আনন্দের দিন খুশির দিন
প্রকাশ : ০৮ এপ্রিল ২০১৪, ১৯:২৩
আমাদের জাতীয় জীবনে যে ক’টি আনন্দ ও খুশির দিন আছে, পহেলা বৈশাখ তার মধ্যে একটি। এদিন বাংলা নববর্ষের প্রথম দিন। পুরনো বছর শেষ হয়ে একটি নতুন বছর শুরু হলে সেই বছর বা বর্ষকে আমরা বলি নববর্ষ অর্থাত্ নতুন বছর। আর সে বছরটিকে প্রাণের খুশিতে বরণ করে নেয়া হয়। এভাবেই নতুন-পুরনোর আসা-যাওয়ার খেলা চলছে; চলবে অনন্তকাল।
বছরের সব দিন-মাস দৃশ্যত একই রকম হলেও নানা কারণে এর মধ্যে কিছু ব্যতিক্রম দেখা যায়। এসব কারণের মধ্যে জাতীয়, আন্তর্জাতিক ও ধর্মীয় বিষয় যেমন থাকে, তেমনি থাকে আনন্দ-খুশিতে উদ্বেল সাংস্কৃতিক অনুষঙ্গও। নববর্ষ বা নতুন বছর ঐতিহ্যিক-সাংস্কৃতিক প্রেক্ষাপটে এক তাত্পর্যময়, বৈশিষ্ট্যপূর্ণ আনন্দের উত্সব। বাংলা নববর্ষের প্রথম দিন পহেলা বৈশাখ আমাদের সামনে অনেক খুশি, আশা আর অনন্দের বার্তা নিয়ে আসে। আসলে মানুষের মন সব সময় পুরাতনের বিদায় আর নতুনের আগমনে খুশি হয়। নতুন আশায় বুক বাঁধে। ভবিষ্যতে জীবনকে আরো সুন্দরভাবে সাজাতে চায়। তাইতো পুরো একটি বছর পর যখন নতুন বছরের নির্ধারিত দিনটি আসে তখন আমরা আনন্দে উদ্বেলিত হই। ভবিষ্যতের শুভদিনের আশায় আমাদের মনকে জাগিয়ে তুলতে চাই নানামাত্রিক আনন্দ আর খুশির উপলক্ষ দিয়ে। দীর্ঘ একঘেয়েমির ক্লান্তি ও অবসাদের মধ্যে খুঁজে পেতে চাই বৈচিত্র্য আর নতুনত্বের আস্বাদ।
নববর্ষ উদযাপনের ঐতিহ্য অনেক পুরনো। জানা যায়, চার হাজার বছরেরও বেশি আগে মধ্যপ্রাচ্যের মেসোপটেমিয়ায় প্রথম নববর্ষের উত্সব পালন শুরু হয়। এই উত্সবের আয়োজন করা হতো বসন্তকালে অর্থাত্ মার্চ মাসের মাঝামাঝি সময়ে। প্রাচীন মিসরীয়, ফিনিসীয় এবং পারস্য সংস্কৃতিতে অন্যান্য ঋতুতেও নববর্ষ উদযাপিত হতো। এই ধারায় বিভিন্ন দেশে নববর্ষ বা নতুন বছরের সূচনাক্ষণের উত্সবকে এখনও ঘটা করে, জাঁকজমকের সাথে উদযাপন করা হয়। আমাদের দেশেও হয়। বিশ্বের অনেক দেশে নববর্ষ উদযাপিত হয় ১ জানুয়ারি। ফেব্রুয়ারি, মার্চ, এপ্রিল, এমনকি সেপ্টেম্বরেও কোনো কোনো দেশে নববর্ষের উত্সব পালন করা হয়। তবে, ভিন্ন ভিন্ন সময়ে পালন করা হলেও প্রতিটি দেশের নববর্ষের উদ্দেশ্য ও বৈশিষ্ট কিন্তু একই, তা হলো আনন্দ-উত্সব। গানবাজনা, খাওয়াদাওয়া, খেলাধুলা, উপহার দেয়া-নেয়া এমনি কত কত উপায়ে সেই আনন্দ প্রকাশের চেষ্টা করা হয়। এসব আনন্দের স্রোতধারায় তারা ধুয়ে-মুছে ফেলতে চায় পুরনো বছরের সব গ্লানি আর দুঃখ-কষ্টকে; ভুলে যেতে চায় না-পাওয়ার সব ব্যর্থতাকে। আমাদের নববর্ষের উত্সব পহেলা বৈশাখও সেই বৈশিষ্ট্য থেকে আলাদা নয়। কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর একটি গানে কী সুন্দরভাবেই না এ বিষয়টি ব্যক্ত করেছেন: ‘এসো, এসো, এসো, হে বৈশাখ/ তাপসনিশ্বাসবায়ে/ মুমূর্ষুরে দাও উড়ায়ে/ বত্সরের আবর্জনা দূর হয়ে যাক.. ..।’ এভাবেই বৈশাখ বাঙালির জীবনে নতুন আশা ও সম্ভাবনর প্রতীক হয়ে উপস্থিত হয় প্রতিবছর। সেই সাথে বাঁধভাঙা আনন্দ আর খুশির জোয়ারে সবার জীবনকে ভাসিয়ে দেয়ারও একটি দিন বাঙালির সর্বজনীন উত্সব বাংলা নববর্ষের প্রথম দিন পহেলা বৈশাখ।
প্রতিবছর ১৪ এপ্রিল— পহেলা বৈশাখ বাংলা নববর্ষের প্রথম দিন হলেও বাংলাদেশের পার্বত্য এলাকার আদিবাসী ভাই-বোনেরা তাদের ঐতিহ্য অনুযায়ী নববর্ষের উত্সব উদযাপন করে পয়লা বৈশাখের আগের দিন অর্থাত্ চৈত্রের শেষ দিন— ইংরেজি ১৩ এপ্রিল। তাদের ঐ উত্সবের নাম বৈ-সা-বি, যা তিনটি আদিবাসী নৃগোষ্ঠীর উত্সবের প্রথম অক্ষর নিয়ে গঠিত— যেমন: ত্রিপুরাদের বৈজু থেকে বৈ, মারমাদের সাংরাই থেকে সা আর চাকমাদের বিজু থেকে বি— সবমিলে বৈ-সা-বি। রাজশাহী অঞ্চলে বসবাসকারী আদিবাসী ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী সাঁওতালদের নববর্ষ শুরু হয় ফাল্গুন মাসে— ফেব্রুয়ারির প্রায় মাঝামাঝি সময়ে। আদিবাসীদের নববর্ষের উত্সব তাদের নিজস্ব ঐতিহ্য অনুযায়ী খুবই আনন্দ আর জাঁকজমকপূর্ণভাবে উদযাপন করা হয়। তারা সবাই নিজেদের ঐতিহ্যবাহী পোশাক পরে এই উত্সবে শামিল হয়।
বাঙালিরা প্রতিবছর পহেলা বৈশাখে বরণ করে নিই আনন্দ আর খুশিতে ভরা বাংলা নতুন বছরকে। চৈত্র মাসের শেষ দিনটি বিদায়ের পরদিনই প্রথম বৈশাখের সূচনা। তখন সারাদেশ মেতে ওঠে নতুন বছরের আগমনের খুশিতে। ধনী-গরিবের ভেদ নেই; কে কোন ধর্মের মানুষ তাও জানার দরকার নেই। সবাই ছোটে বৈশাখী মেলায়। ঘুড়ি-নাটাই, পুতুল-বেলুন, মুড়ি-মুড়কি, নাড়ু-মোয়া, পাঁপর-জিলাপি, গজা-খাজা, রসগোল্লা-পানতোয়া, মালাই-খেরসাভোগ কি না থাকে মেলায়! পাশাপাশি থাকে পান্তা ইলিশ খাওয়ার ধুম, পুতুলনাচ, নাগরদোলা, বানরের খেলা, ঘোড়দৌড় প্রতিযোগিতা আর গানের আসর। সব মিলে টইটম্বুর খুশির সমুদ্র যেন। মেলায় আসা মিষ্টি ও খেলনাজাতীয় বিভিন্ন জিনিসের ওপর বড়দের চেয়ে ছোটদের আগ্রহই থাকে বেশি। বড়রা এসব জিনিস সাধ্যমতো কিনে দেয় ছোটদেরকে। হাসি ফোটায় তাদের মুখে। এভাবে ছোট-বড় সবাই ভুলে যায় অন্যসব না-পাওয়ার কষ্ট, ব্যর্থতা। শুধু হাসি-খুশি আর আনন্দ তাদেরকে ঘিরে রাখে দিনভর।
