জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়

পাহাড়ের টানে সাগরের গানে

পাঁচটি বছর ক্লাস, পরীক্ষা, অ্যাসাইনমেন্টের কারণে ছাত্রজীবনকে মাঝে মাঝে আনন্দহীন মনে হত। এসব ধরাবাঁধা পড়াশুনার বাইরে প্রকৃতি থেকে বাস্তব জ্ঞানার্জনের জন্য স্নাতক চূড়ান্ত পরীক্ষার পর আমরা বন্ধুরা মিলে ঘুরে এলাম কক্সবাজার ও বান্দরবান জেলায়। কথাগুলো বলছিলেন জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় পদার্থ বিজ্ঞান বিভাগের ২০০৮-০৯ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী খন্দকার গোলাম কিবরিয়া। দিনটি ছিল ১৩ মার্চ। সূয্যিমামা পশ্চিম আকাশে হেলে পড়ার পূর্বেই আমরা একই ব্যাচের ৪২ জন শিক্ষার্থী এবং ৬ জন শিক্ষক এসে জড়ো হলাম শাহবাগ মোড়ে। বাসে করে সন্ধ্যার পর আমরা যাত্রা শুরু করলাম বান্দরবান আর কক্সবাজার সমুদ্র সৈকতের উদ্দেশ্যে। শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের সমন্বিত নাচ, গান এবং হাস্যরসে পুরো বাস উত্সবে পরিণত হল। ১৪ তারিখ সকাল ৮টায় পৌঁছলাম চট্টগ্রাম, সেখান থেকে বাসে করে রওয়ানা হলাম বান্দরবানের উদ্দেশ্যে। দুপুর একটায় গিয়ে পৌঁছলাম বান্দরবান। দুপুরের খাবার এবং বিশ্রামের পর যাত্রা শুরু করলাম চিম্বুক পাহাড়ের উদ্দেশ্যে। সেখান থেকে নীলগিরি তারপর নীলাচল পাহাড়। একই ব্যাচের শিক্ষার্থী উম্মে হাবিবা টুম্মা বলেন, নীলগিরি পাহাড়ে উঠে আকাশে ভেসে যাওয়া মেঘগুলোকে খুব কাছ থেকে দেখতে পেলাম আর আমাদের বন্ধুদের মধ্যে অনেকে তো ভেসে যাওয়া মেঘগুলোকে স্পর্শ করার চেষ্টা করল। সারাদিন ঘোরাঘুরির পর রাতের বেলায় আসলাম হোটেলে। সারাদিনের ক্লান্তিও যেন কাউকে স্পর্শ করতে পারেনি প্রত্যেকের মাঝেই উত্সুক ভাব কখন সকাল হবে আর পৃথিবীর সর্ববৃহত্ সমুদ্র সৈকত দেখতে যাব। ১৫ তারিখ শনিবার সকালে বান্দরবান থেকে যাত্রা করলাম কক্সবাজারের উদ্দেশ্যে। কক্সবাজার এসে পৌঁছলাম বেলা ১২ টায়। দুপুরের খাবারের পর শুরু হল আমাদের মূল আনন্দের পর্ব। সমুদ্রের পাড়ে এসে শিক্ষকরাও কিছুক্ষণের জন্য মিশে গেলেন শিক্ষার্থীদের কাতারে। শিক্ষক-শিক্ষার্থী একাকার হয়ে সমুদ্রের তরঙ্গের সাথে লাফালাফি আর ফুটবল খেললেন। শিক্ষকরাও সেদিন তাদের পেশাগত পরিচয় ভুলে গিয়ে বন্ধুর মতো শিক্ষার্থীদের সাথে আনন্দের সময়গুলো ভাগাভাগি করে নিলেন। আনন্দঘন মুহূর্তের দৃশ্যগুলো স্মৃতিপটে ধরে রাখার জন্য প্রত্যেকে ডিজিটাল ক্যামেরা এবং স্মার্টফোন সাথে করে নিয়ে গিয়েছিল। সমুদ্রের পাড়ে মুহুর্মুহু জ্বলে উঠেছিল ডিজিটাল ক্যামেরার ফ্ল্যাশ লাইট। গ্রুপের মধ্যে তথ্যপ্রযুক্তি বিশেষজ্ঞ জামিলের তো কাজই ছিল ক্যামেরায় তোলা ছবিগুলো মুহূর্তের মধ্যে ফেসবুকে আপলোড করে দেয়া। দু’দিন কক্সবাজার সমুদ্রের তীরে কাটানোর পর ১৭ তারিখ রওয়ানা হলাম বাংলাদেশের একমাত্র প্রবাল দ্বীপ সেন্টমার্টিন এবং সর্বদক্ষিণের স্থান ছেড়াদ্বীপের উদ্দেশ্যে। বিজ্ঞান বইতে পড়ছিলাম উদ্ভিদের মৃত অবস্থা থেকে প্রবালের সৃষ্টি হয় আর সেন্টমার্টিন দ্বীপে এসে তা নিজ চোখে দেখতে পেলাম। প্রবালের উপর দিয়ে সবাই ভয় আর আতঙ্ক নিয়ে হাঁটছিলাম কখন না জানি ক্ষিপ্র প্রবালে পা কেটে যায়। সতর্ক থাকা সত্ত্বেও আমাদের মধ্যে দু’তিনজনের পা কেটে গিয়েছিল। কথাগুলো বললেন, সফরকারী দলের সদস্য মোরশেদ আলম। ৫ দিনের ভ্রমণ শেষে ১৮ তারিখ বিকেল বেলায় কক্সবাজার থেকে সুবর্ণ এক্সপ্রেস ট্রেনে করে ঢাকার উদ্দেশ্যে রওয়ানা হলাম। কারোরই মন কক্সবাজারের অপরূপ সৌন্দর্যের মায়া ফেলে আসতে চাইছিল না। সবাই ট্রেনের মধ্যে আনন্দের মুহূর্তগুলো স্মৃতিচারণ করল আর বলতে লাগল এই আনন্দের সময়গুলো যদি কখনও শেষ না হত।