চট্টগ্রামের বনেদি ব্যবসায়ী ও খাতুনগঞ্জের একাধিপত্য নেই

ভোগ্যপণ্যসহ আমদানিকৃত পণ্য ব্যবসায় চট্টগ্রামের বনেদী ব্যবসায়ী ও খাতুনগঞ্জের একক আধিপত্য আর নেই। নানা সুযোগ-সুবিধার কারণে ঢাকা ও উত্তরবঙ্গের ব্যবসায়ীদের নিয়ন্ত্রণে চলে গেছে আমদানিকৃত পণ্যের ব্যবসা। খাতুনগঞ্জ ও আশপাশের এলাকার আমদানি-রপ্তানি সংশ্লিষ্ট সিএন্ডএফ ও কমিশন এজেন্ট এবং আমদানিকারকদের নামকরা বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান-গুলোর অধিকাংশ বন্ধ হয়ে গেছে। ব্যবসায় ক্রমাগত লোকসানের কারণে পণ্য আমদানি থেকে বিরত রয়েছেন বনেদি ব্যবসায়ীরা। ব্যবসায়ীরা জানান, গত ৫/৬ বছর যাবত্ পণ্য আমদানিতে অসম প্রতিযোগিতা শুরু হয়েছে। চট্টগ্রামে ও ঢাকার বিভিন্ন গুদামে যে পরিমাণ পণ্য মজুদ রয়েছে আগামী এক বছর আমদানি না হলেও পণ্যের বাজারে ঘাটতি হবে না। ভোগ্যপণ্যের মধ্যে রয়েছে চাল, গম, চিনি, ভোজ্যতেল, পেঁয়াজ, রসুন, আদা, ডাল, গুঁড়ো দুধ, ছোলা ইত্যাদি। ব্যবসায়ীরা জানান, দেশে চালের বাজার নিয়ন্ত্রণ করছেন দিনাজপুর, কুষ্টিয়া, নওগাঁ জেলার ৫/৬ জন মিল মালিক। আর পেঁয়াজ, রসুন, আদার বাজার নিয়ন্ত্রণ করছেন ঢাকার ৩/৪ জন ব্যবসায়ী। এসব পণ্য আমদানির সাথে চট্টগ্রামের কোন ব্যবসায়ী নেই। আর সীমান্ত দিয়ে ভারত থেকে অবৈধভাবে প্রচুর ভোগ্য ও মসলাজাতীয় পণ্য আসছে। যার কারণে চট্টগ্রাম বন্দর দিয়ে খালাস হওয়া পণ্যের শুল্ক খরচসহ আমদানি খরচ বেড়ে যাওয়ায় চট্টগ্রাম থেকে অনেকে ব্যবসা গুটিয়ে নিয়েছেন। বাজারে পণ্য বিক্রি করতে তাদের লোকসান গুনতে হচ্ছে। চট্টগ্রামে বন্দর থাকায় অত্র অঞ্চলের অনেকেই বংশানুক্রমে ব্যবসা-বাণিজ্যের সাথে জড়িত রয়েছেন। চট্টগ্রামের ব্যবসায়ীদের কারণে দেশের প্রধান বাণিজ্যিক কেন্দ্র খাতুনগঞ্জের সুখ্যাতি রয়েছে। একসময় খাতুনগঞ্জের পাইকারি বাজারে পণ্যের দামের ওঠা-নামার উপর দেশের পণ্যের বাজার নির্ভর করতো। খাতুনগঞ্জের পণ্যের ডিও ব্যবসা করে অনেকেই বহু অর্থের অধিকারী হয়েছেন। খাতুনগঞ্জের আশপাশে কোরবানীগঞ্জ ও আছাদগঞ্জের বিশাল এলাকাজুড়ে বিভিন্ন স্থাপনায় শত শত আমদানি সংশ্লিষ্ট বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান রয়েছে। বাণিজ্যের কারণে দেশের সরকারি ও বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো তাদের একাধিক শাখা