‘গণজাগরণ মঞ্চের ভাঙনের জন্য ইমরানই দায়ী’
প্রকাশ : ০৮ এপ্রিল ২০১৪, ২২:৪২
গণজাগরণ মঞ্চের অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব-কোন্দলের ব্যাপারে এবার প্রকাশ্যে মুখ খুলল মঞ্চের অন্যতম পাঁচ ছাত্র সংগঠন। গণজাগরণ মঞ্চের ভাঙনের জন্য ডা. ইমরান এইচ সরকারকেই দায়ী করেছেন তারা। তবে এই অভিযোগ অস্বীকার করে ছাত্রনেতাদের বক্তব্যকে ‘অনভিপ্রেত’ বলে মন্তব্য করেছেন ইমরান।
গতকাল মঙ্গলবার দুপুরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মধুর ক্যান্টিনে এক যৌথ সাংবাদিক সম্মেলনে মঞ্চের অভ্যন্তরীণ বিভিন্ন বিষয়ে কথা বলেন ৫ ছাত্র সংগঠনের নেতারা। সংগঠনগুলো হলো- বাংলাদেশ ছাত্র মৈত্রী, জাসদ ছাত্রলীগ, বাংলাদেশ ছাত্র আন্দোলন, ছাত্রঐক্য ফোরাম ও বাংলাদেশ ছাত্র সমিতি।
প্রসঙ্গত, দীর্ঘ দিন ধরেই গণজাগরণ মঞ্চের সংগঠকদের মধ্যে মতবিরোধ চলে আসছিল। ছাত্রলীগ প্রায় ৯-১০ মাস আগে মঞ্চের কার্যক্রমে অংশগ্রহণে বিরত থাকে। সর্বশেষ গত ৩ এপ্রিল শাহবাগে মঞ্চের কর্মী-সংগঠকদের দুই পক্ষ সংঘর্ষে লিপ্ত হয়। দুই পক্ষই পরস্পরের বিরুদ্ধে শাহবাগ থানায় মামলা দায়ের করে। পরদিনও তারা পাল্টাপাল্টি কর্মসূচি দিয়ে শাহবাগে অবস্থান নিতে চেষ্টা করলে পুলিশ লাঠিপেটা করে কর্মসূচি ভণ্ডুল করে দেয়।
ছাত্রনেতারা বলেন, গণজাগরণ মঞ্চ একটি অরাজনৈতিক ও দলনিরপেক্ষ আন্দোলন। এটি কখনোই রাজনৈতিক দল হতে পারে না। যদি মঞ্চের মুখপাত্র ইমরান এইচ সরকার রাজনৈতিক দল গঠন করতে চান, তবে মঞ্চের বাইরে গিয়ে তা করতে হবে। নইলে পুরো জাতির সঙ্গে বেঈমানী করা হবে। আর মঞ্চের মুখপাত্র কোনো স্থায়ী পদ নয়। এতে পরিবর্তন আসতে পারে।
তারা বলেন, গত ৩ এপ্রিল সন্ধ্যায় শাহবাগে কয়েকজন উচ্ছৃংখল কর্মীর মধ্যে হাতাহাতির ঘটনা ঘটে। এ নিয়ে পাল্টাপাল্টি মামলা এবং প্রতিবাদ সমাবেশের আয়োজন করা হয়। মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের শক্তির মধ্যে এভাবে সংঘাত চলতে থাকলে তা রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষে রূপ নিবে, যার চূড়ান্ত লাভ যাবে মুক্তিযুদ্ধের বিরোধী শক্তির পক্ষেই। এটি কাম্য নয়।
ছাত্রমৈত্রীর সভাপতি বাপ্পাদিত্য বসু বলেন, সম্প্রতি সংঘটিত সংঘর্ষ অবশ্যই মঞ্চের দুই পক্ষের সংঘর্ষ। এখানে ছাত্রলীগ ও যুবলীগকে জড়িয়ে যে বক্তব্য দেওয়া হয়েছে তাতে মঞ্চের মুখপাত্রের রাজনৈতিক দল গঠনের অভিপ্রায়ই প্রকাশ পায়। ছাত্রলীগ, যুবলীগ মঞ্চের প্রতিপক্ষ নয়। নিজেদেরই প্রতিপক্ষ ভাবতে শুরু করলে স্বাধীনতাবিরোধী শক্তি সুযোগ নেবে।
এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, মঞ্চের মুখপাত্র ইমরান এইচ সরকারের অগণতান্ত্রিক ও একতরফা সিদ্ধান্ত গ্রহণই মঞ্চের বিভক্তির প্রধান কারণ। মুখপাত্রের পদ স্থায়ী নয়। এতে সর্বসম্মতিক্রমে পরিবর্তন আসতে পারে। তবে এটাও সত্যি যে ইমরান এইচ সরকার গণজাগরণ মঞ্চের প্রতীক হয়ে উঠেছেন। আন্দোলনে ক্ষতি হয় এমন কোনো সিদ্ধান্ত আমরা গ্রহণ করব না।
