প থ শি শু দে র
‘মজার ইশকুল’
প্রকাশ : ০৮ এপ্রিল ২০১৪, ১৯:১৭
দুপুর আড়াইটা। কমলাপুর রেলস্টেশন। স্টেশনের ৮নং প্লাটফর্মে চলছে পরিচ্ছন্নতার কাজ। গ্রীষ্মের প্রচণ্ড দাবদাহ উপেক্ষা করে পরিচ্ছন্নতার কাজ করে চলেছে একদল তরুণ-তরুণী। পথ চলতি অনেকেই থমকে দাঁড়াচ্ছেন তাদের দেখে, কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে থেকে বোঝার চেষ্টা করছেন আসলে মূল ঘটনাটা কি? অতি উত্সাহী কেউ কেউ আবার এগিয়ে এসে জিজ্ঞাসাও করছেন কিসের জন্য এতো আয়োজন? ইতিমধ্যেই প্লাটফর্মের এককোণা পরিষ্কার করে পাতা হয়েছে চাদর।
বই, খাতা, খেলনা হাতে উপস্থিত হয়েছেন এতক্ষণের পরিচ্ছন্নতাকর্মী, তরুণ-তরুণীরা। তবে এবারে শিক্ষকের ভূমিকায়। শিক্ষকদের দেখে একজন-দুইজন করে ভীড় করতে শুরু করেছে শিক্ষার্থীরাও। ফিটফাট জামা-কাপড় পরা, কাঁধে ব্যাগ ঝোলানো ফুলবাবু সেজে নয়, কেউ এসেছে খালি গায়ে, কারো পরণে শতছিন্ন ময়লা একটি প্যান্ট, অধিকাংশের পায়েই নেই জুতা। এই শিক্ষার্থীদের কেউ কেউ কাজ করে চায়ের দোকানে। কেউ বিক্রি করে বাদাম, কেউবা ফুল, আবার কাগজ কুড়ানো ছেলে-মেয়েও রয়েছে এই দলে। কিন্তু মজার স্কুলে সবার একটাই পরিচয়, সবাই শিক্ষার্থী।
ইতিমধ্যেই পড়ালেখার পর্ব শুরু হয়ে গেছে। মজার স্কুল শুধু নামে নয় কাজে-কর্মে এমনকি পড়ালেখায়ও এটি অন্যদের থেকে একেবারেই ভিন্ন। একই সাথে বসে কেউ ছবি আঁকছে। কেউ জোরে জোরে উচ্চারণ করে অন্তস্থ করছে বর্ণমালার এক একটি অক্ষর। আবার বর্ণের সাথে বর্ণের গাঁথুনি দিয়ে শব্দ তৈরি করছে কেউ কেউ। কেউবা খসখসে কাগজে আঁকিবুকি করে নিজের নাম লিখে নিজেই দেখছে অবাক চোখে।
পড়াশোনার এই ব্যস্ততায় দুপুর গড়িয়ে বিকেলের পথে। পাঠদান পর্বের সমাপ্তি ঘটলো একসময়। এবার খাওয়ার পালা। পড়তে আসা শিক্ষার্থীরা যাতে শুধু মগজে নয় পেটেও কিছু নিয়ে বাড়ি ফিরতে পারে সেটাই মূল উদ্দেশ্য। তাও আবার হালকা জল-খাবার নয় রীতিমত পেট পুরে খাওয়া-দাওয়া। মজার ইশকুলের এই তো মজা।
সুবিধাবঞ্চিত পথশিশুদের নিয়ে কাজ করার মানসে মজার ইশকুল যাত্রা শুরু করে ২০১৩ সালের ১০ জানুয়ারি থেকে। বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের একদল উদ্যমী শিক্ষার্থীদের হাত ধরে এর যাত্রা শুরু। জয়কালী মন্দিরের পাশের একটি মাঠে ৩ জন শিক্ষক এবং ১৩ জন শিক্ষার্থী নিয়ে যাত্রা শুরু করলেও বছর ঘুরতেই সেই সংখ্যা বেড়ে ১৫ জন শিক্ষক এবং প্রায় দেড়শ’ শিক্ষার্থীতে পরিণত হয়েছে। হয়েছে দুটি স্থায়ী স্কুল ঘর। সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের লালন চর্চা কেন্দ্রে একটি এবং অপরটি আগারগাঁওয়ের ভাড়া নেয়া একটি বাসায়। এছাড়াও কমলাপুরে রয়েছে একটি অস্থায়ী ক্লাসরুম। প্রতি সপ্তাহের রবি থেকে বৃহস্পতিবার সকাল ১০টা থেকে ১টা পর্যন্ত আগারগাঁওয়ে এবং ২টা থেকে ৫টা পর্যন্ত শাহবাগ ক্লাসরুমে চলে শিক্ষাদান এবং প্রতি বৃহস্পতিবার দুপুর ৩টা থেকে ৫টা পর্যন্ত শিক্ষাদান চলে কমলাপুর রেলস্টেশনের অস্থায়ী শ্রেণিকক্ষে।
মজার স্কুলের প্রতিষ্ঠা নিয়ে প্রতিষ্ঠাতা আরিয়ান আরিফ জানান, স্কুলের শুরুটা হয় ফেইসবুকের একটি স্ট্যাটাসের মাধ্যমে। জানুয়ারির প্রথম সপ্তাহে দেয়া ফেইসবুকের সেই স্ট্যাটাসটাতে আমি লিখেছিলাম, ঢাকায় যে সকল পথশিশু রয়েছে তাদের জন্য একটি স্কুল প্রতিষ্ঠা করতে চাই। ফেইসবুকের সেই আহ্বানে সাড়া দিয়ে এগিয়ে এলেন ২ জন। প্রতিষ্ঠিত করলাম মজার ইশকুল। এরপর শুরু হলো পথচলা। বন্ধুর এপথে চলার সময়গুলোতে যুক্ত হয়েছেন অনেকে। কেউ আর্থিক সহায়তা দিয়ে সাহায্য করেছেন। কেউ গায়ে খেটে দাঁড় করিয়েছেন স্কুলটিকে।