খুলেছে খাতুনগঞ্জ এলাকায়। কিন্তু আমদানি ভোগ্যপণ্যের লেন-দেন কমে যাওয়ায় আগেরমত জৌলুস নেই দেশের প্রধান এই বাণিজ্যিক কেন্দ্রের। ব্যবসায়ীরা জানান বিগত ওয়ান ইলেভেন-এর পর থেকে ভোগ্যপণ্যের আমদানি ব্যবসায় অসম প্রতিযোগিতা শুরু হয়েছে। চাহিদা থেকে কয়েকগুণ বেশি পণ্য আমদানি হয়ে দেশের গুদামগুলোতে হাজার হাজার টন পণ্য মজুদ রয়েছে। লোকসানের কারণে প্রকৃত আমদানিকারকরা পণ্য বিক্রি না করে গুদামে রেখে দিয়েছেন। দেশের বাজারে অনেক পণ্যের দাম আন্তর্জাতিক বাজারের চেয়েও কম। আবার দেশের চালসহ ভোগ্যপণ্য উত্পাদন আগের চেয়ে বেড়েছে। বনেদি আমদানিকারক ব্যবসায়ীরা জানান, দেশের বৃহত্ শিল্প গ্রুপগুলো ব্যাংক সুবিধা নিয়ে ভোগ্যপণ্য আমদানি ব্যবসায় লিপ্ত হয়েছে। তাদের দেশের পণ্যের চাহিদা সম্পর্কে কোন ধারণা নেই। ফলে চাহিদার কয়েকগুণ বেশি পণ্য আমদানি করে তারা। তড়িঘড়ি করে লোকসান দিয়ে তারা বাজারে পণ্য বিক্রি করে ব্যাংক ঋণের টাকা তাদের অন্য ব্যবসায় বিনিয়োগ করছেন। এতে প্রকৃত আমদানিকারকরা পণ্য নিয়ে বেকাদায় পড়েন। এই প্রতিযোগিতায় যারা যুগ যুগ ধরে পণ্য আমদানির সাথে সংশ্লিষ্ট তারা ছিটকে পড়েছেন। এখন দেশের খ্যাতনামা শিল্পগ্রুপগুলো শিল্প-কারখানা স্থাপন থেকে পণ্য আমদানি পর্যন্ত সকল ধরনের ব্যবসা নিয়ন্ত্রণ করছে। ব্যবসায়ীরা আরো জানান, নানা কারণে চট্টগ্রাম থেকে ব্যবসা অন্যত্র চলে গেছে। এসব কারণের মধ্যে রয়েছে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কে নিত্য যানজট, পরিবহন ভাড়া বেশি, জাহাজ থেকে পণ্য খালাস ও বোঝাই করতে শ্রমিক মজুরি বেশি, চেক প্রতারণা মামলায় শাস্তি না পাওয়া, মংলা ও ঢাকায় আইসিডি টার্মিনালে পণ্য খালাসে শুল্কের হার চট্টগ্রাম বন্দরের চেয়ে কম হওয়াসহ নানা সমস্যার কারণে চট্টগ্রাম থেকে ব্যবসা-বাণিজ্যের স্থানান্তর ঘটছে। ব্যবসা-বাণিজ্য সংশ্লিষ্ট সরকারি দপ্তরগুলোর কার্যক্রমও ঢাকাকেন্দ্রিক হয়ে পড়েছে। বাণিজ্য সংশ্লিষ্ট সকল ধরনের সরকারি সুযোগ সুবিধা ঢাকার ব্যবসায়ীরা বেশি পাচ্ছেন। বহির্নোঙ্গরে জাহাজে পণ্য থাকা অবস্থায় কাস্টমস শুল্ক আদায় করছে। পরে সেখান থেকে লাইটারেজ জাহাজে করে পণ্য দেশের বিভিন্ন স্থানে চলে যাচ্ছে। কয়েকযুগ ধরে ভোগ্যপণ্য আমদানি ও গুদাম ব্যবসার সাথে জড়িত ব্যবসায়ী নেয়াজুর রহমান। তিনি