অবসর মানেই অন্য রকম ব্যস্ততা

অবসরে যাবার পর এখন আমি আনন্দেই আছি। এখন চাকরি জীবনের সেই চাপগুলো আর নেই। সবধরনের চাকরিতেই একটি চাপ থাকে। অবসরে যাবার আগে যে শূন্যতা, একাকিত্বের ভীতি ছিল, তা নিরর্থক। এখনও আমি আমার সেই ছাত্রীদের হারাইনি। এখন আমি নিজেই ছাত্রী। বিভিন্ন সংগঠনের সাথে যুক্ত রয়েছি। আমার অবসর জীবনে নাতি-নাতনীরাই সবচেয়ে বড় সঙ্গী সকালবেলা ঘুম থেকে উঠেই বুকটা কেমন যেন ফাঁকা ফাঁকা লাগছে। গত এক বছর ধরে এই দিনটির জন্য অপেক্ষা করছি, নিজের মনকে প্রস্তুত করেছি, তারপরও পঁয়ত্রিশ বছরের অভ্যাস। যতই বোঝাই মনকে, মন কি বুঝতে চায়? গতদিনও কলেজের বারান্দায় দাঁড়িয়ে ভাবছিলাম এই বারান্দায় আর আসা হবে না। তরুণীদের প্রাণচঞ্চল জীবনের স্বত:স্ফূর্ততাকে আর উপলব্ধি করা হবে না ভেবে খুব একা লাগছিল, কারণ আমার ছাত্রীরাই ছিল আমার সবচেয়ে কাছের বন্ধু। বলছিলেন ইউনিভার্সিটি উইমেন্স ফেডারেশন কলেজের প্রাক্তন শিক্ষিকা মমতাজ বেগম। বর্তমান অবস্থার প্রেক্ষাপটে তিনি বলেন, অবসরে যাবার পর এখন আমি আনন্দেই আছি। এখন চাকরি জীবনের সেই চাপগুলো আর নেই। সবধরনের চাকরিতেই একটি চাপ থাকে। অবসরে যাবার আগে যে শূন্যতা, একাকিত্বের ভীতি ছিল, তা নিরর্থক। এখনও আমি আমার সেই ছাত্রীদের হারাইনি। এখন আমি নিজেই ছাত্রী। বিভিন্ন সংগঠনের সাথে যুক্ত রয়েছি। আমার অবসর জীবনে নাতি-নাতনীরাই সবচেয়ে বড় সঙ্গী। ওদের স্কুলে আনা-নেয়া করতে গিয়ে আমি লাইব্রেরীতে বসে থাকি। তখন আমার ছাত্রীদের সাথে দেখা হয়। ওরাও আসে ওদের ছেলে-মেয়েদের নিয়ে। শিক্ষিকা থেকে এখন ওদের আড্ডার বন্ধু হয়ে গেছি। নিজের সেই শিক্ষাজীবনকে আবার ফিরে পেয়েছি। নাতনীর বয়স যত, আমার বয়সও ততই অনুভব করছি। তাই বয়স না বেড়ে দিন দিন কমছে। গল্পের বই আমার জীবনের দ্বিতীয় সঙ্গী। তবু ছাত্রীদের পড়ানোর আনন্দ, প্রতি বছর নতুনভাবে গল্প-কবিতাগুলোর অর্থ বিশ্লেষণ করার স্মৃতিগুলোকে মনে করে মন খারাপ লাগে। সে সময় সবচেয়ে ছোট তিন বছরের ছাত্রী নাতনীটি আমার সব বেদনাকে ভুলিয়ে দেয়। ছাত্রজীবনের পর চাকরি জীবনের অধ্যায়ের সূচনা যেমন এক কঠিন পরীক্ষা তেমনি দীর্ঘ চাকরি জীবনের অধ্যায় সমাপ্ত করে অবসর জীবনের শুরু করাও খুবই কঠিন। অনেক সময় দেখা যায়, শুধু মানসিকভাবে নয়, এ সময় শারীরিকভাবেও মানুষ ভেঙ্গে পড়ে। জীবনের এ অধ্যায়ের ভয়ে অবসরে যাবার আগেই অসুস্থ হয়ে পড়ে। তবে জীবনের এ অধ্যায়ে নানা কিছু করার রয়েছে। বিভিন্ন সংগঠন, কাজকর্ম, পরিবারের সঙ্গ মনকে অবসরে সতেজ রাখতে সাহায্য করে। এ প্রসঙ্গে এবি ব্যাংকের প্রাক্তন ব্যাংকার মিসেস রিনা আক্তার