তিনি আর ‘যুবরাজ’ নন!

মা-বাবা কি মনে করে নাম রেখেছিলেন ‘যুবরাজ’ সেটা তারাই ভালো বলতে পারবেন। তবে ছেলেকে ক্রিকেট খেলতে পাঠানোর পর তিনি ভারতের ১২১ কোটি মানুষের মাঝে সত্যিকারের যুবরাজ হয়ে উঠেছিলেন। ২০০০ সালের ৩ অক্টোবর আন্তর্জাতিক একদিনের ক্রিকেটে অভিষেক হবার পর তার ‘ধুমধাড়াক্কা’ ব্যাটিং স্টাইল তরুণ ক্রিকেটার ও ক্রিকেটভক্তদের কাছে হয়ে উঠেছিল এক আকর্ষণের নাম। তিনি যতক্ষণ মাঠে থাকেন ততক্ষন চার ছয়ের ফুলঝুরি দেখার আশায় থাকে দর্শকরা। যুবরাজ তাদের হতাশ করেন না। ওয়ানডে ক্রিকেটে তার ১৩টি সেঞ্চুরির ৫টি হয়েছে ১০০ এর চেয়ে কম বলে। বাকিগুলোও ১০০ বলের কাছাকাছি। আর ২০০৭ সালের টি টোয়েন্টি ক্রিকেটে ভারত-ইংল্যান্ডের মধ্যকার সেই ম্যাচটির কথা মনে আছে? ব্যাটিং প্রান্তে যুবরাজ সিং আর বোলিংয়ে স্টুয়ার্ট ব্রড। ইংল্যান্ডের ব্যাটসম্যান এন্ড্র ফ্লিনটফের সঙ্গে কি নিয়ে যেন তর্কাতর্কি হলো যুবরাজের। খিটমিট করতে করতে তিনি গিয়ে দাঁড়ালেন উইকেটের সামনে। প্রথম বল করলেন স্টুয়ার্ট। আম্পায়ারের মাথার উপর দিয়ে উড়ে গিয়ে সীমানার বাইরে। অর্থাত্ ছক্কা। দ্বিতীয় বলও ছক্কা। ব্যাকওয়ার্ড স্কয়ার লেগের উপর দিয়ে উড়ে যাওয়া এই ছক্কার ‘দৈর্ঘ্য’ ছিল ১১১ গজ! তৃতীয় এবং চতুর্থটি এক্সট্রা কভারের উপর দিয়ে রকেট গতিতে ছয়! পঞ্চমটি মিড উইকেটের এবং ষষ্ঠটি লং অনের উপর দিয়ে পড়ল গ্যালারিতে। অর্থাত্ এক ওভারে ৩৬ রান। ১২ বলে হাফ সেঞ্চুরি। হার্শেল গিবসের পর আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে তিনিই হন এক ওভারে ছয়টি ছক্কা মারা দ্বিতীয় ব্যাটসম্যান। এমন ইনিংস খেলার পর ‘যুবরাজ’ নামের যৌক্তিকতা যেন খুঁজে পায় ভারতের ক্রিকেট ভক্তরা। বিশ্বকাপ জিতে ভারতে ফেরার পর গোটা ভারত রীতিমতো উত্সবে মেতেছিল তাকে নিয়ে । এমনকি যুবরাজ পূজার আয়োজনও করেছিল কোনো কোনো পাগল ভক্ত! কিন্তু ২০১৪ সালের টি টোয়েন্টি বিশ্বকাপে ভারতবাসী দেখল উল্টো চিত্র। এতদিন যে যুবরাজকে তারা ভরসা হিসেবে দেখতো। সেই যুবরাজ হয়ে গেল বিশ্বকাপ হারানোর ‘খলনায়ক’। ভারতবাসীর ধারণা, যুবরাজের কারণেই ঢাকায় রবিবারের ফাইনালে শ্রীলংকার বিরুদ্ধে হেরেছে ভারত। অতি গুরুত্বপূর্ণ সময়ে তার ২১ বলে ১১ রানের ইনিংসকে ক্ষমার অযোগ্য হিসেবে দেখছেন তারা। টি টোয়েন্টি ক্রিকেটে একটি বলই যেখানে গুরুত্বপূর্ণ সেখানে ব্যাটিং ইনিংসের শেষ দিকে একের পর এক বল ‘খেয়ে ফেলা’কে সন্দেহের চোখে দেখছেন অনেকে। কোনো ব্যাখ্যাই শুনতে রাজি নয় ভারতের ক্রিকেট ভক্তরা। তাদের দাবি, হাতে ছয়টি উইকেট থাকার পরেও যুবরাজ্যের ওই ‘আলসেমি’র কারণে