বাংলা নববর্ষ বা বঙ্গাব্দের সূচনা হয়েছিল মোগল সম্রাট আকবর (জন্ম: ১৫৪২ খ্রি, মৃত্যু: ১৬০৫ খ্রিস্টাব্দ)-এর আমলে। আমাদের বাংলাদেশের এই এলাকাও তখন সম্রাট আকবরের সাম্রাজ্যের অধীন ছিলো। সম্রাট আকবর কিন্তু আনন্দ-উত্সবের লক্ষ্য নিয়ে বাংলা নববর্ষের প্রবর্তন করেননি। তিনি তা করেছিলেন প্রজাদের খাজনা বা ট্যাক্স পরিশোধের সুবিধার জন্য। জনগণ ফসলপাতি ঘরে তুলে তা বিক্রি করেই না রাজসরকারের খাজনা দেবে, তাই না? আগে অসময়ে খাজনা দিতে হতো বলে অর্থাভাবে মানুষজন বেজায় অসুবিধা আর কষ্টের মধ্যে পড়ত। তাই প্রজাদের অনুরোধে সম্রাট তার এক অফিসারকে নির্দেশ দিলেন এমন একটি বছরের সূচনা করতে, যে বছর শুরুর আগেই প্রজাদের ফসল কাটা এবং তোলা শেষ হয়ে যাবে; আর তারা নতুন বছরের প্রথম দিনেই খাজনা দিতে পারবে। সম্রাটের আদেশ পেয়ে তার অর্থ বিভাগের কর্মকর্তা আমির ফতেউল্লাহ শিরাজী অনেক ভেবেচিন্তে ১৫৮৪ খ্রিস্টাব্দে পয়লা বৈশাখকে বাংলা সনের প্রথম দিন নির্ধারণ করে বঙ্গাব্দের প্রবর্তন করলেন, যা কার্যকর হলো ১৫৫৬ খ্রিস্টাব্দ অর্থাত্ সম্রাট আকবরের সিংহাসনে আরোহণের সময় থেকে। এর ফলে প্রজারা খুশিমনে নির্দিষ্ট দিনে খাজনা দিতে শুরু করল। সেই উপলক্ষে চল হলো উপহার বিনিময় আর মিষ্টিমুখ করানোরও, যা এখনো টিকে আছে। এখনো হালখাতা উপলক্ষে মিষ্টি খাওয়ানো আর গান-বাদ্যের চল আছে আমাদের দেশে। নববর্ষে উপহার দেয়ার রীতিও চালু আছে এখনো। সম্রাট আকবর প্রজাদের খাজনা পরিশোধের সুবিধার জন্য যে বঙ্গাব্দ চালু করেছিলেন, তা এখন আমাদের জাতীয় উত্সব ও বাঙালির সবচেয়ে বড় সাংস্কৃতিক উত্সব আর মিলনমেলায় পরিণত হয়েছে। এটি এমনই একটি সর্বজনীন অসাম্প্রদায়িক উত্সব যাতে সব ধর্মের, সব শ্রেণির মানুষ খুশিমনে দিতে পারে। ছোট-বড়, নারী-পুরুষ সবাই প্রাণ খুলে আনন্দ উপভোগ করতে পারে।
ঢাকার রমনা বটমূলে নববর্ষ উপলক্ষে পয়লা বৈশাখে দেশের সবচেয়ে বড় মেলা বসে। গত শতকের ষাটের দশকের গোড়া থেকে এখানে বৈশাখী মেলার আয়োজন করা হচ্ছে প্রতি বছর। ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সব শ্রেণির মানুষের অংশগ্রহণে এই মেলা হয়ে উঠেছে বাঙালির প্রাণের মেলা। শুধু রমনা বটমূলে নয়, বাংলাদেশের বিভিন্ন এলাকায় নববর্ষ উপলক্ষে ছোট-বড় ২৭০টি মেলা বসে বলে জানা যায়। এসব মেলার মাধ্যমে বাঙালির নিজস্ব ঐতিহ্য-সংস্কৃতির যেমন উজ্জীবন ঘটছে, তেমনি সবার মধ্যে তৈরি হয় সর্বজনীন এক অসাম্প্রদায়িক চেতনা। সম্প্রীতিপূর্ণ এক শান্তির পরিবেশ। এ ক্ষেত্রে বৈশাখী মেলার অবদান অসামান্য।
আমাদের সামনে আবার এসেছে আরও একটি নতুন বছর— ১৪২১ বঙ্গাব্দ। আমরা প্রাণভরে স্বাগত জানাই নতুন এই বাংলা বর্ষকে। শুভ হোক নতুন আশা ও আনন্দের প্রতীক এ নতুন অতিথির পথচলা। আর, সবার জীবন আলোকমালায় উদ্ভাসিত করে আমাদের মাঝে আসুক আনকোরা নতুন একটি বছর; সেই নব আলোকের ঝর্ণাধারায় ধুয়ে-মুছে যাক পুরনো বছরের সব জঞ্জাল— নববর্ষের শুভাগমনের এই শুভলগ্নে এই হোক আমাদের সবার প্রত্যাশা।
সবাইকে বাংলা নববর্ষের শুভেচ্ছা। শুভ নববর্ষ!