বলছিলেন, ব্যাংকের চাকরির ক্ষেত্রে বাড়ির সময়ের তুলনায় অফিসেই একজন ব্যাংকারকে বেশি সময় কাটাতে হয়। যা চাকরি জীবনে এক বিরক্তির সূচনা করলেও অবসরে সেই জীবনের জন্যই বুকটা কাঁদে। অবসর জীবনে সারাদিন কোন কাজ ছাড়া বাসায় টিভি দেখে কাটাতে হবে— এ কথা মনে করে টিভি দেখার প্রতিও খুব তাড়াতাড়ি এক বিরক্তি এসে পড়ল। আমাদের সমাজ এরকম যে, যতদিন চাকরি আছে ততদিন সম্মান আছে, শ্রদ্ধা আছে। চাকরি জীবনের সমাপ্তির পর সেই মানুষগুলোর চেহারাই রাতারাতি পাল্টে যায়। তাদের সেই বিরক্তি আর অশ্রদ্ধার ভঙ্গি দেখে মানুষগুলোর প্রকৃত চেহারা সামনে স্পষ্ট দেখতে পাই। সমাজের প্রতি পদে ধাক্কা খেতে হয়। এ সময় আমি আমার স্কুল-কলেজের বন্ধুদের সাথে দেখা করা শুরু করি। ছোটবেলায় আমরা পাড়ায় এক সংগঠন করতাম। আমরা বিভিন্ন অনুষ্ঠানে গান গাইতাম। সেই দলকে আমি জীবনের শেষ অধ্যায়ে যেন আবার খুঁজে পেলাম। অবসর জীবনের বিষণ্নতা কাটিয়ে উঠে ছোটবেলার সেই মধুর সময়ে ফিরে গেলাম। আমি মনে করি, অবসর জীবনে বিষণ্ন হবার কিছু নেই। ছোটবেলার জীবন, শিক্ষাজীবনের আবার সূচনা করার এটাই শ্রেষ্ঠ সময়। আমি এমন অনেককেও দেখেছি যে, ছাত্রজীবনে তার সখ ছিল ইতিহাসে পড়বে, কিন্তু তার স্বপ্ন সত্য হয়নি, তাকে পড়তে হয়েছে বিবিএ। চাকরি জীবন শেষে সে আবার তার স্বপ্নের বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়া শুরু করেছে। তাই আমি মনে করি, সব অসমাপ্ত স্বপ্ন পূর্ণ করার এটাই প্রকৃত সময়। অবসর জীবনকে কেন্দ্র করে মানুষের মনে এক ধরনের উদ্বেগ থাকে, সে সময়ের একাকিত্বকে ঘিরে নানা ভয়-সে প্রসঙ্গে জানতে চাচ্ছিলাম রুমা আক্তারের কাছে। রুমা আক্তার বলেন, আমার অবসর জীবনের প্রায় দশ বছর হতে চলল। আমার চাকরি জীবন ব্র্যাকে। চাকরি জীবনে আমার চেনা অনেককেই অবসরে যেতে দেখেছি। চাকরি করার সময় আমরা অনেককেই ফেয়ারওয়েল দিয়েছি। সেই দিনটিতে আমাদের যেমন কষ্ট হত একজন স্যার বা ম্যাডামকে হারিয়ে তেমনি কষ্ট হত। কিন্তু চাকরি জীবন শেষে এই দীর্ঘ দশ বছরে উপলব্ধি করেছি চাকরি জীবনের চেয়ে অবসর জীবন কোন অংশে কম আকর্ষণীয় নয়। আমি একটি সাহিত্য সংগঠনের সাথে যুক্ত আছি। এছাড়াও আমরা পাড়ায় যারা অবসর জীবন কাটাচ্ছি তারা সবাই মিলে একটি লাইব্রেরী খুলেছি। এলাকার অনেক ছেলে-মেয়েই তার সদস্য। পাঠাগারে আমার সমবয়সীদের সাথে জমিয়ে আড্ডা হয়। একইসাথে চলে বই পড়া। আমাদের আড্ডার অংশ হয় পাড়ার কিশোর-কিশোরীরাও। এভাবে গল্প-আড্ডায় কোন ধরাবাঁধা নিয়মের বাইরে হেসে খেলে স্বাধীনভাবে জীবনটি কাটাচ্ছি। কৃতজ্ঞতা: লায়লা হাসান ছবি: মোহাম্মদ জাহাঙ্গীর