বললেন, “চট্টগ্রামের ব্যবসায়ীরা এখন দেশের ভোগ্যপণ্যের বাজারের ২০ শতাংশও নিয়ন্ত্রণ করছে না। চট্টগ্রাম বন্দর হয়ে পণ্য খালাস ও পরিবহন খরচ অনেক বেড়ে গেছে। এখানে পণ্য মজুদ রাখার মানসম্মত কোন গুদাম নেই। ঢাকায় উন্নতমানের অনেক গুদাম রয়েছে। বেসরকারি কন্টেইনার টার্মিনালগুলো বিনা শুল্কে ১০/১২ দিন পর্যন্ত পণ্য রাখার সুবিধা দিচ্ছে। খাতুনগঞ্জে গত কয়েক বছরে হাজার কোটি টাকার চেক প্রতারণার ঘটনা ঘটেছে। এতে ছোট-বড় শত শত ব্যবসায়ী দেউলিয়া হয়ে গেছেন। ঋণ খেলাপি হওয়ায় ব্যাংক সুবিধা পাচ্ছেন না ক্ষতিগ্রস্ত ব্যবসায়ীরা। এসব কারণে চট্টগ্রাম থেকে ব্যবসা অন্য ব্যবসায়ীদের নিয়ন্ত্রণে চলে গেছে”। দীর্ঘদিন ধরে সার ব্যবসায় জড়িত মাহাবুবুল আলম। তিনি বলেন “বর্তমানে চট্টগ্রামে একটি মাত্র প্রতিষ্ঠান সার আমদানি করছে। আগে আরো ৬/৭ জন বড় সার আমদানিকারক ছিল। এখন তারা সার আমদানি করছে না। চট্টগ্রামে এক গাড়ি পণ্য লোড করতে এক হাজার আট শত টাকা শ্রমিকদের মজুরি খরচ পড়ে। আর নারায়ণগঞ্জের ৩২০ বস্তা পণ্য লোড করতে ৫০০ টাকার বেশি খরচ হয় না। মংলা বন্দরেও শ্রমিক মজুরি অনেক কম”। খাতুনগঞ্জ ট্রেড অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিজ এসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক ছৈয়দ ছগির আহাম্মদ বলেন- “চট্টগ্রামের চেয়ে ঢাকার ব্যবসায়ীরা বেশি সুযোগ-সুবিধা পাচ্ছেন। চেক প্রতারণা মামলায় কারো শাস্তি হয়নি। মংলা ও ঢাকায় পণ্য খালাসে শুল্কের হার চট্টগ্রাম বন্দরের চেয়ে কম। চট্টগ্রামে গুদাম থেকে মাল চুরি হয়ে যায়। ব্যবসা-বাণিজ্য সংক্রান্ত মামলা নিষ্পত্তি, লাইসেন্স, পারমিটসহ নানা বিষয় ঢাকাকেন্দ্রিক হয়ে পড়েছে। ব্যবসায়ী পিতার হাত ধরে ব্যবসা-বাণিজ্যে জড়িয়ে পড়েন শিল্পপতি এম.এ. সালাম। তিনি কয়েক বছর যাবত্ ভোগ্যপণ্য আমদানি থেকে বিরত রয়েছেন। এম.এ. সালাম বলেন, “চট্টগ্রামের ব্যবসায়ীরা কোন সময় পণ্যের বাজার নিয়ন্ত্রণ করেনি। এখানে বন্দর থাকার সুবাদে চট্টগ্রামের মানুষ ব্যবসায় বেশি জড়িয়ে পড়েছেন। এখন ব্যবসা বাণিজ্য ঢাকা ও বগুড়া কেন্দ্রিক হয়ে গেছে। বিগত সময়ে এত বেশি পণ্য আমদানি হয়েছে তাতে আগামী ৬ মাসেও পণ্যের ঘাটতি হবে না, যার কারণে বাজারে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম স্থিতিশীল রয়েছে”।