল্পে কর্মরত শ্রমিকদের উল্লেখযোগ্য সংখ্যক নারী
শিল্পটির বিকাশে প্রয়োজন মান নিয়ন্ত্রণ ল্যাবরেটরি
অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড তথা কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টির ক্ষেত্রে অপার সম্ভাবনার খাত হিসাবে বাংলাদেশে স্থান করে নিচ্ছে ইলেক্ট্রিক্যাল ও ইলেক্ট্রনিক্স শিল্প। অভ্যন্তরীণ চাহিদা মিটিয়ে বর্তমানে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে রপ্তানিও হচ্ছে দেশে তৈরি ইলেক্ট্রনিক্স ও ইলেক্ট্রিক্যাল সামগ্রী। এই শিল্পের একটি ইতিবাচক দিক হলো, এখানে কর্মরত শ্রমিকদের উল্লেখযোগ্য অংশ নারী।
তবে সংশ্লিষ্টদের মতে, নিম্নমানের বিদেশি পণ্য আমদানি ও মান নির্ণয়ের প্রয়োজনীয় ব্যবস্থার অভাবে উত্পাদন ক্ষমতার তুলনায় অনেক কম পরিমাণেই ইলেক্ট্রনিক্স ও ইলেক্ট্রিক্যাল সামগ্রী দেশ থেকে রপ্তানি হয়ে থাকে। তাদের মতে, বিদ্যমান সীমাবদ্ধতাগুলো কাটিয়ে উঠতে পারলে বিশ্ব বাজারে তৈরি পোশাক খাতের মতো এই খাতও বড় জায়গা করে নেবে বলে মনে করেছেন সংশ্লিষ্ট উদ্যোক্তারা।
বাংলাদেশ ইলেক্ট্রিক্যাল মার্চেন্ডাইজ ম্যানুফ্যাকচারার্স এসোসিয়েশন (বেমা) সভাপতি এনায়েত হোসেন চৌধুরী বলেন, দেশে ইলেক্ট্রিক্যাল লাইট, ফ্যান, সুইচ, সকেট, প্লাগ, বোর্ড, ক্যাবল, ইলেক্ট্রিক্যাল ট্রান্সফরমার, টিভি, ফ্রিজসহ অসংখ্য পণ্য তৈরি হচ্ছে। তিনি বলেন, স্বাধীনতার পর দেশে এই শিল্প একটু একটু করে যাত্রা শুরু করে। আজ এই শিল্প নিজের জায়গা অনেকটাই পাকাপোক্ত করেছে। তিনি দাবি করেন, দেশে ব্যবহূত ইলেক্ট্রনিক্স ও ইলেক্ট্রিক্যাল সামগ্রীর প্রায় ৯০ ভাগ এখন দেশেই তৈরি হচ্ছে। অবশ্য বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের তড়িত্ কৌশল বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক এস এম মাহবুবুর রহমান বলেন, দেশে মোট চাহিদার ৩০ ভাগ বৈদ্যুতিক সরঞ্জাম তৈরি হচ্ছে। বেশকিছু পণ্য আফ্রিকা ও আরব দেশসমূহে রপ্তানি করা হচ্ছে। এসব দেশে আমাদের পণ্যের ব্যাপক চাহিদা আছে। তিনি বলেন, তবে এই খাতে আমাদের দেশে দক্ষ শ্রমিকের অভাব রয়েছে।
এই শিল্পের পথচলা ও বর্তমান অবস্থা
১৯৮০ সালের আগে আমাদের দেশে ইলেক্ট্রনিক্স যন্ত্রাংশ আমদানি করা হতো। বর্তমানে দেশে ৭ শতাধিক ইলেক্ট্রিক্যাল ও ইলেক্ট্রনিক্স কারখানা আছে। ২০০০ সাল থেকে দেশি প্রতিষ্ঠানগুলো ইলেক্ট্রিক্যাল ও ইলেক্ট্রনিক্স পণ্য উত্পাদন করছে এবং বিদেশেও রপ্তানি করছে।
এই শিল্পের নানা দিক নিয়ে কথা হয় বাংলাদেশ ইলেক্ট্রিক্যাল মার্চেন্ডাইজ ম্যানুফ্যাকচারাইজ এসোসিয়েশনের (বেমা) সভাপতি এনায়েত হোসেন চৌধুরীর সঙ্গে। তিনি বলেন, ক্ষুদ্র ও মাঝারি ধরনের প্রায় দুই হাজারের মতো শিল্প-কারখানা দেশে রয়েছে। এর মধ্যে বেমার আওতাধীন রয়েছে ৭৫০টি শিল্প-কারখানা। বেমা ছাড়াও বেশকিছু সংগঠনের আওতাধীন শিল্প-কারখানা রয়েছে। তিনি বলেন, দেশে বছরে প্রায় ২০ হাজার কোটি টাকার বৈদ্যুতিক সরঞ্জামের চাহিদা রয়েছে। তার মধ্যে ১৫ থেকে ১৬ হাজার কোটি টাকার পণ্য দেশেই তৈরি হচ্ছে। এসব শিল্প-কারখানায় ৩ লক্ষাধিক শ্রমিক কর্মরত আছে। এর মধ্যে ২০ হাজারের অধিক নারী শ্রমিক।
দক্ষতা অর্জনে প্রশিক্ষণ