ভারত মাত্র ১৩০ রান করে। ওই রান তাড়া করা শ্রীলংকার কাছে ছিল ‘ডালভাত’। ১৩ বল বাকি থাকতেই খেলা শেষ করে শ্রীলংকা সেটা প্রমাণ করে দেয়। যুবরাজ এখন ‘ভিলেন’ : ভারতীয় ক্রিকেটের হিরো যুবরাজ এখন ভিলেনে পরিণত হয়েছেন। রবিবার রাতে শ্রীলংকার কাছে শোচনীয় পরাজয়ের পর চন্ডীগড়ে যুবরাজের বাড়িতে পাথর ও ইটপাটকেল নিক্ষেপ করে বিক্ষুব্ধ ক্রিকেট প্রেমীরা। অনেক শহরে যুবরাজের বিরুদ্ধে বিক্ষোভও করা হয়েছে। এমনকি যুবরাজকে বাংলাদেশে ফেলে যাবার দাবিও তুলেছে অনেকে! এই ঘটনার পর চন্ডীগড়ে মানিমাজরা অঞ্চলে যুবরাজের বাড়ির চারপাশে বাড়তি নিরাপত্তা ব্যবস্থা করা হয়। সার্বক্ষণিক পুলিশ টহল রাখা হয়েছে। পুলিশের বড় বড় কর্তারা সব সময় খোঁজ নিচ্ছেন কোনো দুর্ঘটনা ঘটল কি না। অপরদিকে, টুইটার, ফেসবুক জুড়েও যুবরাজের বিরুদ্ধে সমালোচনার ঝড় উঠেছে। সবার এক কথা, স্লগ ওভারে যখন রান তোলার চরম প্রয়োজনীয়তা ছিল তখন নিজের উইকেটটি এঁটুলির মতো আঁঁকড়ে ধরে পবর্ত যুবরাজ ২১ বলে ১১ রানের মুসিক প্রসব করলেন। টি-২০-এর যে কোনও মুহূর্তে এতোগুলো বল নষ্ট করা কোনভাবেই মেনে নেয়া যায় না। তার উপর যদি সেটা বিশ্বকাপ ফাইনাল হয় তাহলে সত্যিই এই ব্যাটিং ক্ষমাহীন। পাশে দাঁড়ালেন ধোনি :যুবরাজের বিরুদ্ধে যখন দর্শক সমালোচকরা ক্ষেপেছেন তখন তার পাশে দাঁড়িয়েছেন ক্যাপ্টেন ধোনি। তিনি বলেছেন, এটা যুবরাজের জন্য ছিল একটা খারাপ দিন। ‘যুবি’ তার সাধ্যমতো চেষ্টা করছিল বল ব্যাটে লাগানোর। কিন্তু পেরে উঠছিল না। এটা ইচ্ছাকৃত ছিল না বলে তিনি যুবরাজকে বাঁচানোর চেষ্টা করেন। যুবরাজ যখন একের পর এক বল নষ্ট করছিলেন তখন তাকে ‘আউট’ হয়ে সাজঘরে ফিরতে কোনো নির্দেশ পাঠাননি কেন। এই প্রশ্নের জবাবে ধোনি ভারতের মিডিয়াকে বলেন, সে সাধ্যমতো চেষ্টা করছিল। তাই তাকে কিছু বলা হয়নি! পিতার আবেদন:যুবরাজের এই করুণ পরিস্থিতিতে ভারতবাসীর কাছে ছেলের হয়ে একটু করুণা ভিক্ষা চাইলেন তার পিতা যোগরাজ সিং। তিনি ভারতের পত্রপত্রিকায় পাঠানো এক বিবৃতিতে বলেছেন, তার ছেলেই একা বাংলাদেশে বিশ্বকাপ খেলতে যায়নি। তাহলে কেন তাকে বলির পাঠা বানানো হচ্ছে! তিনি দর্শকদের আবেগকে শ্রদ্ধা করেন এমন মন্তব্য করে বলেন, ভারত যখন হেরেছে তখন গোটা দলকেই দোষ দেয়া উচিত। কেবল তার ছেলেকে নয়। কিন্তু দুর্দান্ত ফর্মে থাকা ভারতীয় টিমের বিশ্বকাপের এত কাছাকাছি গিয়ে তা হারানোর বেদনা ভারতবাসী অত সহজে ভুলে যুবরাজকে তার আসন ফিরিয়ে দেবে কি না সেটা দেখতে আরো কিছুদিন অপেক্ষা করতে হবে। কিন্তু এই বাহাতি ব্যাটসম্যান যে সাময়িকভাবে তার ‘যুবরাজ’ আসন হারিয়েছেন তাতে সন্দেহ নেই।