জাসদ ছাত্রলীগের সভাপতি মুহাম্মদ সামছুল ইসলাম সুমন বলেন, গণজাগরণ মঞ্চের সঙ্গে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের সব রাজনৈতিক দল সম্পৃক্ত। মঞ্চের মুখপাত্র একে নতুন কোনো রাজনৈতিক দল করার আকাঙ্খা প্রকাশ করে থাকলে, তা মঞ্চের বাইরে গিয়ে করতে পারেন। তিনি বলেন, কোনো আর্থিক অনিয়মের প্রমাণ আমাদের কাছে নেই। তবে আমাদের এই পাঁচ ছাত্রসংগঠনের পক্ষ থেকে কেউ কখনও কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে একটি টাকাও নেয়নি। আর গণজাগরণ মঞ্চের বিদ্যমান সমস্যা সমাধানে দুই পক্ষকেই এগিয়ে আসতে হবে। যেহেতু উভয় পক্ষের মামলার সত্যতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে, সুতরাং এই মামলা চলতে পারে না।
সাংবাদিক সম্মেলনে অন্যান্যের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন ছাত্র আন্দোলনের সভাপতি মনজুর রহমান মিঠু, জাসদ ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক শাহজাহান আলী সাজু, ছাত্র সমিতির আহ্বায়ক জাহিদুর রহমান, ছাত্র ঐক্য ফোরামের আহ্বায়ক সোহান সোবহান, ছাত্র মৈত্রীর সাধারণ সম্পাদক তানভীর রুসমত।
এদিকে ছাত্রনেতাদের অভিযোগ বক্তব্যের পরিপ্রেক্ষিতে গতকাল বিকালে পরীবাগে সাহিত্য বিকাশ কেন্দে এক সাংবাদিক সম্মেলনের আয়োজন করেন মঞ্চের মুখপাত্র ডা. ইমরান এইচ সরকার।
তিনি বলেন, গণজাগরণ মঞ্চের ব্যাপারে সরকার অবস্থান পাল্টিয়েছে। সরকারের নৈতিক অবস্থানের পরিবর্তন ও বিচারের দীর্ঘসূত্রিতার কারণে মঞ্চের সঙ্গে বিরোধ শুরু হয়েছে।
এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, আমি সুনির্দিষ্টভাবে সরকারকে দায়ী করবো না। তবে সরকারের কয়েকজন দায়িত্বশীল ব্যক্তি মঞ্চকে নিয়ে বিভ্রান্তিকর বক্তব্য দিয়েছেন। একই সঙ্গে সরকারের অঙ্গ সংগঠনের নেতারা যেসব বক্তব্য দিয়েছেন তা অনভিপ্রেত। মঞ্চের কর্মীদের ওপর আক্রমণ না করে কিভাবে যুদ্ধাপরাধীদের বিচার তরান্বিত করা যায় তা সরকারের ভাবা দরকার।
ছাত্রনেতাদের অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে তিনি বলেন, এককভাবে কখনো কোনো সিদ্ধান্ত গ্রহণ করিনি। কোনো বিষয় সিদ্ধান্ত নেয়ার আগে সবার সঙ্গে আলোচনা করেই নেয়া হয়েছে। একনায়কতান্ত্রিক নীতি আমি বিশ্বাস করি না। ভাঙন ও আর্থিক অনিয়মের প্রশ্নের জবাবে ইমরান বলেন, এখনো এমন কোনো অনৈক্যের পরিস্থিতির তৈরি হয়নি। যেসব বিষয় নিয়ে অভিযোগ উঠেছে তা নিয়ে আলোচনা করে সমাধান করা যাবে। আর যখন যা অর্থের প্রয়োজন ছিল তা কর্মীরাই ব্যবস্থা করেছে। এখানে কোনো আর্থিক লেনদেন ছিল না, ভবিষ্যতেও এটাকে এড়িয়ে যাবো।