এই শিল্পে দক্ষ শ্রমিক সরবরাহের প্রধান দায়িত্ব পালন করে বেসরকারি সংস্থা ইউসেপ। ১৯৭২ সাল থেকে রোজগারি শিশুর শিক্ষা ও কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে কাজ করে এই প্রতিষ্ঠান। তাদের দেয়া ২৬টি বিষয়ে প্রশিক্ষণের একটি হলো ইলেকট্রিক্যাল এন্ড ইলেকট্রনিক্স। বর্তমানে তাদের ৮টি কারিগরি প্রশিক্ষণ কেন্দ্র ও ৫৩টি ভোকেশনাল স্কুলে ৪৮ হাজার সুবিধাবঞ্চিত শিশু প্রশিক্ষণ নিচ্ছে। গত দশ বছরে ইউসেপ ২ হাজার ১৪২ জন দক্ষ শ্রমিক সরবরাহ করে। যা চাহিদার তুলনায় খুবই কম। ইউসেপ ছাড়াও এসওএস (কুড়িয়ে পাওয়া শিশুদের সংগঠন)সহ বর্তমানে হাতেগোনা কয়েকটি বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা এই বিষয়ে প্রশিক্ষণ দিচ্ছে। এই খাতে গত বছর ইউসেপ থেকে ২৭৮ জন কর্মীর চাকরি হয়, যার মধ্যে ২৫৬ জনই নারী।
ইউসেপের নির্বাহী পরিচালক জাকির হাসান বলেন, নারীরা ধৈর্যশীল, একাগ্রচিত্তে কাজ করতে পারে বলে এ কাজে তারা অল্প সময়ে দক্ষতা অর্জন করতে পারে। তাই শিল্প কারখানাগুলোতে নারী শ্রমিকের চাহিদা বেশি। চাহিদা মোতাবেক আমরা শ্রমিক দিতে পারছি না। এই কাজে প্রশিক্ষিত একজন নারী ৬ হাজার টাকার অধিক বেতনে কাজে যোগদান করতে পারে। অভিজ্ঞতা অর্জনের সাথে সাথে তাদের শিক্ষার্থীদের শ্রমিকসহ সুপার ভাইজার, কোয়ালিটি কন্ট্রোলারের দায়িত্বে আছেন অনেকেই। যারা ২০ হাজার টাকার অধিক বেতনে চাকরি করছে বলে জানান তিনি।
নারী শ্রমিকদের যত অভিযোগ-অনুযোগ
সরজমিনে রাজধানী ও তার আশপাশ এলাকায় অবস্থিত ইলেকট্রনিক্স ও ইলেকট্রিক্যাল সামগ্রী তৈরির বেশ কিছু কারখানা ঘুরে জানা গেল নারী শ্রমিকদের বেশ কিছু অভিযোগ-অনুযোগের কথা। বেশিরভাগ প্রতিষ্ঠানেই নারী শ্রমিকদের শিশু সন্তানদের লালন-পালনের জন্য নেই ডে-কেয়ার সেন্টার। অনেক প্রতিষ্ঠান ভালো বেতন দিলেও অনেক প্রতিষ্ঠান শ্রমিকদের ন্যায্য পারিশ্রমিক দেয় না। অনেকক্ষেত্রেই তাদের কর্মস্থলে যাতায়াতের জন্য পরিবহনের পৃথক ব্যবস্থা নেই। বেশ কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের নারী শ্রমিকরা অভিযোগ করেন, বেতন ছাড়াই তাদের মাতৃত্বকালীন ছুটি দেয়া হয়।
এসব বিষয়ে ওইসব প্রতিষ্ঠানের মানবসম্পদ কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বললে তারা বলেন, সব বিষয় বিবেচনা করে পর্যায়ক্রমে সব সুবিধার ব্যবস্থা করার সিদ্ধান্ত আছে। কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের দায়িত্বশীল কর্মকর্তারা দাবি করেন, তারা বেতনসহ মাতৃত্বকালীন ছুটি, ডে কেয়ার সেন্টার ও নারীবান্ধব পরিবেশ সৃষ্টির বিষয়ে জোর দিয়ে থাকেন।
প্রয়োজন মান নিয়ন্ত্রণ ল্যাবরেটরি
আমাদের সবার আগে একটি মান নিয়ন্ত্রণের ল্যাবরেটরি প্রয়োজন বলে মনে করেন বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের তড়িত্ কৌশল বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক এস এম মাহবুবুর রহমান। তিনি বলেন, পরীক্ষাগারের অভাবে আমরা নিম্নমানের যে বিদেশি পণ্য ৮০ টাকা দিয়ে কিনি তা এক বছর ব্যবহার করা যায়। অথচ আমাদের পণ্যের দাম ১০০ টাকা এবং তা তিন বছর চলে। কিন্তু মান নিশ্চিত না হয়ে কেনা-বেচা যায় না। আর এক্ষেত্রে দক্ষ শ্রমিক তৈরি করার জন্য সরকারি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানকে এগিয়ে আসতে হবে বলেও তিনি উল্লেখ করেন। দেশে বেশ কিছু প্রতিষ্ঠান ক্ষুদ্র থেকে মাঝারি আর মাঝারি থেকে বৃহত্ শিল্পে রূপান্তর হচ্ছে। তবে শ্রম আইন মেনে চললে এই খাতে শ্রমিকের স্বার্থও রক্ষা হবে বলে মন্তব্য করেন তিনি।